adimage

২৪ অগাস্ট ২০১৯
সকাল ১১:৪৭, শনিবার

পানিতে অচল চট্টগ্রাম

আপডেট  01:52 AM, Jul ১৪ ২০১৯   Posted in : চট্টগ্রাম    

পানিতেঅচলচট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম, ১৪ জুলাই : ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনের ঠিক কয়েক দিন আগে আকাশফাটা বৃষ্টির জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যায় বন্দরনগরী। সবচেয়ে বেশি পানিতে ডুবে যায় নগরীর ব্যস্ততম মুরাদপুর এলাকা। চট্টগ্রামকে সিঙ্গাপুর বানানোর স্বপ্ন দেখিয়ে সেই নির্বাচনে মানুষের মন জয় করতে চেয়েছিলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। তখন একটি স্লোগান চট্টগ্রামে মানুষের মধ্যে রীতিমতো ঝড় তুলেছিল- 'পানির নিচে মুরাদপুর, কেমনে হবে সিঙ্গাপুর।' সে সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল এই স্লোগানটি ডুবিয়ে দেয় মহিউদ্দিন চৌধুরীকে। একটানা ১৭ বছর মেয়র পদে থাকার পর নিজের শিষ্য হিসেবে পরিচিত এম মনজুর আলমের কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত হন। একসময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তখন বিএনপির টিকিট নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন মনজুর আলম।

গতকাল শনিবার বন্দরনগরী চট্টগ্রামের মুরাদপুরে সেই চিত্রই দেখেছে নগরবাসী। তবে তা আরও ভয়ানকভাবে। নাসির উদ্দিন হায়দার নামে একজন গণমাধ্যমকর্মী তার ফেসবুকে জলে ডুবে যাওয়া থৈ থৈ পানির ছবি ও ভিডিও আপলোড করে লেখেন- 'পানির নিচে মুরাদপুর।' তার নিচে মন্তব্যে কেউ লেখেন, 'নদীর নাম চট্টগ্রাম', আবার কেউ লেখেন, 'সমুদ্র দেখতে কক্সবাজরে নয়, চট্টগ্রামে আসুন।' পরিস্থিতি এমন যে, দ্রুত পানি সরাতে মাঠে নামতে হয় সেনাবাহিনীর সদস্যদের।

শুধু মুরাদপুরই নয়, নগরীর বাকলিয়া, চকবাজার, কাপাসগোলা, কাতালগঞ্জ, প্রবর্তক মোড়, দেওয়ান বাজার, বহদ্দারহাট, ষোলশহর দুই নম্বর গেট, আগ্রাবাদ সিডিএ এলাকাসহ নগরীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা ডুবেছিল সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত। অনেক স্থানে অসংখ্য যানবাহন পানিতে নষ্ট হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। ৬০ লাখ নগরবাসীর প্রায় ৪০ লাখ মানুষকে কমবেশি দুর্ভোগে পড়তে হয়। নগরীর পাশাপাশি তলিয়ে যায় জেলার বিভিন্ন উপজেলার নিচু এলাকাগুলোও।

গত সোমবার ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল ১৮৮ দশমিক ৬ মিলিমিটার। গত শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে শনিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত ছিল ১২২ দশমিক ৪ মিলিমিটার। এর মধ্যে শুধু শনিবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত একটানা এই তিন ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৪২ দশমিক ৮৮ মিলিমিটার। এর সঙ্গে জোয়ারের পানি ও পাহাড়ি ঢল যুক্ত হওয়ায় হঠাৎ করেই অতিমাত্রায় জলজট তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে আবহাওয়া অফিস।

চট্টগ্রামের পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ উজ্জল কান্তি পাল বলেন, 'রোববার বিকেল ৩টা থেকে সোমবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলেও তা হয়েছিল থেমে থেমে। কিন্তু শনিবার সকালে ছিল একটানা অতি ভারি বর্ষণ। এর সঙ্গে জোয়ারের পানি থাকায় হঠাৎ করে অতিমাত্রায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। মৌসুমি বায়ুর কারণে এভাবে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আজকালও মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকবে। তবে মঙ্গলবার থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।'

গতকাল ভোর থেকে পানি জমতে শুরু করে। সকাল ৯টা থেকে অস্বাভাবিকভাবে পানি বেড়ে যায়। এরপর থেকে একপ্রকার অচল হয়ে পড়ে বন্দরনগরী।

নগরীর দেওয়ান বাজার এলাকার ৩ নম্বর গলির বাসিন্দা মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, 'সোমবার বৃষ্টিপাতের কারণে বাসার মধ্যেই পানি জমে যায়। এতে ফ্রিজ, আসবাবপত্রসহ অনেক জিনিস নষ্ট হয়ে গেছে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে আবারও একই দুর্ভোগে পড়তে হলো। সকালে ঘুমে ছিলাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি বাসায় পানি থই থই করছে। কিছু বুঝে ওঠার আগে বাসাতেই এক হাঁটুর বেশি পানি জমে যায়। খাটের তোশক পর্যন্ত ভিজে যায়। এভাবে কি শহরে থাকা যায়!'

গতকাল সকাল ১১টার দিকে নগরীর মুরাদপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মুরাদপুর চৌরাস্তার মোড় প্রায় কোমরসমান পানিতে ভাসছে। নগরীর চকাবাজার-কাপাসগোলা এলাকার পরিস্থিতিও ছিল ভয়াবহ। বহদ্দারহাট থেকে চকবাজার পর্যন্ত সড়কটি সকাল থেকে একপ্রকার বন্ধই ছিল। গতকাল সকাল ১০টার দিকে দেখা যায়, সড়কের কাপাসগোলা অংশে প্রায় কোমরসমান পানি।

বহদ্দারহাট-বাদুরতলা দোকান মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, 'বহদ্দারহাট-সংলগ্ন আরাকান সোসাইটি ও বহদ্দারহাট-চকবাজার সড়ক অল্প বৃষ্টিতেই ডুবে যায়। সড়কটি ভরাট করে উঁচু করার পরও পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টিপাত শুরু হলেই আমরা আতঙ্কে থাকি। এবার হঠাৎ করে কীভাবে এত পানি জমে গেল, তা আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না।'

বহদ্দরহাট-সংলগ্ন শাহ আমানত আবাসিক সোসাইটির ব্যবসায়ী মো. খালেদ বলেন, 'চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছেন। কিন্তু চট্টগ্রামবাসী জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না। এর কি কোনো সমাধান নেই? আমরা কি এই জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাব না!'

জলাবদ্ধতার পানি সরানোর কাজে সেনাবাহিনী : বৃষ্টির পানি দ্রুত সরাতে গতকাল সকাল থেকে মাঠে কাজ করে সেনাবাহিনীর চারটি টিম। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৪০ জন সদস্য চারটি টিমে ভাগ হয়ে কাজ করছেন।

চউকের নির্বাহী প্রকৌশলী ও মেগা প্রকল্পের পরিচালক আহমেদ মাঈনুদ্দীন বলেন, 'ভারি বৃষ্টিপাত শুরুর পর থেকে জলাবদ্ধতা শুরু হলে দ্রুত পানি সরাতে মাঠে নামেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় চারভাগে বিভক্ত হয়ে কাজ করেছেন তারা। এ সময় তারা এসব এলাকায় কেন জলাবদ্ধতা হচ্ছে, তার কারণ চিহ্নিত করেছেন। এতে জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ করতে সুবিধা হবে।'

ভারি বর্ষণে পাহাড় ও দেয়ালধস :  শিশুসহ ৩ জনকে উদ্ধার :ভারি বৃষ্টিপাতের ফলে গতকাল সকাল ১১টার দিকে নগরীর বায়েজিদ থানার আরেফিন নগর নামে একটি এলাকায় একটি পাহাড়ে ধসের ঘটনা ঘটে। ব্যক্তিমালিকানাধীন এই পাহাড়ের একাংশ ধসে পড়ে গতকাল শনিবার দুই ব্যক্তি আটকে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ওই দুই ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। দুপুর ১২টার দিকে নগরীর গরিবুল্লাহ শাহ (রহ.) মাজার সংলগ্ন কুসুমবাগ আবাসিক এলাকায় আরেকটি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে নুসরাত শারমিন নামে এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে পাঠায়। এ ছাড়া গতকাল ভোরে সার্সন রোডে দেয়ালধসের ঘটনা ঘটে। এ সময় অবশ্য সড়কে যানবাহন চলাচল কম থাকায় বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের ওই কর্মকর্তা।

উপকূলীয় বাঁধ কাম রিং রোডের বিভিন্ন স্থানে ধস :  নগর রক্ষায় 'উপকূলীয় বাঁধ কাম আউটার রিং রোড'-এর কাজ চলছে। ভারি বৃষ্টিপাতের ফলে এই রোডের পতেঙ্গা চরপাড়ায় সাগরের পাশ ঘেঁষা ওয়াকওয়ের কয়েকটি অংশ ধসে পড়েছে। প্রকল্প পরিচালক ও চউকের প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস জানিয়েছেন, সাগরে পানি বেড়ে গেছে এবং এর সঙ্গে বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ায় কয়েকটি স্থানে ব্লক ধসে গেছে। এগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে মেরামত করা হবে। সূত্র: সমকাল

সর্বাধিক পঠিত

Comments

এই পেইজের আরও খবর

মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন

nazrul