adimage

২৭ মে ২০১৮
সকাল ০৭:৩০, রবিবার

বিচার বিভাগের অবক্ষয় চলছে

আপডেট  09:46 AM, ফেব্রুয়ারী ০৫ ২০১৮   Posted in : জাতীয়    

বিচারবিভাগেরঅবক্ষয়চলছে

ঢাকা, ৫ ফেব্রুয়ারি : বেশ কয়েক বছর ধরে দেশের বিচার বিভাগের ‘অবক্ষয়’ চলছে মন্তব্য করে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে বিচারব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। গতকাল সুপ্রিমকোর্টে নতুন প্রধান বিচারপতির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মাহবুবে আলম এ কথা বলেন।

এদিকে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি বলেন, রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের (আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগ) কাজের মধ্যে যেন সমন্বয় রক্ষা করা যায়, সে জন্য সব সময় চেষ্টা করব।

প্রধান বিচারপতিকে অভিনন্দন জানাতে গিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, সবচেয়ে ভয়াবহ যে বিষয়টি, তা হলো- বিশেষ বিশেষ কোর্ট, বিশেষ বিশেষ আইনজীবীর কোর্ট হয়ে গেছে এবং অনেক সময় অনেক সিনিয়র অ্যাডভোকেটের কাছ থেকে ব্রিফ নিয়ে তাদের নিয়োগ দান করা হচ্ছে। বিচারপ্রার্থী ব্যক্তিরা অনেকে জেনে গেছেন, কোন কোর্টে কাকে নিয়ে গেলে মামলা জেতা যাবে। এটি তো ন্যায়বিচারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এ বিষয়ে অনেকেই ছুটছেন বিচারপতিদের সন্তান ও স্ত্রী, যারা আইনজীবী হিসেবে নিয়োজিত আছেন তাদের দিকে। তাদের চিন্তা- এদের নিয়ে গেলে হয়তো মামলায় জেতা যাবে। বিচারপতিদের আত্মীয় বা সন্তানরা আগেও এ পেশায় ছিলেন; কিন্তু কখনো এ রূপ অবস্থার সৃষ্টি হয়নি। এখন কেন বিচারপ্রার্থীদের আচরণ এ রূপ হচ্ছে তা খতিয়ে দেখা দরকার।

বিচার বিভাগ নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সাধারণ জনগণের কাছে আদালতের যে ভাবমূর্তি ছিল তাতে পরিবর্তন ঘটেছে। ইতিপূর্বে একজন প্রধান বিচারপতিকে এ আদালতে সংবর্ধনা দেওয়ার সময় আমি এ অবক্ষয়ের কিছু নমুনা তুলে ধরেছিলাম এবং আমার এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি তদন্তের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন ও তদন্ত অনেকটা অগ্রসরও হয়েছিল; কিন্তু যখন পরবর্তী প্রধান বিচারপতি এলেন, ওনার দপ্তর থেকে সেই ফাইলটি নিখোঁজ হয়ে গেল।

তিনি বলেন, হাইকোর্ট বিভাগের বিভিন্ন বেঞ্চের সম্বন্ধে যেসব আলোচনা হয় তা এখানে প্রকাশ করার মতো নয়। শুধু ভাবি ১৯৭৫ সালে যখন এই আদালতে ঢুকেছিলাম, তখন একজন বেঞ্চ অফিসার সম্বন্ধেও কোনোরূপ বিরূপ মন্তব্য শুনিনি। মাহবুবে আলম বলেন, হয়তো দেখা যায়, চার বছর আগের করা মামলা লিস্টে বহাল তবিয়তে আছে। অথচ দুই মাস আগের করা মামলা চূড়ান্ত শুনানি হয়ে যাচ্ছে। আদালতের কিছু অসাধু কর্মচারী মামলা নিচের থেকে উঠানোর কাজ করে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। কিছু মামলা শুনানি করা যাচ্ছে না। আবার কিছু মামলা শুনানি হয়ে যাচ্ছে রকেটগতিতে।

বিচারকদের এজলাসে ওঠা প্রসঙ্গে রাষ্ট্রের প্রধান এ আইন কর্মকর্তা বলেন, এ আদালতে যোগদানের পর দেখেছি- সকাল সাড়ে ১০টায় ঠিক কাঁটায় কাঁটায় অনেক বিচারপতি এজলাসে বসতেন এবং কোর্টে আসীন হওয়া ও কোর্ট থেকে নেমে পড়ার ব্যাপারে কজলিস্টে যে সময় দেওয়া আছে, তার কোনো ব্যত্যয় হতো না; কিন্তু এখন কজলিস্টে যে সময় ধার্য করে দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে বিচারকদের আদালতে ওঠা বা নামার কোনোই সঙ্গতি নেই। এ অবস্থা চললে বিচারব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। আমি মনে করি, আদালতের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ভেতরে একটি বিরাট অংশ ইতোমধ্যে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন এবং যারা এখনো সৎ আছেন, এভাবে চলতে থাকলে তাদের পক্ষেও সততা বজায় রাখা কঠিন হবে।

কোনো কোনো বেঞ্চের বিচারপতি সম্পূর্ণ তার বেঞ্চ অফিসারের ওপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন দাবি করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ওই বিচারপতিরা আইনজীবীদের কথায় কোনো কর্ণপাত করেন না এবং তারা পরিচালিত হন তাদের বেঞ্চ অফিসারদের প্রভাবে। ইতোমধ্যে এক বিচারপতি অবসরে গেছেন। তার প্রতিটি মামলার রায়ই ছিল একই রকম বাক্যসমৃদ্ধ এবং অনেকে হাসাহাসি করতেন এই কথা বলে যে- তার হয়ে তার রায় লিখে দিচ্ছেন বেঞ্চ অফিসার। এ ছাড়া  তিনি অবসরে যাওয়ার আগে মামলা শুনানির জন্য প্রস্তুত না হওয়া এবং কজলিস্টে মামলাটি না থাকা সত্ত্বেও রায় প্রদান করেন। কোনো কোনো বিচারপতি মামলা কজলিস্টে না এনেও জামিন বা স্থগিতাদেশ প্রদান করছেন, যা ইতোমধ্যে আপনাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে?

মাহবুবে আলম বলেন, ইতোমধ্যে আদালতের রায় নিয়ে জালজালিয়াতি শুরু হয়ে গেছে। আদালত থেকে জামিন দেওয়া হয়নি অথচ জামিনের কাগজ তৈরি করে আসামিরা জেল থেকে বেরিয়ে গেছে। কীভাবে ইনফরমেশন টেকনোলজিকে আদালতের কাজে আরও ব্যবহার করা যায়, সে ব্যাপারে নিশ্চয়ই আপনি ব্যবস্থা নেবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করি। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ইংরেজিতে একটি কথা আছে-  ‘ফোরাম শপিং’ অর্থাৎ একটি বেঞ্চে কোনোরূপ প্রতিকার না পেয়ে আইনজীবীরা দরখাস্তটি ফেরত নেন এবং অন্য আদালতে পুনরায় দাখিল করে প্রতিকার নেন। এ ধরনের ‘ফোরাম শপিং’ বন্ধ করা উচিত।

আপিল বিভাগ থেকে ঢাকায় ও মফস্বলে জুয়া খেলাকে অবৈধ ঘোষণা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের চাকরির বয়সসীমা নিয়ে রায় দেওয়ার পরও হাইকোর্ট থেকে অনুরূপ মামলায় স্থগিতাদেশ দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ না নেওয়া হলে বিচারিক অরাজকতা বৃদ্ধি পাবে বলে মন্তব্য করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

তিনি বলেন, এর আগে চেম্বার জজ আদালতে এত মামলা দেখা যায়নি বলে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। এটি সত্য। কারণ হলো- এর আগে হাইকোর্টে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ মামলায় রুল ও অন্তবর্তী আদেশ হতো; কিন্তু এখন ৯৯ শতাংশ মামলায় রুল দেওয়া হয় এবং কদাচিৎ ফেরত দেওয়া হয়। বহু ক্ষেত্রে আপিল বিভাগের ঘোষিত নির্দেশ লঙ্ঘন করে হাইকোর্ট বিভাগ আদেশ প্রদান করে থাকেন। আমি ঢালাওভাবে হাইকোর্টের সব বেঞ্চের জন্য একথা বলছি না। অনেক বিচারকই বিচারকাজ হাতের মুঠোয় রেখেছেন এবং আদালতের কর্মকর্তারা তাদের কথামতো কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। সঠিকভাবে ও আইনজীবীদের প্রত্যাশামতো তারা তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন; কিন্তু কিছু আদালত চালানোর অব্যবস্থা দ্বারা সমস্ত বিচারালয়ের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। তার কারণ, সুগন্ধের পরিধি হয় সীমিত অথচ দুর্গন্ধের পরিধি হয় বিস্তৃত।

মাহবুবে আলম বলেন, আপনার স্ত্রী দেশের প্রথম ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ ও পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র সচিবের কন্যা এবং তিনি একজন আইনজীবী; কিন্তু আপনি আপনার ভাবর্মূর্তিতে কোনরূপ দাগ পড়–ক তা চিন্তা করে তাকে আদালতে আইন পেশা করতে দেননি।

মাহবুবে আলম বলেন, সংবিধানের বিধানমতে- আপনি ২০২১ সালের শেষ দিন পর্যন্ত প্রধান বিচারপতির পদে আসীন থাকবেন। এ সময়টি একটি দীর্ঘ সময়, প্রায় চার বছর সময়। বর্তমানে আমাদের বিচার বিভাগের যে অবস্থা, আপনার এই সময়কালে তাতে আপনি আমূল পরিবর্তন আনতে পারেন, যদি এ বিষয়ে আপনি দৃঢ়ভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন।

তিনি বলেন, ইদানীং ষোড়শ সংশোধনী মামলায় সরকার হেরে  গেছে সত্য। আমার বিবেচনায় সরকার হেরেছে; কিন্তু ইতিহাস জিতেছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তৎকালীন সরকার  যেহেতু চায়নি বিচার হোক, সে জন্য বিচারই শুরু হয়নি। যখন বিচার শুরু হলো, এ আদালতেরই অনেক বেঞ্চ মামলা শুনতে চায়নি এবং সে সময়ে কোনো রায়ে বঙ্গবন্ধুর নামও উল্লেখ করা হয়নি; কিন্তু ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ে প্রত্যেক বিচারক বঙ্গবন্ধুকে তার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নামে উল্লেখ করেছেন ও জাতির পিতা হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনের সময়ে জনতা বঙ্গবন্ধুকে যে নামে ভূষিত করেছিলেন, আদালতের রায়ে সে উপাধি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ফলে আমরা ধরে নিতে পারি- ভবিষ্যতের বিচারপতিরাও বঙ্গবন্ধুকে তার এ নামেই উল্লেখ করবেন এবং এই সর্বোচ্চ আদালত কোনোভাবেই ইতিহাস বিকৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবে না’- যোগ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

এদিকে নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেছেন, ‘রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের (আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগ) মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে কেবল একটি দেশ উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতে পারে। যেখানে তিন অঙ্গের মধ্যে কাজের সমন্বয়ের অভাব থাকে, সেখানে উন্নয়ন ব্যাহত হবে। সুপ্রিমকোর্ট যেন সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকে সংবিধান অনুযায়ী নিজ দায়িত্ব পালন করে, সেটিও আমি নিশ্চিত করতে চেষ্টা করব।’

প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, ‘বিচারকদের সবচেয়ে বড় শক্তি সততা। তার জবাবদিহির জায়গা হচ্ছে নিজের বিবেক। সংবিধান ও দেশের আইন তার একমাত্র অনুসরণীয়। শপথকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে কারো প্রতি অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হয়ে বিচারকাজ পরিচালনা করা হবে তার দায়িত্ব। বিচারক যদি শুধু তার শপথ অনুযায়ী বিচারকাজ পরিচালনা করেন, তা হলে তার জন্য আলাদা অনুসরণীয় আচরণবিধির তেমন প্রয়োজন হয় না।’ বিচারকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমি আশা করব, আমার সহকর্মী সকল বিচারক সব সময় তাদের শপথের মূল বাণী হৃদয়ে প্রোথিত করে জনগণ ও মানবতার কল্যাণে সংবিধানকে সামনে রেখে বিচারকাজ পরিচালনা করবেন।’

মামলাজটকে সবচেয়ে বড় সমস্যা উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, এই সমস্যা সমাধানে আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
বিচার বিভাগের অগ্রসরতার জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন, তার সব কিছু করার চেষ্টা করব উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, বিচার বিভাগের জন্য বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি, বিচারকদের দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ, একটি ন্যাশনাল জুডিশিয়াল একাডেমি প্রতিষ্ঠা, মামলা অনুপাতে বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিচার প্রক্রিয়ার গতি ত্বরান্বিত করতে সমন্বিত প্রচেষ্টা চালানো ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা আমার প্রাথমিক লক্ষ্য। সকল স্তরের বিচারকরা যেন তাদের এজলাস সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার করেন, সেটি নিশ্চিত করতে চেষ্টা করব। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংবিধানের ৯৫ (২) (গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচারপতি নিয়োগের আইন প্রণয়ন অপরিহার্য বলেও তিনি মন্তব্য করেন। প্রধান বিচারপতি হিসেবে ফেব্রুয়ারি মাসে শপথ গ্রহণ করায় ভাষার প্রতি সম্মান দেখিয়ে তিনি বাংলায় বক্তব্য প্রদান করেন বলেও জানান।

সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন দেশের ২২তম প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। রবিবার বিকাল পৌনে ৫টায় তিনি স্মৃতিসৌধে পৌঁছান। পরে ফুল দিয়ে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এ সময় শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। সেখানে তার সঙ্গে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের সব বিচারপতি, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার জেনারেলসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। -আমাদের সময়

সর্বাধিক পঠিত

Comments

এই পেইজের আরও খবর

মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন

nazrul