adimage

২৪ এপ্রিল ২০১৮
সকাল ০১:১৮, মঙ্গলবার

আলী’র ঘাটেই মূল্যহীন আলী !

আপডেট  09:24 AM, নভেম্বর ২৬ ২০১৭   Posted in : জাতীয় অর্থ ও বাণিজ্য পাঁচফোড়ন     

আলী’রঘাটেইমূল্যহীনআলী!

শামীম আরমান, কেরানীগঞ্জ থেকে ফিরে:
একসময়ে একটি স্বপ্নকে পুঁজি করে শরিয়তপুরের জাজিরা থানার কাইজারচর গ্রাম থেকে কংক্রিটের শহর ঢাকায় এসেছিলেন গ্রামের সহজ সরল যুবক মো. আলী মিয়া। স্বপ্ন দেখেছিলেন ঢাকা শহরে তাঁর কষ্টে অর্জিত টাকা দিয়ে হবে এক টুকরো জমি হবে, সাথে হবে বাসস্থানের ব্যবস্থা। সেই লক্ষেই প্রথমে ১৯৬৫ সালে ঢাকার ইসলামবাগে ছোট্ট একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই নেন। দৈনন্দিন জীবনে বেঁচে থাকার জন্য প্রথমেই ছোটকাটরা এলাকার একটি প্লাস্টিক কারখানায় সপ্তাহে ৩ টাকা বেতনে কাজ করেন। এতে করে কোনরকম চলে যেত আলী মিয়ার জীবন। এভাবে একবছর যেতে না যেতেই চাকরিটি ছেড়ে দেন মো. আলী। ভাবেন এ করে নিজের কোন স্বাধীনতা বলতে কিছূ থাকে না। বছরখানেক পরে তিনি চিন্তা করেন ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকা চালিয়ে কর্মসংস্থানের নতুন যাত্রা শুরু করবেন। যেই কথা সেই কাজ। একটা নৌকা তৈরি করে নেমে পরলেন মাঝি হিসেবে। কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা পুলের ঘাট থেকে নদীর ওপার ইসলামবাগের চুনারঘাটের পাশেই যাত্রী নিয়ে নৌকা ভিড়াতেন। শুরু হল নতুন করে একটি ঘাট। টগবগে যুবক মাঝি দেখে অনেকে ভাবতেন এই ছেলেটা কেন নৌকার মাঝি হল। যে ওই ঘাট দিয়ে পার হত সে-ই কিনা কথাটা বলতো। একসময়ে সবাই তার নামটা জেনে গেল আলী মাঝি। দেখতে সুদর্শণ চেহারার অধিকারী।  প্রথম প্রথম অনেক সমস্যা হত। তবে একসময়ে সব ঠিক হয়ে গেল। এভাবে কয়েকবছরের মধ্যে আলীর ঘাট হিসেবে ঘাটটি তাঁর পরিচিতি লাভ করে। তখন পারাপার ছিল জন প্রতি তিন পয়সা করে। এভাবে কেটে যায় কয়েকটি বছর। 
১৯৭৩ সালে একাকিত্ব জীবনের অবসান ঘটিয়ে সংসার জীবনের অধ্যায় শুরু করেন আলী। বিয়ে করেন আছিয়া আক্তার নামে এক মেয়েকে। কয়েকবছর পর আলীর কোল জুড়ে আসে মেয়ে নাছিমা আক্তার  ও তার কয়েকবছর পর আরেক মেয়ে নাজমা আক্তার। দুই মেয়েকে নিয়ে মাঝি আলী ও আছিয়া দম্পতির পরিবারের আনন্দটাই নাকি অন্যরকম।
এভাবে কেটে যাচ্ছিল আলীর সংসার জীবন। তারপরে আবারো পর্যায়ক্রমে দুই পুত্র সন্তানের বাবা হন আলী মাঝি। সবমিলে আলী আছিয়া দম্পতির চার সন্তান যার মধ্যে বড় দু’জন মেয়ে ছোট দু’জন ছেলে।
সময়ের পরিক্রমায় সেই আলী ১৯৯৮ সালে কামরাঙ্গীরচরে একটি জায়গা কিনেন এবং সেখানে গড়ে তোলেন ছোট্ট একটি বাড়ি। ভালই চলছিল সংসার জীবন। ঠিক তখন ভাগ্যবিধাতার নিয়তির খেলায় আলীর সাজানো বাড়িটি সিডরে ভেঙ্গে যায়। 

জানা যায়, ২০০৪ সালে কামরাঙ্গিচরের বেঁরিবাধ হওয়ার সময় তার জমিসহ ঘরটি ভেঙ্গে ফেলতে হয়। যদিও তৎকালীন সরকার বলেছিল যারা আছে তারা কমবেশি ক্ষতিপূরণ পাবে। তবে কে পেয়েছে কে পায়নি তা জানা নেই আলীর। আলী পাইনি এতটুকু জানালেন অকপটে। এতে একদম নিস্বঃ হয়ে যায় মো. আলী মিয়া। তাতেও হাল ছাড়েনি মো. আলী। সে জানতেন জীবন জীবিকার একমাত্র হাতিয়ার নৌকার হাল ধরেই তাকে বাকি জীবনটা কাটাতে হবে। তাতেও আলী ভেঙ্গে পরেননি। তিনি জানেন ও মনে প্রানে বিশ^াস করেন রিজিকের মালিক আল্লাহ। আর তাই আল্লাহর উপর ভরসা রেখেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিবে আলী। 

সরেজমিনে গত সোমবার প্রিয় বাংলার এই প্রতিবেদক গিয়েছিল বুড়িগঙ্গা নদীর মাঝিদের জীবন সংগ্রামের গল্প জানতে। কিন্তু সেখানে যেয়ে আলী নামের এক মাঝির জীবন সংগ্রামের এমন গল্প পাবে তা জানা ছিলনা এই প্রতিবেদকের। 
গোধূলীর শেষ লগ্নে আলীর নৌকায় চেপে বুড়িগঙ্গার পানিতে ভেসে ভেসে জানা গেল আলীর সংগ্রামী জীবনের পেছনে লুকিয়ে থাকা আরেক গল্প। 

অশ্রুসিক্ত কন্ঠে আলী বললেন, “বাবা জীবনের কতটা বছর এই নৌকা করে মানুষ পারাপার করছি কেউ কখনো আমার কিংবা আমাদের মাঝিদের নিয়ে কিছু লেখে নাই, শোনেও নাই সুখ দুঃখের গল্প। আপনি এই প্রথম আসলেন। তিনি আক্ষেপ করে আরো বললেন, আমার নামের উপরে এই ঘাট আজও আছে অথচ আমি নিজেই প্রতিদিন এই ঘাটে সবার মত ৭০ টাকা ও পোলের ঘাটে  ৩০ টাকা করে টাকা খাজনা দেই। তখন দু’চোখে পানি ধরে রাখতে পারিনা।”

তিনি আরো বলেন, “এই ইসলামবাগে অনেকে আছে যারা আমার নৌকায় পার হয়ে কাজ করতে যাইতো এখন তাঁরা সাহেব। কি কমু বাবা আল্লায় যারে দেয় কে তারে ফিরায়।” এই প্রতিবেদক বলেন, আপনার নামে এখনো ঘাট এই ভাবতে কেমন লাগে বিষয়টা। আরলী বলেন, ‘প্রথমে বলুম ভাল। তবে এই ঘাটটা কয়েকবার নাম বদলাইতে চাইছে কয়েকজন। কিন্তু কেউ আলীর ঘাট ছাড়া চেনেনা। তাই মনে মনে বলি তোরা ইচ্ছা করলেই আমার নামটা বদলাতে পারবিনা।’ তখন তিনি তার পরিহিত সাদা গেঞ্জিটা ধরে ঝাকি দিয়ে বলে “আমি রাজা মহারাজা, লোকে দেখলে দূর থাইকা কয় কি, কেমন আছ আলী ভাই? এতেই আমার শান্তি রে বাবা।” 
এখন আলী স্ত্রী আছিয়া বেগম ও দুই ছেলেকে নিয়ে কামরাঙ্গীচরের একটি ভাড়া বাসায় থাকে। বড় ছেলে নূর ইসলাম কামরাঙ্গীচরের একটি মোবাইলের দোকানে চাকরি করে। এতে মাসে দশ হাজার ও ছোট ছেলে জহিরুল ইসলাম সোয়ারীঘাট এলাকার ছোট কাটরায় একটি রং ছাপা কারখানায় মাসে আট হাজার টাকা বেতনে কাজ করে। আর আমি সব মিলে দশ বারো হাজার টাকা পাই। এতে আমাদের ঘড় ভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ চলে যায় ১৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে খাওয়া দাওয়া অন্যান্য খরচ নিয়ে কোনরকম সংসারটা চলছে। মন চাইলে কাজ করি মন না চাইলে কাজ করি না। এই হল আমি আলী মিয়ার বর্তমান অবস্থা। এভাবেই সোজা সাপটাভাবে আলী মাঝি জানালেন তার বর্তমান জীবন ব্যবস্থার কথা।

এর আগে কথা হয় এই ঘাটের বয়োজেষ্ঠ মাঝি মো.আলাউদ্দিনের সাথে। তিনি সাংবাদিক পরিচয় জেনে বলে বাবা আমরা না হয় ঘাটের খাজনা দেই ঠিক আছে তবে আলী ভাই’র খাজনা দিতে হয় এটা আমাগো অনেক খারাপ লাগে। তাই আলীর ঘাটের মাঝিদের জোর দাবি ঘাট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যাতে আলী ভাইর ঘাটের খাজনা মওকুফ করেন এবং তাদের খাজনাগুলো কমিয়ে নেন। তারা আরো জানান, আগে এই ঘাটে অনেকরে কিছু দিতে হইত এখন আর হয় না। তার কথার সাথে সুর ধরে মাঝি বাদশা মিয়া, মো: বাবুল, শফিকুল সহ আরো অনেক মাঝি একই কথা বলেন। আর আলী মাঝির সরকারের প্রতি আকুল আবেদন সরকার যাতে তার নামের উপরে ঘাটটিকে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দিয়ে সারা জীবনের জন্য খাতা-কলমে রাখেন। তাতে শেষ নিশ^াস নিলেও লোকে যাতে নৌকা পার হলে বলে এই হল সেই ‘আলীর ঘাট’। এতেই তাঁর বড় শান্তি।

সর্বাধিক পঠিত

Comments

এই পেইজের আরও খবর

মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন

nazrul