adimage

১৫ অক্টোবর ২০১৯
সকাল ০২:১৩, মঙ্গলবার

৮ জেলায় বন্যার শঙ্কা

আপডেট  02:11 AM, অক্টোবর ০২ ২০১৯   Posted in : জাতীয়    

৮জেলায়বন্যারশঙ্কা

ঢাকা, ২ অক্টোবর :  বিহার ও পশ্চিমবঙ্গসহ ভারত এবং বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অতিবর্ষণের কারণে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। গঙ্গা হয়ে পদ্মায় নেমে আসছে বৃষ্টির পানি। ফলে সংলগ্ন নদ-নদীতে বাড়তে শুরু করেছে পানির উচ্চতা।

বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর ও চাঁদপুরে বন্যা আক্রান্ত হতে পারে। আবহাওয়া অধিদফতর বলছে, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে প্রায় সারা দেশে যে বৃষ্টিপাত হচ্ছে তা কয়েকদিন অব্যাহত থাকবে।

কথা হয় বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের (আইডব্লিউএফএম) অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, অতি বর্ষণের কারণে ভারতের বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। গঙ্গা হয়ে পদ্মায় আসছে বানের পানি। তবে খুশির দিক হচ্ছে যমুনায় পানিপ্রবাহ অনেকটা স্বাভাবিক। তাই পদ্মার এই বন্যা বেশিদিন স্থায়ী হবে না। আমরা এটাকে স্বল্পকালীন বন্যা বলতে পারি।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জানা যায়, নদীর তীর উপচে পানি ঢুকে পড়ছে লোকালয়ে। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের আড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাঈদ আনসারী বিপ্লব মঙ্গলবার বলেছেন, দু’দিন ধরে তার এলাকা বন্যায় আক্রান্ত। ডেঙ্গুর প্রকোপ কাটতে না কাটতেই বন্যা, এ যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, সুরমা ও কুশিয়ারা ছাড়া দেশের প্রায় সব প্রধান নদ-নদীর পানির সমতলই বৃদ্ধি পাচ্ছে। মঙ্গলবার সকাল ৯টায় পদ্মা নদীর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ ও শরীয়তপুরের সুরেশ্বর পয়েন্টে বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছিল।

আর কুষ্টিয়ার কুমারখালী পয়েন্টে গড়াই নদীর পানি বইছিল বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে। গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার নদীগুলোর পানি বৃদ্ধির এই প্রবণতা আগামী ৭২ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে এবং হার্ডিঞ্জ সেতু ও ভাগ্যকূল পয়েন্টে পদ্মার পানি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে মঙ্গলবার আভাস দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, এটি স্বাভাবিক বন্যা পরিস্থিতি। কয়েকদিন আগে বিহারের দিকে উজানে ভারি বৃষ্টি হয়েছে। তার প্রভাবেই বন্যা পরিস্থিতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এটি খুবই সাময়িক। এক সপ্তাহের মতো স্থায়ী হবে। ফারাক্কা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এতে ফারাক্কা বাঁধের কোনো প্রভাব নেই। এই মৌসুমে ভারতের অংশের ফারাক্কা বাঁধের গেটগুলো খোলাই থাকে। এ সময়ে নদীর যে আচরণ তা খুবই স্বাভাবিক। গত জুলাই মাসেও বন্যা হয়েছিল ভারি বৃষ্টির কারণে। এখন মৌসুমি বৃষ্টিপাতের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এখন যে পানি আসছে তা বৃষ্টিপাতের কারণে। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে ভারি বৃষ্টি হচ্ছে। পানি এখন নামতে শুরু করেছে। এ সময় সাময়িক বন্যা সৃষ্টি হবে। ১০ দিনের মতো স্থায়ী হতে পারে।

আবহাওয়া অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা জানান, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে প্রায় সারা দেশেই বৃষ্টি হচ্ছে। আরও কয়েকদিন থাকবে। যেহেতু উজানে বেশ বৃষ্টি হয়েছে, ওই পানি নামলে নদীর পানির উচ্চতা কিছুটা বেড়ে যেতে পারে।

রাজশাহীতে সরানো হচ্ছে চরের বাসিন্দাদের : রাজশাহী ব্যুরো জানায়, রাজশাহীর পদ্মা নদীর পানি বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। মঙ্গলবার দুপুরে বিপৎসীমার ৪৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল। নদীতে ব্যাপক স্রোত। রাজশাহীর চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের সরিয়ে নেয়া শুরু হয়েছে। পাউবোর রাজশাহী অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী ও নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ সাহিদুল আলম বলেছেন, ফারাক্কা বাঁধের গেট খোলা থাকায় ভারতের উত্তর প্রদেশ ও বিহারের বৃষ্টির পানি গঙ্গা নদী হয়ে পদ্মায় আসছে। তাই পদ্মার পানি বাড়ছে।

এদিকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় বলেছে, প্রতিবছর জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ফারাক্কা বাঁধের গেট খোলা থাকে। এটি নিয়মিত ব্যবস্থাপনার অংশ। গত কয়েকদিন গঙ্গা ও পদ্মা নদীর অববাহিকায় ভারি বৃষ্টি হচ্ছে। ফলে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশে বন্যার শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। জেলা-উপজেলায় স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা এবং জেলা পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। রাজশাহীর বাঘা, চারঘাট, পবা ও গোদাগাড়ী উপজেলার চরাঞ্চলের বেশকিছু গ্রামে পানি ঢুকে পড়েছে। বাঘার চরের ১১টি স্কুল রোববার থেকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

সেখানে প্রায় দুই হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। স্থানীয় এমপি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম তার ফেসবুকে জানান, পানিবন্দি মানুষকে সরিয়ে নিতে ডিসিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ সাহিদুল আলম জানান, গোদাগাড়ীর ৭৬টি ও চারঘাটের ২৬টি পরিবারকে পদ্মার চর থেকে নিরাপদে সরিয়ে আনা হয়েছে। বাকিদেরও আনা হবে। তবে পানি শহরে প্রবেশ করবে না।

পাবনায় কয়েক হাজার একর জমির ফসল প্লাবিত : পাবনা প্রতিনিধি জানায়, মঙ্গলবার বেলা ১১টায় পাকশী হার্ডিঞ্জ সেতু পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। পাবনার জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ বলেছেন, পদ্মার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় সবাই সচেষ্ট আছেন। আমরা নজর রাখছি। পানি উন্নয়ন বোর্ড পাবনার উপ-সহকারী প্রকৌশলী সানজানা নাজ জানান, গত কয়েকদিন ধরেই পদ্মার বিভিন্ন পয়েন্টে ৫-৬ সেন্টিমিটার করে পানি বাড়ছে।

প্রতি ঘণ্টায় পানি বাড়ছে এবং মঙ্গলবার বেলা ১১টায় পদ্মায় পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে। ফলে নদীতীরবর্তী প্রায় ৫শ’ হেক্টর ফসলি ও নিচু জমি প্লাবিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েক হাজার একর জমির ফসল। পাকশী ইউপি চেয়ারম্যান এনামুল হক বিশ্বাস জানান, তার ইউনিয়নের রূপপুর সড়কের ধারে নিচু অংশ তলিয়ে গেছে। প্রতিদিনই পাকশীর বিভিন্ন স্থানে নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।

ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল লতিফ বলেন, আখ, ফুলকপি, গাজর, মাষকলাই, মুলা, বেগুন, শিম, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, ধানসহ ৪০০ হেক্টর জমির সবজি তলিয়ে গেছে। বেশি ক্ষতি হয়েছে লক্ষ্মীকুণ্ডার দাদাপুর, চরকুরুলিয়া, কামালপুর ও বিলকেদায়।

বঙ্গবন্ধু কৃষিপদক পাওয়া কৃষক সিদ্দিকুর রহমান ময়েজ ওরফে কুল ময়েজ জানান, কয়েকদিনের টানা বর্ষণে মাঠের সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পদ্মার পানি হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম বলেন, যে গতিতে পানি বাড়ছে, তাতে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই পদ্মার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করবে। পাবনার বাংলাবাজার লঞ্চঘাট, সুজানগরে নাজিরগঞ্জ, চলনবিল, বড়াল, গোমতী, চিকনাইসহ ছোটখাটো বিলে পানি বেড়েছে।

ভেড়ামারায় হার্ডিঞ্জ পয়েন্টে ২৪ ঘণ্টায় বেড়েছে ১৮ সেন্টিমিটার পানি : ভেড়ামারা (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি জানান, ভেড়ামারার হার্ডিঞ্জ সেতু পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৭ সেন্টিমিটার বেড়ে অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা, দৌলতপুর উপজেলায় প্রায় ৪০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ১০ হাজারের বেশি মানুষ। -যুগান্তর

সর্বাধিক পঠিত

Comments

এই পেইজের আরও খবর

মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন

nazrul