২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
সকাল ৭:১১, রবিবার

ক্যান্সার আক্রান্ত মা তার সন্তানকে যা দিয়ে গেলেন

ক্যান্সার আক্রান্ত মা তার সন্তানকে যা দিয়ে গেলেন 

C55re

নিউজ৬৯বিডি ডেস্ক : সিরিয়ার লায়াল মাহফৌদ, যে তার ক্যান্সার আক্রান্ত মায়ের শিক্ষা অনুযায়ী পথ চলে। তার মা তাকে শিখিয়েছে ভবিষ্যতের জন্য কিভাবে নিজেকে শক্ত হতে হয়।

যদিও তার মা এখন আর পৃথিবীতে নেই, কিন্তু লায়াল কেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স শুরু করেছে সেটা উনি দেখে গেছেন।

মায়ের উৎসাহ ও জীবন সম্পর্কে বাস্তব পরামর্শ অনুযায়ীই পথ চলছে লায়াল।-বিবিসি

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

লক্ষ্মীপুরে ‘নতুন সংবাদ২৪ ডট কম’ এর যাত্রা শুরু 

08455

লক্ষ্মীপুর, ৪ আগস্ট : হাটি-হাটি পা-পা করে দীর্ঘদিন পরীক্ষামূলক সম্প্রচারের পর লক্ষ্মীপুরে অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘নতুন সংবাদ২৪ ডট কম’ এর যাত্রা শুরু হয়েছে।  আজ বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টার দিকে লক্ষ্মীপুর শহরের কুটুমবাড়ি রেস্টুরেন্টে এর উদ্বোধন করা হয়।

‘সত্য ও ন্যায়ের পথে প্রতি মুহূর্ত’ এ শ্লোগানকে সামনে রেখে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ফিতা কেটে অনলাইন পত্রিকাটির শুভদ্বোধন ঘোষণা করেন লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান একে এম সালাহ্ উদ্দিন টিপু।

এর আগে পত্রিকাটির উদ্বোধন অনুষ্ঠান উপলক্ষে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। নতুন সংবাদ টুয়েন্টি ফোর ডট কমের  সম্পাদক ও প্রকাশক বেলাল উদ্দিন সাগরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান একে এম সালাহ্ উদ্দিন টিপু, লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ জুনায়েদ কাউচার, জেলা তথ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন, দৈনিক খবর পত্রিকার লক্ষ্মীপুর জেলা  প্রতিনিধি মোঃ ইসমাইল হোসেন জবু, দৈনিক মাবকন্ঠের জেলা প্রতিনিধি মোঃ আবুল কালাম আজাদ, বাংলানিউজ২৪ডট কমের ষ্টাফ রিপোর্টার মো: সাজ্জাদুর রহমান, দৈনিক কালের প্রভাহের নির্বাহী সম্পাদক মীর ফরহাদ হোসেন সুমনসহ সদর উপজেলা যুবলীগের আহবায়ক ও শাকচর ইউপি নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান তাফাজ্জল হোসেন চৌধুরী টিটু, যুগ্ন আহবায়ক মাহবুবুল হক মাহবুব।

এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন- সাংবাদিক কিশোর কুমার দত্ত, জামাল উদ্দিন বাবলু, এসএ টিভির লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি সহিদুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম জয়, মোস্তাফিজুর রহমান টিপু, ফয়জুল আজিম শিশির, মাস্টার মোঃ মফিজ উদ্দিন, আনিছ কবির, রাকীব হোসেন রনি, সাজ্জাদুর রহমান ফরহাদ, পলাশ সাহা, মোবারক হোসেন, জহিরুল ইসলাম শিবলু, রুবেল হোসেন, মিশু সাহা নিক্কন, রাকিব হোসেন, ওয়াছী উদ্দিন, মোঃ ইউছুফ প্রমুখ।

বক্তারা নতুনসংবাদ টোয়েন্টিফোর ডটকমের দ্রুত প্রচার ও প্রসার কামনা করে বলেন, তথ্য প্রযুক্তি মানুষকে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সীমাহীন স্বাধীনতা দিয়েছে। দায়িত্বশীলতার সাথে এই স্বাধীনতার সদ্বব্যবহার করতে হবে। তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সঠিকভাবে যোগাযোগ নীতি অনুসরণ করতে হবে।  এর ব্যবহারের মাধ্যমে অন্যের জীবনে ক্ষতি বা হুমকি সৃষ্টি করা যাবে না। মানুষের সুখ-দুঃখের কথা এই অনলাইন পত্রিকায় ফলাও করে প্রচার করলে এই জনপদের মানুষ অনেক বেশি উপকৃত হবে।

বক্তারা আরো বলেন, বর্তমান সরকার তথ্য প্রযুক্তিতে বিপ্লব ঘটিয়েছে।  লক্ষ্মীপুর থেকে প্রকাশিত নতুনসংবাদ টোয়েন্টিফোর ডটকম নামে অনলাইন  প্রত্রিকাটি জেলার উন্নয়ন সমস্যা সম্ভাবনা ঐতিহ্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকাশ করবে।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

দলীয়ভাবেই নির্বাচন 

33

ঢাকা, ১২ অক্টোবর : দলীয়ভাবেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে আইন পরিবর্তনের জন্য আজ মন্ত্রিসভা বৈঠকে উঠছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পদ্ধতি সংশোধনী ৫টি বিল। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে জাতীয় সংসদ অধিবেশন না থাকায় এবং বিষয়টি জরুরি বিবেচনায় নিয়ে এ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারির অনুমোদনের জন্যই মন্ত্রিসভা বৈঠকে বিলগুলো উত্থাপন করা হচ্ছে। তবে রাজনীতি বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এটি দেশের গণতন্ত্রের জন্য খুব একটা সুফল বয়ে আনবে না, বরং উল্টো ফল হতে পারে। সহিংসতা বাড়তে পারে তৃণমূলে। তাদের পরামর্শ, স্থানীয় সরকার নির্বাচন পদ্ধতি পরিবর্তনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো ও স্থানীয় সরকার কাঠামোয় পরিবর্তন আনা জরুরি।

দীর্ঘদিন ধরেই দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আলোচনা চলছিল। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোও এমন দাবি জানিয়ে আসছিল। অবশেষে সে দাবি পূরণে পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। আজ মন্ত্রিসভায় বিলগুলো অনুমোদন পেলে স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ- এই ৫ স্তরের নির্বাচন দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হবে। এসব নির্বাচনে আগে রাজনৈতিক দলগুলো সমর্থন জানাতে পারলেও দলীয় ব্যক্তিকে সরাসরি প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিতে পারত না। সংশোধিত আইনটি অনুমোদন পেলে দলীয়, এমনকি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন প্রার্থীরা।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, আগে স্থানীয় সরকার কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে হবে। কাঠামো পরিবর্তন না করে দলীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করলে চেয়ারম্যান হয়ে যাবেন একদলীয়। কাঠামো পরিবর্তন করে যখনই একটি ককাস/কাউন্সিল গঠনের ব্যবস্থা করা হবে, তখন সেখানে অনেক দলের সদস্য থাকবেন। এর মধ্য থেকে একজনকে চেয়ারম্যান বা মেয়র নির্বাচনের জন্য তখন প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যাবে। ফলে যোগ্য লোকজনও নির্বাচনে অংশ নেবেন। এতে অন্যান্য দল এমনকি স্বতন্ত্র হিসেবে প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে। এ জন্য রাজনৈতিক দলে এবং স্থানীয় সরকার কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে হবে। তাহলেই সুফল মিলবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় বলা হলেও প্রকারান্তরে দলীয়ভাবেই এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এখন আইন পরিবর্তনের পর এ নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু হবে সেটাই বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে।

সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে হলে তৃণমূলে সহিংসতা বাড়বে। মনোনয়ন বাণিজ্য এবং পেশিশক্তির মহড়া চলবে। দলীয়ভাবে নির্বাচন হলে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী হবে না। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। তিনি আরও বলেন, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বিশেষ করে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে, পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন কমিশন উৎসাহের সঙ্গে অপকর্মের দোসর হয়েছে। ভোট কারচুপিসহ বিভিন্ন অনিয়ম হয়েছে তখন। আমার মতে, এতে সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে। তাই এতে ইতিবাচক কিছু দেখছি না। আমরা দলের নামে সহিংসতা, সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ি। দলীয়ভাবে নির্বাচনের ফলে তৃণমূলেও একদলীয় লোক ক্ষমতায় বেশি আসবে।

জানা গেছে, দলীয়ভাবে নির্বাচন নিয়ে আজকের মন্ত্রিসভা বৈঠকে সম্পূরক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা রয়েছে ৫টি বিল- ১. স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) (সংশোধন) আইন, ২০১৫-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন।  ২. উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন, ২০১৫-এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন। ৩. জেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন, ২০১৫-এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন। ৪. স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) আইন, ২০১৫-এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন। ৫. স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) আইন, ২০১৫-এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন।

স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে ৫ স্তরের স্থানীয় সরকারব্যবস্থা বিদ্যমান। এগুলো সরাসরি ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি দ্বারা পরিচালিত। তবে নির্দলীয়ভাবে এসব নির্বাচন হলেও বাস্তবে প্রতিটি রাজনৈতিক দল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্বাচনে দলীয় ব্যক্তিকে সমর্থন দিয়ে থাকে। এ ছাড়া অনেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের মতে, রাজনৈতিক দলের সরাসরি অংশগ্রহণে এসব নির্বাচন হলে প্রার্থীদের দায়বদ্ধতা বাড়বে। সুযোগ হবে রাজনৈতিক অঙ্গীকার পালনের। এক্ষেত্রে মনোনয়ন প্রদানকারী রাজনৈতিক দল তাদের নীতি-আদর্শ বাস্তবায়নে এবং জনস্বার্থ রক্ষায় মনোনীত প্রার্থীর কর্মকা- নজরদারি করবে। এরই অংশ হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশন আইনে সংশোধনী আনা হচ্ছে। আজকের মন্ত্রিসভায় এসব আইনের সংশোধনীর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে অধ্যাদেশ জারি করা হতে পারে।

ইউনিয়ন পরিষদ
বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী, চেয়ারম্যান, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্যসহ অন্য সদস্যদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের শর্ত হিসেবে রাজনৈতিক দল কর্তৃক প্রার্থী মনোনয়নের সুযোগ নেই। এটি ১৫ অক্টোবর, ২০০৯-এ গেজেট হিসেবে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে ২০১০ সালের ১২ অক্টোবর এটি ইউনিয়ন পরিষদ, (সংশোধন) আইন, ২০০৯ গেজেট হিসেবে প্রকাশ হয়। এ অবস্থায় আইনের কিছু কিছু ধারা সংশোধন/প্রতিস্থাপন/সংযোজন করতে ইউনিয়ন পরিষদ (সংশোধন) আইন, ২০১৫-এর খসড়া বিল প্রস্তুত করা হয়েছে।

উপজেলা পরিষদ
বর্তমানে উপজেলা পরিষদ আইন, ২০১১ অনুযায়ী চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানরা রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীর বিষয়টি উল্লেখ করতে পারেন না। উপজেলা পরিষদ আইন, ১৯৯৮ সংশোধন হয়ে বর্তমানে ২০১১ অনুযায়ী চলছে। তাই দলীয়ভাবে এবং স্বতন্ত্র হিসেবে অংশগ্রহণের সুযোগ উল্লেখ করে আইনের নতুন খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এটি উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন, ২০১৫ হিসেবে অনুমোদন পেতে পারে।

পৌরসভা
পৌরসভা আইন, ২০০৯ অনুযায়ী বর্তমানে পৌরসভার মেয়র এবং কাউন্সিলররা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করতে পারেন না। তাই পৌরসভা আইন, ২০০৯-এর কিছু ধারা সংশোধন/প্রতিস্থাপন/সংযোজন করে পৌরসভা (সংশোধন), আইন ২০১৫-এর খসড়া বিল তৈরি করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।

সিটি করপোরেশন
বিদ্যমান সিটি করপোরেশন আইন, ২০০৯-এ সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং কাউন্সিলর প্রার্থীদের যোগ্যতা বা অযোগ্যতার শর্ত হিসেবে রাজনৈতিক দল কর্তৃক মনোনয়নের সুযোগ নেই। তাই কিছু ধারা পরিবর্তন বা সংযোজন করে সিটি করপোরেশন আইন (সংশোধন), ২০১৫-এর খসড়া বিল তৈরি করা হয়েছে।

জেলা পরিষদ
বিদ্যমান জেলা পরিষদ আইন, ২০০০ অনুযায়ী চেয়ারম্যান এবং সদস্যরা রাজনৈতিক দল কর্তৃক মনোনীত হতে পারেন না। তাই রাজনৈতিক দলের শর্তটি সন্নিবেশিত করে এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে প্রস্তাবিত জেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন, ২০১৫-এ। আজ সকালে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে অনুষ্ঠেয় মন্ত্রিসভা বৈঠকে এসব বিল উত্থাপন করার কথা। -আমাদের সময়

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

মাজারই যাদের ঘরবাড়ি 

89241_f1

ঢাকা, ২৪ আগস্ট : দিলশাদের বাড়ি সিরাজগঞ্জ। বয়স আনুমানিক ৬০। দু’ছেলে আয়-রোজগার করে। কিন্তু এসব তাকে টানে না। মাঝে মাঝে বাড়িতে গেলেও ১০ দিনের বেশি থাকতে পারেন না। অজানা এক আকর্ষণে আবার ফিরে আসেন মাজারে। এক বেলা খাবার নিশ্চিত। বাকি দু’বেলা কখনও খান, কখনও খান না।

রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলীর মাজার। দিলশাদের মতো হাজার মানুষের লোকসমাগম ঘটে এই মাজারে। প্রতিদিনই মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে মানোবাসনা পূরণ করতে মানত করতে আসেন। কেউ একদিন, কেউ দুই-তিন দিন অবস্থান করেন। আর দিলশাদের মতো মানুষেরা দিনের পর দিন অবস্থান করেন। মাজারকেই ঘরবাড়ি বানিয়ে নিয়েছেন তারা। দিলশাদের মতো মাজারে থাকা হাজারও মানুষের প্রত্যেকের জীবনে রয়েছে আলাদা গল্প। তেমনই একজন সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার জামালপুর গ্রামের ইরন আলী। ৪০ বছর ধরে তিনি মাজারে আসা-যাওয়া করেন। ৫৫ বছরের ইরন আলী জীবনের বেশির ভাগ সময় মিরপুর মাজারে কাটালেও দেশের ভেতর এবং পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বিভিন্ন মাজারে ঘুরেন মাঝে মাঝেই। তবে সীমানা পার হতে তার ভিসা পাসপোর্ট লাগে না। আবার জন্ম থেকে মাজারেই বেড়ে ওঠে জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছেছেন অনেকে। মাজারই তাদের পৃথিবী।

বৃস্পতিবার বিকালে মাজারে কথা হয় দিলশাদ ও ইরন আলীর সঙ্গে। তারা জানান, তাদের জীবনের নানা অধ্যায়। সিরাজগঞ্জের দিলশাদ জানান, মায়ের গর্ভে থাকতেই তার চাচাতো বোন মাকে বলেছিল চাচি তোমার দিলশাদ আসছে। তাই জন্মের পর ওই নামই রাখা হয়। বলেন, নামটা তার রাজকীয় হলেও কপালের ফেরে আজ তিনি পথে পথে। তিন বছর ধরে পড়ে আছেন মাজারে। স্মৃতিচারণ করে বলেন, সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কাওয়াকোলায় বাড়ি ছিল তাদের। বাবা ছিলেন গেরস্ত। জামি-জমা ছিল। কিন্তু নদীভাঙনে এক সময় ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে যায়। যেটুকু বাকি ছিল পেটের ভাত যোগাতে বাবা বিক্রি করে দেয়। এক সময় ভূমিহীন হয়ে চলে আসেন সিরাজগঞ্জ শহরে। বর্তমান সিরাজগঞ্জ শহরের ওয়াপদার ভেতরে সরকারি জায়গায় দুই ছেলে ও তাদের সংসার নিয়ে বসবাস। ছোট বেলায় ভূমিহীন হয়ে পড়ায় শহরে এসে লক্ষ্মী সিনেমা হলের সামনে একটি চায়ের দোকানে কাজ নেন। সময়টা না বলতে পারলেও তিনি জানান, তখন আইয়ুবের আমল ছিল। দোকানে তার কোন মজুরি ছিল না। সিনেমা হলে চা বয়ে দেয়ার বিনিময়ে যে বকশিশ  দিতো তা তার জন্য যথেষ্ট ছিল। সারাদিনে ৪ আনা জুটতো। তাই নিয়ে বেশ খুশি থাকতেন। আর থাকা-খাওয়া ছিল মালিকের অধীনে। এরপর সময় গড়িয়ে যায়, বিয়ে করেন। বিভিন্ন জায়গায় দিন মজুরের কাজ করেন। দিলশাদ বলেন, জিয়ার আমলে ঢাকায় এসে সদরঘাটে দিনমজুরের কাজ করতেন। তখনই একদিন এই মাজারে আসেন বেড়াতে। এরপর আর মাজারে আসেননি। এরশাদের আমলে ফরিদপুরে একটি চায়ের দোকান দেন। গত তিন বছর ধরে তিনি এই মাজারে। তবে এর পেছনেও রয়েছে তার জীবনের করুণ গল্প। ৪ বছর আগে একদিন সারাদিন দোকান করে রাতে বাইসাইকেলে করে বাড়ি ফিরছিলেন। এ সময় পেছন থেকে একটি ট্রাক এসে তার বাম পায়ের ওপর তুলে দেয়। হাঁটুর নিচ থেকে সম্পূর্ণ থেতলে যায়। পরে একবছর ট্রিটমেন্ট করে কোনরকম সুস্থ হন। কিন্তু পা ভাঁজ করতে পারেন না। কোন কাজও করতে পারেন না। তাই চলে এসেছেন এই মাজারে। এখানে এক বেলা খেতে দেয় মাজার কর্তৃপক্ষ। মাঝে মাঝে বাইরে থেকে মানুষ এসে তাদের দাওয়াত দিয়ে নিয়ে যান। সেদিন বেশ তৃপ্তি ভরে খান। তার দুই ছেলে ইটের মওসুমে ইট ভাটায় কাজ করে। আর বছরের অন্য সময় সিলেটে গিয়ে পাথরের কাজ করে। মাঝে মাঝে বাড়ি যান দিলশাদ, কিন্তু ১০দিনের বেশি থাকতে পারেন না। বলেন, এখানে তার অনেক মানুষ পরিচিত হয়ে গেছে। তাদের সঙ্গে সময় কাটে। তাদের টানে ছুটে আসেন। নিজে কাজ করতে পারেন না, খাবারও জুটে যায়। মাজারে আসলে ধর্মের কাজও হয়। রাতে মাজারের পাশে ফুটপাতে রাত কাটান। দিলশাদ সমালোচনা করে বলেন, এখানে অনেক ভণ্ডও আছে। তারা মানুষকে ধোঁকা দেয়। কৌশলে টাকা পয়সা বাগিয়ে নেয়।

বালাগঞ্জের ইরন আলী বলেন, ১৫ বছর বয়স থেকেই তিনি এই মাজারে আসা-যাওয়া করেন। এখন তার বয়স ৫৫। এক সময় প্রচুর সহায় সম্পত্তি ছিল তাদের। এখন কিছুই নেই। এজন্য কাউকে দায়ী করেন না। নিজেকেই দূষেণ তিনি। ছোট বেলা থেকেই বাউণ্ডেলে ছিলেন। কাজ না করায় খরচ যোগাতে তাই বিভিন্ন সময় জমিজমা বিক্রি করে দিয়েছেন। বলেন, যে জমি ২ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন তার দাম এখন দুই লাখ টাকা। প্রতিবেশী কৌশলে এসব জমি নিয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করলে জানান, নাহ! তারা বরং নিতে চাইতো না। আমি জোর করে ধার নিতাম। বলতাম ধার শোধ না করতে পারলে ওমুক জমিটা দিয়ে দেব। তারা আমার জোরাজুরিতে দিতে বাধ্য হতো। সংগ্রামের (মুক্তিযুদ্ধ) পর তিনি বাড়ি ছাড়েন। ২০ বছর বয়সে বিয়ে করেন আপন মামাতো বোনকে। কিন্তু তারপরও ঘরমুখো হতে পারেননি। এরই মধ্যে এক ছেলে সন্তান ও মেয়ে সন্তানের বাবা হয়েছেন তিনি। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে দুই বিয়ে করেছে। এজন্য তিনি ছেলেকে পছন্দ করেন না বলেও জানান। তিনি জানান, তার স্ত্রীই ছেলে মেয়েকে বড় করেছেন। তিনি সিলেটের একটি হাসপাতালে কাজ করেন। ৫ হাজার টাকা বেতন পান। সিলেটের বাগবাগিতে বাসা ভাড়া করে থাকেন। তাকেও মাঝে মাঝে দুই একশ’ টাকা দেন। তবে ছেলের কাছ থেকে কোন টাকা পয়সা নেন না। তিনি বলেন, তার সহপাঠী যিনি ক্লাসে তার পাশেই বসতেন তিনি এখন বড় উকিল। দেখা হলে সে বলে- তুমি গরম ভাত খেয়ে স্কুলে আসতে আর আমি আটা রুটি খেয়ে আসতাম। কর্মফলে আজ তুমি পথে পথে। ইরন আলী বলেন, তিনি শুধু এই মাজারেই না। চট্টগ্রামে বিভিন্ন মাজারে যান। দেশের বিভিন্ন মাজারে ঘুরেন। ভারতের আজমির শরীফও যান। ভিসা পাসপোর্ট লাগে না। প্রথমে বিজিবি আটকায়। পরে জোরাজুরিতে ছেড়ে দেয়। ওপার যাওয়ার পর বিএসএফ আটকায়। মাজারে যাওয়ার কথা বললে বসিয়ে রাখে। এর মধ্যে দু’একজন ইশারা দিয়ে যেতে বলেন। বাসেও অনেক সময় টাকা নেই বলে ফ্রি যাতায়াত করেন। নিজের ভাগ্য এবং কর্মফলকে দায়ী করলেও ইরন আলীর একটি ক্ষোভ রয়েছে। বলেন, সংগ্রামের বছর মুক্তিযুদ্ধ না করলেও পক্ষে অনেক কাজ করেছি। রাস্তা কেটে, পাথর দিয়ে খান সেনাদের চলাচলে বাধা দিয়েছি। তার এলাকার কমিশনার তাকে ভাতা দিবে বলেছিল। কিন্তু বললেই তালবাহানা করে।

তিন সাগরেদকে সঙ্গে করে গাছতলায় বসে বই পড়ছিলেন মোহাম্মদ সাগর। বাচ্চাদের নামের বই। সুদূর ভারতের আজমীর শরীফ থেকে পায়ে হেঁটে সঙ্গীদের নিয়ে শাহ আলীর মাজারে এসেছেন তিনি। জানালেন, শাহ আলী বাবার টানে এখানে এসেছেন। পথে কোন বাধাই তাদের আটকাতে পারেনি। চল্লিশোর্ধ্ব সাগরের বাড়ি নোয়াখালী। ছোটবেলা থেকে মাজারে মাজারে ঘুরছেন। মাজারে ঘোরার কারণ সম্পর্কে সাগরের বক্তব্য হচ্ছে, শান্তি খোঁজা। ঘরের শান্তি আসল শান্তি  না। তার সঙ্গে যাওয়ার ইচ্ছে পোষণ করলে বলেন, আগে ঘরে শান্তি খোঁজার চেষ্টা করতে হবে। এরপর নিজের ভেতরে ভাব আনতে হবে। তার ভাষায়, আমরা যেভাবে ভাবি আপনারা সেভাবে ভাবেন না। সুতরাং আপনাদের এত সহজে ভাব আসবে না। সাগর জানান, এখানে কতদিন অবস্থান করবেন তা অনিশ্চিত। বাবার সিগন্যাল পেলে পরে এখান থেকে সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে যাবেন। সেখানে হেঁটে যেতে ৫ দিন সময় লাগবে বলে জানান তিনি। মাজারের এই অতিথিদের সামনে দুুপুরের খাবার নিয়ে আসেন একজন খাদেম। গরুর মাংস দিয়ে ভুনা খিচুড়ি। পলিথিনে মোড়ানো খিচুড়ি সঙ্গীদের নিয়ে খাওয়া শুরু করেন সাগর।

শাহ আলীর মাজারে বাবার কাছ থেকে পাওনা নিতে এসেছেন টাঙ্গাইলের মোহাম্মদ শামছু পাগলা। বয়স পঞ্চাশের কোটায়। গায়ে ময়লা গামছা। মাথায় কালো কাপড় বাঁধা। মাজারের মসজিদের জুতার ঘর পাহারা দিচ্ছিলেন তিনি। শামছু পাগলা নিজেই একটি মাজার চালান। তার দাবি, শাহ চিশতী (রহ:)-এর মাজারের খাদেম তিনি। এখানে এসেছেন বাবার কাছে ‘পাওনা’ নিতে। ঈদের আগে এসেছেন। কতদিন থাকবেন বলতে পারেন না। বাবা কি দেবেন- জানতে চাইলে বলেন সবকিছুই দিতে পারেন বাবা। শামছুর কাছে দোয়া চাইলে বলেন, আমি দেওয়ার কেউ না। সব দেয়ার মালিক বাবা। তার কাছে চান। তিনি সবার মন জানেন। শামছু পাগলা জানান, মাজারে তাকে দিনে একবেলা খেতে দেয়া হয়। রাত দশটার পর বাইরের কেউ মাজারে অবস্থান করতে পারেন না। বিশেষ অতিথি হওয়ার কারণে রাতে ঘুমানোর ব্যবস্থা আছে তার। বাবার কাছে পাওনা বরাদ্দ পেলেই তবে এলাকায় ফিরে যাবেন বলে জানান তিনি।

হাইকোর্ট মাজারের পাশে সংসার পাতা হাওয়া বেগম (৫০) জানান, কিশোরগঞ্জে তাড়াইলের তালজাঙ্গা গ্রাম থেকে স্বামী সেলিম মিয়ার সঙ্গে ঢাকায় এসেছিলেন অনেকদিন আগে। তবে স্বপ্নের এই শহরে আসা সুখকর হয়নি তার জন্য। তিনি জানান, ঢাকায় আসার পরপরই ইয়াসিন (৫ বছর) ও বেলায়েত (১ বছর) নামে দুই ছেলে হাইকোর্ট এলাকা থেকে হারিয়ে যায়। স্বামী সেলিম মিয়াও মারা যান এর কিছুদিন পরেই। এখন একমাত্র ছেলে জুনায়েদকে নিয়ে তার সংসার। এক প্রতিবন্ধী ভিক্ষুকের গাড়ি ঠেলে যা পান তা দিয়ে কোনমতে দিন চলে যায় হাওয়া বেগমের। তবে, দুপুরে খাওয়ার অভাব পূরণ হয় মাজারের শিন্নিতে। হাওয়া বেগম বলেন, ওখানে প্রতিদিন ফকিরদের জন্য রান্না হয়। দুপুরে অনেকের সঙ্গে তিনিও ছেলেক নিয়ে ওখান থেকে খান। আবার বিশেষ দিনে অনেকেই দান খয়রাত করতে আসেন। তখন কিছু পাওয়া যায়। প্রতিবন্ধী ইদ্রিস (৫৫) জানান, ১০ বছর ধরে হাইকোর্ট  মাজার এলাকায় বাস করছেন তিনি। পুলিশি ঝামেলা ছাড়া অন্য কোন সমস্যা এখনো হয়নি। যতদিন জীবিত আছেন এখানেই কাটিয়ে দেবেন। হাইকোর্ট মাজরের খাদেম নুরুল হক বলেন, প্রতিদিন এই মাজারে দুপুরে শিন্নির আয়োজন থাকে। কোনদিন খিচুড়ি, তেহারি। আবার কোনদিন বিরিয়ানি। ঢাকা শহেরর বিশিষ্টজনদের দানের টাকায় এসব রান্না হয়। তিনি বলেন, হাইকোর্ট  মাজার এলাকায় শত শত উদ্বাস্তু ফুটপাতে বসবাস করে। এদের অনেকেই দুপুরের আহারের জন্য মাজারে চলে অসে। প্রতিদিন মাজারে অন্তত ২শ’ থেকে ৩শ’ লোকের খাওয়ার ব্যবস্থা হয়। বিশেষ দিনে তা ৫শ’ ছাড়িয়ে যায়। যাদের প্রায় সবাই এই এলাকার ফুটপাতের বাসিন্দা। এমনকি যাত্রবাড়ী, গুলিস্তান, মতিঝিল থেকেও ফকির মিসকিনরা হাইকোর্টের মাজারে চলে আসেন দুপুরে খাওয়ার জন্য।  -মানবজমিন

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

কোরবানি ঈদে গরু নিয়ে সংকটের শঙ্কা 

Bijoynews24.com_

রাজীব আহমেদম ১৩ আগস্ট : বছরের পর বছর ধরে ভারতীয় গরুর ওপর নির্ভরশীলতা শেষ পর্যন্ত বিপাকে ফেলেছে বাংলাদেশকে। জোগান প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আসছে ঈদুল আজহায় গরুর সংকট সৃষ্টি ও দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদিও কোরবানির জন্য প্রয়োজনীয় পশু সরবরাহ করার সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে। তবে এ মজুদ থেকে একসঙ্গে এত গরু জবাই হয়ে গেলে দেশে প্রাণিসম্পদের ওপর চাপ পড়ে যেতে পারে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে, এ বছর একটু বেশি দাম দিতে হলেও এ ঘটনা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হবে। এতে দেশীয় গবাদি পশু পালনকারীরা ভালো দাম পাবে এবং ভবিষ্যতে গরু পালনের হার বাড়বে।

বছরে দেশে মোট গরুর চাহিদার ৭০ শতাংশের জোগান দেয় দেশীয় খামারিরাই। বাকি ৩০ শতাংশ আসে ভারত থেকে। ভারতীয় গরু সস্তা হওয়ায় গত এক দশকে বাংলাদেশে এ প্রাণীটির পালনের হার তেমন বাড়েনি। গত কোরবানির ঈদের পর থেকে ভারত থেকে সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় গরুর মাংসের দর কেজিপ্রতি ৪০ শতাংশ বেড়ে ৩৮০ টাকা হয়েছে। তবে এর ইতিবাচক দিক হলো, ভালো দাম পাওয়ায় এখন গরু পালনের দিকে ঝোঁক বাড়ছে দেশে।

ভারত থেকে বছরে ১৫ থেকে ১৮ লাখ গরু বাংলাদেশে আসত। তবে কোরবানির আগে আমদানি অনেক বেড়ে যেত। এখন সেটা ২০ শতাংশে নেমেছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যানুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ভারত থেকে চার লাখ ২০ হাজার গরু-মহিষ বাংলাদেশে এসেছে। নেপাল, ভুটান বা মিয়ানমার থেকে বৈধ পথে গরু আমদানির কোনো উদ্যোগ সরকারি পর্যায়ে নেই। ফলে আসছে ঈদে দেশি গরু, মহিষ ও ছাগল-ভেড়ার ওপরই নির্ভর করতে হবে।

কোরবানিতে কত গরুর প্রয়োজন হয় সে বিষয়ে গবেষণাভিত্তিক কোনো তথ্য-উপাত্ত নেই। তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা মনে করেন, সারা বছরের চাহিদার ৫০ শতাংশ গরু জবাই হয় কোরবানিতে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে ৮৬ লাখ ২২ হাজার গরু-মহিষ জবাই হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭২ লাখ গরু। এর অর্ধেক ধরলে কোরবানিতে ৩৫-৩৬ লাখ গরুর চাহিদা তৈরি হতে পারে। অবশ্য দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার গরু কোরবানি কিছুটা কমতেও পারে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশে এখন গরু আছে দুই কোটি ৩৬ লাখ। এর একটি বড় অংশ গাভি ও কম বয়সী। প্রায় ২৫ লাখ জবাই উপযোগী। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, বাকি ১০ লাখ গরুর চাহিদা পূরণের জন্য কিছু গাভিও বাজারে চলে আসবে। পাশাপাশি ভারত থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে কিছু গরু আসবে।

তবে ঈদে গরুর সংকট হবে না জানিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘দেশের গরু দিয়ে কোরবানি সামাল দেওয়া যাবে। এতে দাম হয়তো কিছুটা বাড়বে। কিন্তু দেশের খামারিরা উপকৃত হবে। তারা গেল কয়েক বছরে ভালো দাম পায়নি। এবার তাদের লোকসান কাটানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।’

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অজয় কুমার রায় বলেন, ‘বিদেশ থেকে গরু না আসাটা আমাদের জন্য আশীর্বাদ। আমরা এবার নিজেদের উৎপাদন বাড়াতে মনোযোগী হতে পারব।’

অজয় কুমার জানান, গরুর উৎপাদন বাড়াতে কৃত্রিম প্রজনন বৃদ্ধি, বাছুরের মৃত্যুহার কমিয়ে আনাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সীমান্তে শিথিলতা আসবে- আশা ব্যবসায়ীদের : ভারতে বিগত কংগ্রেস সরকারের দুই মেয়াদে বাংলাদেশে গরু আমদানিতে কোনো অসুবিধা হয়নি। দেশটির আইনে অবৈধ হলেও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ গরু বাণিজ্যে তেমন বাধা দেয়নি। তবে ২০১৪ সালের মে মাসে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার পর দৃশ্যপট পাল্টে যেতে থাকে। গত বছর ডিসেম্বরে বিএসএফের ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং যেকোনো মূল্যে বাংলাদেশে গরু পাচার বন্ধের নির্দেশ দেন। তখন থেকেই মূলত বাংলাদেশে ভারত থেকে গরু আমদানি কমে যায় এবং এ দেশে গরুর মাংসের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। বিজিবির তথ্যানুযায়ী, ২০১৩ সালে বাংলাদেশে ভারত থেকে ২৩ লাখ ৭৪ হাজার গরু-মহিষ আমদানি হয়েছে। ২০১৪ সালে আমদানি হয়েছিল ২০ লাখ ৩২ হাজার গরু-মহিষ।

গত ৩ জুলাই বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক খবরে বলা হয়, ভারতের প্রায় ৩০ হাজার বিএসএফ সদস্য বাঁশ-দড়ি নিয়ে সীমান্ত পাহাড়া দিচ্ছে। চলতি বছর তারা প্রায় ৯০ হাজার গরু এবং ৪০০ ভারতীয় ও বাংলাদেশি গরু পাচারকারীকে আটক করেছে।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে প্রায়ই বিএসএফের গুলিতে গরু ব্যবসায়ীদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ গত রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, গত বছর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে গুলিতে নিহত হয়েছিল ৪০ জন। এ বছর সে সংখ্যা ২৬। তিনি গরু আনতে সীমান্তে না যাওয়ার জন্য ব্যবসায়ীদের পরামর্শ দেন।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোরবানি উপলক্ষে ভারত থেকে গরু বেশি আসত। এখন তা একেবারেই কম। ঢাকার গাবতলী গবাদি পশু ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সহসভাপতি মো. মজিবুর রহমান বলেন, এখন কুড়িগ্রাম ও রাজশাহী সীমান্ত দিয়ে কিছু গরু আসছে। তবে চাহিদার তুলনায় তা খুবই কম।

বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম বলেন, ‘কঠোরতার পরও কিছু কিছু গরু ভারত থেকে আসছে। গত রোজার ঈদেও বেশ কিছু গরু এসেছে। আসছে কোরবানিতেও আসবে। তবে সংখ্যা কত হবে তা এখনো বলা যাচ্ছে না।’

আমদানির কোনো উদ্যোগ নেই : যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় গরু উৎপাদক দেশ। গরুর মাংস রপ্তানিতেও তারা প্রথম অবস্থানে। তবে মিয়ানমার ও নেপালেও গরু পালন করা হয়। জনসংখ্যার অনুপাতে মিয়ানমার ও নেপালে গরুর সংখ্যা ভারতের চেয়ে বেশি। সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষের দেশ মিয়ানমারে গরুর সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ। দেশটি থেকে কিছু গরু অনানুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে আসে। তবে সম্প্রতি মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে বিজিবির নায়েক রাজ্জাকের আটকের ঘটনার পর সেই আমদানিও বন্ধ আছে বলে জানিয়েছেন মাংস ব্যবসায়ীদের নেতা রবিউল আলম। তিনি বলেন, মিয়ানমার থেকে বৈধভাবে গরু আমদানি সম্ভব।

পৌনে দুই কোটি মানুষের দেশ নেপালে গরু আছে প্রায় ৭২ লাখ। রবিউল আলম জানান, নেপাল থেকে বাংলাদেশে গরু ও মহিষ আমদানি হয়। তবে তা ভারতের মতোই অনানুষ্ঠানিকভাবে। নেপালি গরু-মহিষ এনে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা তাদের চালানের সঙ্গে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। সেটাও এখন প্রায় বন্ধ।

এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নেপাল ও মিয়ানমার থেকে গরু আমদানির উদ্যোগ নিচ্ছে বলে চাউর হওয়া একটি খবরের সত্যতা পাওয়া যায়নি। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ ধরনের কোনো উদ্যোগ তাঁরা নিচ্ছেন না।

ছাগল-ভেড়া আছে পর্যাপ্ত : কোরবানিতে চাহিদার তুলনায় দেশে ছাগল ও ভেড়া পর্যাপ্ত আছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে ৬৮ লাখ ৮৫ হাজার ছাগল-ভেড়া জবাই হয়েছে। এর অর্ধেক ধরে কোরবানিতে ছাগল-ভেড়া জবাই হতে পারে ৩৫ লাখের কাছাকাছি। তবে গরুর অভাবে এ চাহিদা কিছুটা বাড়তে পারে। দেশে বর্তমানে ছাগল আছে দুই কোটি ৫৬ লাখ। আর ভেড়া আছে ৩৪ লাখ। – কালের কণ্ঠ

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

অবহেলায় নজরুল-নার্গিসের স্মৃতিবিজড়িত দৌলতপুর 

মো: মোশাররফ হোসেন মনির, কুমিল্লা, ২৩ মে : মানবতা, সাম্য, দ্রোহ ও প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২১ সালে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে এসেছিলেন। বন্ধু আলী আকবর খানের সঙ্গে তাঁর বাড়িতে আসেন কবি। এখানকার সবুজ-শ্যামল পরিবেশ কবিকে দারুণভাবে আচ্ছন্ন করে। এখানে কবি রচনা করেছেন বহু কবিতা, গান আর ছড়া। কিন্তু সেই দৌলতপুর আজও অবহেলিত ও উপেক্ষিত। এখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে কবির নামে হয়নি কোনো প্রতিষ্ঠান। এ অবস্থার মধ্য দিয়ে আগামী ২৫ মে সোমবার থেকে কবির ১১৬তম জন্মবার্ষিকী পালন শুরু হবে।

মুরাদনগরের কোম্পানীগঞ্জ-নবীনগর সড়ক ধরে সামনে এগোলেই দৌলতপুর গ্রাম। এ গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়বে ‘নজরুল তোরণ’। তোরণের দুই পাশে ইট-সিমেন্টের তৈরি কালো রঙের টুকরো টুকরো বোর্ডে সাদা কালিতে লেখা কবির পঙ্কিমালা। ওই পথ ধরে আধা কিলোমিটার এগোলেই খাঁনবাড়ি। যে বাড়িকে কেন্দ্র করে নজরুলময় হয়ে ওঠেন ভক্তরা। ওই বাড়ি আর গ্রাম দীর্ঘদিন থেকে পরিচিত হয়ে ওঠে নজরুল-নার্গিসের গ্রাম হিসেবে। এখানে রয়েছে আলী আকবর খানের সুনিপুণ কারুকাজে শোভিত দ্বিতল বাড়ি। এ বাড়িতেই কবি ছিলেন। এ বাড়ির পলেস্তারা খসে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে হচ্ছে না কোন সংস্কার। এ ভবনের পেছনে বাঁশঝাড় পার হলেই কবির বাসরঘর।

জানা যায়, ১৯৬২ সাল পর্যন্ত কবির বাসরঘরটি আটচালা ছিল। পরে চৌচালা হলেও আয়তন ও ভিটির কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। ওই ঘরেই ছিল নার্গিসের ব্যবহার করা কাঠের সিন্দুকটি। অযন্ত ও অবহেলার কারনে সে সিন্দুকটি এখন আর নেই। কোথায় আছে এখন তা আর ওই বাড়ির কেউই বলতে পারে না। একসময় ওই ঘরে বাসরখাটটিও ছিল। এখন সেটি পাশের একটি আধা পাকা ঘরে রাখা হয়েছে।

কবিপত্নী নার্গিস বংশের উত্তরসূরি মোনালিসা খান বলেন, এ বাড়ির পুকুরঘাটের আম গাছ তলায় কবি দুপুরে শীতলপাটিতে বসে গান ও কবিতা লিখতেন। খানবাড়ির ছেলেমেয়েদের নাচ, গান ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখাতেন। পুকুরের পানিতে সাঁতার কাটতেন। শখ করে পুকুরে জাল আর পলো দিয়ে মাছ শিকার করতেন। কবির ওই স্মৃতিচিহ্ন ধরে রাখার জন্য দৌলতপুরে বানানো হয়েছে ‘নজরুল মঞ্চ’। প্রতিবছর কবির জন্মদিনে সেখানে জেলা প্রশাসন ও মুরাদনগর উপজেলা প্রশাসন সাদামাটাভাবে অনুষ্ঠান করে থাকে। এর বাইরে আর কিছুই এখানে হয়নি।

এলাকাবাসী জানান, ওই মঞ্চে বছরের অধিকাংশ সময় গরু চরে। শিশুরা হামাগুড়ি দেয়। মুরাদনগর উপজেলা আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কমিটির সভাপতি সৈয়দ রাজিব আহাম্মদ আক্ষেপ করে বলেন, ময়মনসিংহের ত্রিশালে কবির নামে অনেক কিছু হয়েছে। অথচ দৌলতপুরে কিছুই হলো না। কবি এখানে দুই মাস ১১ দিন ছিলেন। এখানে তিনি যৌবনে প্রেম ও বিয়ে করেছেন। অনেক কবিতা ও গান রচনা করেছেন। দৌলতপুরে কবির নামে বড় ধরনের কোনো স্থাপনা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র করা হোক।

রাজনীতিক ও মুরাদনগর উপজেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক এডভোকেট সৈয়দ তানভীর আহম্মেদ ফয়সাল বলেন, কবি নজরুলের নামে দৌলতপুরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় করার দাবিসহ আলী আকবর খানের সুনিপুণ কারুকাজে শোভিত দ্বিতল বাড়িটিকে জাদুঘর বানিয়ে কবি পত্মী নার্গিসের ব্যবহার করা কাঠের সিন্দুক ও বাসরখাটটি সংরক্ষনের দাবি  জানাচ্ছি। তিনি আরো বলেন, প্রতিবছর এখানে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা কো¤পানীগঞ্জ থেকে নবীনগর উপজেলা পর্যন্ত সড়কটি কবির নামে করতে চাই। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত বাঙ্গরা থানা নজরুল-নার্গিস’র নামে করার উদ্যোগ নিয়ে মুরাদনগর উপজেলা আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’র সাধারন সম্পাদক সৈয়দ রাজিব আহাম্মদ, মুরাদনগর উপজেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক এডভোকেট সৈয়দ তানভীর আহম্মেদ ফয়সাল, উপজেলা নজরুল নার্গিস স্মৃতি রক্ষা ফাউন্ডেশনের আহবায়ক মো: হুমায়ন কবির খান, নাঈম সরকার ও শেখ সজীব ওয়াজেদ জয় ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা মো: গিয়াস উদ্দিন আল মাসুদের নেতৃত্বে স্ব স্ব সংগঠনের পক্ষ্যে চলতি বছরের গত ১৯ মে মুরাদনগরের উত্তরের জন্য প্রস্তাবিত নতুন থানার নামকরনের দাবিতে কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে স্মারকলিপি পাঠিয়েছে।

নজরুল জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠান আগামী ২৫ মে থেকে: আগামী ২৫ মে সোমবার থেকে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার দৌলতপুরে শুরু হচ্ছে দু’দিনব্যাপী ১১৬তম নজরুল জন্মবার্ষিকী অনুষ্ঠান। মুরাদনগর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিকেল পাঁচটায় ‘চেতনায় নজরুল’ স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হবে।

এতে প্রধান অতিথি থাকবেন স্থানীয় সাংসদ ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন (এফসিএ)। এতে দেশের নামকরা নজরুল গবেষক ও শিল্পীরা উপস্থিত থাকবেন বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

খুন করে দুধ দিয়ে গোসল করতেন এরশাদ শিকদার 

ঢাকা, ২২ মে : দিনভর মানুষের কোলাহল। সন্ধ্যা নামতেই সেখানে নিস্তব্ধতা। স্বল্প আলোয় গায়ে কাঁটা দেওয়া অদ্ভুত এক ভৌতিক পরিবেশ। শুধু একটি কক্ষ থেকে মানুষের আর্তচিৎকারের শব্দ ভেসে আসছে। কিন্তু খুলনার ঘাট এলাকার বিশাল বরফকলের চার দেয়ালের ভিতরই চাপা পড়ে গগনবিদারী সেই আর্তনাদ। হাত-পা বাঁধা হতভাগ্য এক যুবকের পা চেপে ধরে রেখেছেন একজন। আরেকজন বড় হাতুড়ি দিয়ে পায়ের ওপর পিটিয়ে যাচ্ছেন অবিরাম। পা থেঁতলে গেছে। চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে দুই পায়ের হাড়। হাতুড়ি রেখে মানুষরূপী দানবটি ধীরেসুস্থে একটি রশি নিলেন। রক্তাক্ত যুবকের গলায় পেঁচিয়ে ধরে টান দিলেন। যুবকটির নাড়াচাড়া তখন বন্ধ। নাক-মুখ এমনকি চোখ দিয়েও রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। জিব একটু বেরিয়ে পড়েছে। মানুষরূপী দানবটি মৃত যুবকের নাকের কাছে হাত রেখে নিশ্চিত হলেন, প্রাণ নেই।

এর পরও তিনি ঠাণ্ডা হলেন না। হঠাৎ মেঝের ওপর পড়ে থাকা যুবকটির বুকের ওপর দাঁড়ালেন। লাফাতে শুরু করলেন। পাঁজর ভাঙল বুকের। শান্ত হলেন দানবটি। এরপর বড় এক বালতি দুধ দিয়ে গোসল করলেন। যুবকের লাশ জমাটবাঁধা সিমেন্টের ব্যাগের সঙ্গে বেঁধে ফেলে দেওয়া হলো ভৈরব নদে। শতাব্দীর ভয়ঙ্কর সিরিয়াল কিলার খুলনার কুখ্যাত এরশাদ শিকদারের খুনের নিজস্ব কৌশল এটি। ঠিক এভাবেই তিনি একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মাটি কাঁপিয়েছেন। তার হাতের মুঠোয় ছিল জনপ্রতিনিধি, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঠাণ্ডা মাথায় মানুষ হত্যার পর খাঁটি দুধ দিয়ে গোসল করে ‘পবিত্র’ হতেন। যাকে পথের কাঁটা মনে করেছেন, তাকেই তিনি হত্যা করেছেন। তার সহযোগী ও পরবর্তীতে মামলার রাজসাক্ষী নূরে আলমের মতে এরশাদ শিকদার কমপক্ষে ৬০টি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।

তবে তিনি ২৪টি হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়ে আদালতে জবানবন্দি দেন। ১১ বছর আগে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা মামলার রায় কার্যকর করা হলেও মানুষের কাছে তিনি এখনো নৃশংসতার প্রতীক। কুখ্যাত খুনি এরশাদ শিকদার তার রাজত্বকালে রূপসার যুবলীগ কর্মী খালিদ; দৌলতপুরের অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবীর ফটিক; সোনাডাঙ্গার ইনসাফ, কামাল, খালেক; সেনহাটির টাক আজিজসহ আরও অনেককে হত্যা করে জমাট সিমেন্টের বস্তায় বেঁধে ভৈরব নদে ফেলে দেন। এর মধ্যে শুধু খালিদের লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। অন্যদের লাশ পাওয়া যায়নি। তবে তাদের পরিধেয় কাপড় আর কিছু হাড় পরবর্তীতে পুলিশ উদ্ধার করে। ১৯৯৯ সালের নভেম্বরে গ্রেফতার হন এরশাদ শিকদার। গ্রেফতারের পর বেরিয়ে আসে তার নৃশংসতার অজানা সব কাহিনী। তার নৃশংসতার ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও হতবাক। খুলনার কারাগারে নেওয়ার পর সেখানেও পেশাদার অপরাধীরা তার বিচার চেয়ে মিছিল করেন।

শিশুদের ঘুম পাড়ানোর জন্য মায়েরা এখনো এরশাদ শিকদারের নাম বলে ভয় দেখান। তখন পত্রিকাগুলোয় এরশাদ শিকদারের খুনের খবর ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। এখনো কোথাও কোনো নৃশংস ঘটনা ঘটলেই চলে আসে এরশাদ শিকদারের নাম। বিদেশি গণমাধ্যমেও সিরিয়াল কিলার হিসেবে এরশাদ শিকদারের নাম উঠে আসে। তখন খবর বেরিয়েছিল, তার মুক্তির ব্যাপারে শত কোটি টাকার বাজেট ধরা হয়। তার ছোট স্ত্রী শোভা এ সময় কয়েক বস্তা টাকা নিয়ে ঢাকায়ও এসেছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এরশাদ শিকদারের বিষয়ে সিদ্ধান্তে অটল থাকায় সে সময় আর রক্ষা পাননি তিনি। এরশাদ শিকদারের জন্ম ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার মাদারঘোনা গ্রামে। তার বাবার নাম বন্দে আলী। ১৯৬৬-৬৭ সালে তিনি তার জন্মস্থান নলছিটি থেকে খুলনায় চলে আসেন।

খুলনায় আসার পর এরশাদ সেখানে কিছু দিন রেল স্টেশনের কুলির সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে রেললাইনের পাত চুরি করে বিক্রি করত এমন দলের সঙ্গে যোগ দেন। পরে তিনি তাদের নিয়ে নিজেই একটি দল গঠন করেন ও এলাকায় ‘রাঙ্গা চোরা’ নামে পরিচিতি পান। ১৯৭৬-৭৭ সালে তিনি ‘রামদাবাহিনী’ নামে একটি দল গঠন করেন যারা খুলনা রেল স্টেশন ও ঘাট এলাকায় চুরি-ডাকাতি ও বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকত। এ রামদাবাহিনী নিয়েই এরশাদ ১৯৮২ সালে ৪ ও ৫ নম্বর ঘাট এলাকা দখল করেন এবং এর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক হিসেবে আত্দপ্রকাশ করেন। ১৯৮২ সালে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগদানের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।

এরশাদের আমলে ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে তিনি তৎকালীন ৮ নম্বর ওয়ার্ডের (বর্তমান ২১ নম্বর ওযার্ড) কমিশনার নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর এরশাদ শিকদার বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর এরশাদ আবারও দল পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। কিন্তু সমালোচনার মুখে কিছু দিন পরই আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হন। ১৯৯৯ সালে গ্রেফতার হওয়ার সময়ও তিনি ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার ছিলেন। ১৯৯১ সালে তিনি ৪ নম্বর ঘাট এলাকা থেকে রফিক নামে একজন বরফকলের মালিককে ভয় দেখিয়ে বিতাড়িত করে বরফকল দখল করেন। সব ব্যবসায়ীকে তার কল থেকে বরফ কিনতে বাধ্য করেন। নূরে আলম আরও সাক্ষ্য দেন, এরশাদের কাছে ৭০টিরও বেশি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। যদিও তার ‘স্বর্ণকমল’ নামে খ্যাত বাড়ি থেকে মাত্র একটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছিল।

যেভাবে খুন : ১৯৯৯ সালের ১১ আগস্ট হত্যা করা হয় যুবলীগের খালিদকে। সে সময় খালিদের সঙ্গে ছিলেন খুলনার ব্যবসায়ী আপন দুই ভাই মুনির ও চয়ন। এ দুজনের ওপরও এরশাদ শিকদার নির্মম নির্যাতন চালান। নির্যাতনের শিকার চয়ন আদালতে জানান, ‘সন্ধ্যার পর জরুরি কথা আছে বলে এরশাদ শিকদার আমাদের ৫ নম্বর ঘাটে ডেকে নিয়ে আসেন। আমরা একটি প্রাইভেট কারে আসি। আমাদের সঙ্গে ছিলেন বড় ভাই মুনির, যুবলীগ কর্মী খালিদ, মোস্তফা ও ড্রাইভার আবুল। আমাদের সঙ্গে মোটরসাইকেলে এসেছিলেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা অসিত বরণ। ঘাটে পেঁৗছানোর সঙ্গে সঙ্গে এরশাদ শিকদার তার লোকদের নিয়ে ওজন মাপার হন্দর, শাবল, হাতুড়ি দিয়ে হামলা চালান। আমার বড় ভাই মুনিরের দুই পা চূর্ণবিচূর্ণ করে দেন। খালিদকে ধরে বরফকলে নিয়ে যান। সেখানে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এরপর এরশাদ নিজেই খালিদের পাঁজর ভেঙে লাশের সঙ্গে জমাট সিমেন্টের বস্তা বেঁধে ভৈরব নদে ফেলে দেন। লাশের সঙ্গে আরও ফেলে দেওয়া হয় আমাদের প্রাইভেট কার ও দুটি মোটরসাইকেল।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, এরশাদ শিকদার ১৯৯৯ সালের প্রথম দিকে খুলনা নিউমার্কেট এলাকায় নৈশপ্রহরী ইনসাফ, কামাল ও খালেককে ৫ নম্বর ঘাটে ধরে নিয়ে গিয়ে একইভাবে হত্যা করে ভৈরবে ফেলে দেন। এরশাদের একসময়ের সহযোগী টাক আজিজকেও হত্যা করে ভৈরবে ফেলে দেওয়া হয়েছে। দৌলতপুরের পাবলার অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবীর ফটিককেও এরশাদ নিজ হাতে হত্যা করেন। পরে তার লাশ নদে ফেলে দেন। ফটিকের লাশের কোনো সন্ধান মেলেনি। এরশাদের দেহরক্ষী নূরে আলমের স্বীকারোক্তিতে ফটিক হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা যায়।

এ ছাড়া ঘটনার পরপর ফটিকের বাবা হাশেম আলীও তার মেধাবী সন্তান হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছিলেন। নূরে আলমের ভাষ্য হচ্ছে, ‘এরশাদের বড় বউ খোদেজার সঙ্গে ফটিকের প্রেম রয়েছে- এ অভিযোগেই তাকে হত্যা করা হয়। ১৯৯৮ সালের ৬ এপ্রিল এরশাদ খোদেজার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে তাকে দিয়েই ফটিককে স্বর্ণকমলে ডেকে নিয়ে আসেন। সন্ধ্যায় ৫ নম্বর ঘাটের বরফকলে নিয়ে গলায় রশি পেঁচিয়ে ফটিককে হত্যা করা হয়। এরপর এরশাদ ফটিকের বুকে উঠে লাফিয়ে লাফিয়ে তার পাঁজর ভেঙে দেন। পরে জমাট সিমেন্টের সঙ্গে ফটিকের লাশ বেঁধে ভৈরব নদে ডুবিয়ে দেওয়া হয়।’ বিভিন্ন মাধ্যমে এরশাদের ছয়টি বিয়ের কথা জানা যায়। তার প্রথম স্ত্রীর নাম খোদেজা বেগম। সানজিদা আক্তার শোভা তার সবচেয়ে ছোট স্ত্রী। যাকে তিনি তার বিলাসবহুল বাড়ি স্বর্ণকমলে এনেছিলেন।

এ ছাড়াও রূপসার রাজাপুর গ্রামের তসলিমা, বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার ফরিদা, সহযোগী বারেক কমান্ডারের স্ত্রী রামেছা এবং যাত্রাদলের নায়িকা পাইকগাছার দুর্গারানীর কথা জানা গেছে। খোদেজার গর্ভে এরশাদের চারটি সন্তান রয়েছে। শোভার গর্ভে এষা নামে একটি মেয়ে আছে।

১৯৯৯ সালের নভেম্বরে গ্রেফতার হন এরশাদ শিকদার। তখন তার নামে ৪৩টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর অধিকাংশই হত্যা মামলা। নিম্ন আদালতের বিচারে সাতটি হত্যা মামলায় তার ফাঁসির দণ্ডাদেশ হয় ও চারটি মামলায় যাবজ্জীবন সাজা হয়। তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি তার আবেদন নাকচ করে দেন এবং ২০০৪ সালের ১০ মে মধ্যরাতে খুলনা জেলা কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। পরে টুটপাড়া কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

কতদিন খেতে পায়নি মানুষগুলো… 

ঢাকা, ১৬ মে : সুখের জীবন গড়তে গন্তব্যহীন সাগরে ভাসতে ভাসতে শেষ পর্যন্ত জীবনমৃত্যুর পরীক্ষায় না খেয়ে হাড্ডিসার হয়ে ফিরলো এ মানুষগুলো। এমন দৃশ্য দেখলে কার না মন গলে। কিন্তু মানুষরূপী দালালদের খপ্পরে পড়ে সুখতো দুরের কথা, জীবন নিয়ে বেঁচে থাকাই এখন তাদের চ্যালেঞ্জ। কতজন যে সাগরে মৃত্যুবরণ করেছে, তার হয়তো সঠিক হিসাব কোনো দিনেই পাওয়া সম্ভব হবে না।

মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের অমানবিক আচরণের কারণে কয়েক হাজার বংলাদেশী ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিক মরতে বসেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও দেশের অনুরোধ সত্ত্বেও এসব অভিবাসীকে উপকূলে ভিড়তে দিচ্ছে না দেশ তিনটি। আর এ কারণে সাগরে ভেসে থাকা বোটগুলোতে নেমে এসেছে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। খাদ্য ও পানি সংকটে মরছে মানুষ। ঘটছে বোটডুবির মতো দুর্ঘটনা। শুক্রবার ইন্দোনেশিয়ার আচেহ উপকূলে অভিবাসী বোঝাই একটি বোট ডুবে যায়। এ সময় স্থানীয় জেলেরা ৬১ শিশুসহ ৭৫০ জনকে উদ্ধার করে। এর মধ্যে চারশ’ বাংলাদেশের নাগরিক বলে জানা গেছে। এদিকে অভিবাসীদের জীবন বাঁচাতে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র। এর সমাধান খুঁজতে আগামী ২৯ মে সম্মেলনের আহ্বান করেছে থাইল্যান্ড। এ বিষয়ে আলোচনা করতে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া যৌথ কমিশনের চতুর্থ বৈঠক বসছে আজ। খবর এএফপি, বিবিসি, সিএনএন।

মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার অদূরে গন্তব্যহীনভাবে ভাসতে থাকা বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গাদের বহনকারী একটি বোট শুক্রবার ডুবে যায়। ইন্দোনেশিয়ার কোস্টগার্ড ও স্থানীয় জেলেরা বোট থেকে নারী ও শিশুসহ ৭৫০ জনকে উদ্ধার করেছে। এদের মধ্যে প্রায় চারশ’ বাংলাদেশী রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে ডুবে যাওয়া বোটটিতে ঠিক কতজন অভিবাসী ছিল তা জানা যায়নি। ইন্দোনেশিয়া কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব অভিবাসী রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশী। তাদের আচেহ প্রদেশের লাংসা শহরে রাখা হয়েছে। মালয়েশিয়া থেকে বিতারিত হয়ে ফেরার পথে সুমাত্রা দ্বীপের পূর্ব উপকূলে এসব অভিবাসীকে বহনকারী বোটটি ডুবে যায়।

লাংসার পুলিশপ্রধান সুনারয়া বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা তাদের কাছ থেকে জানতে পেরেছি তারা মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন। কিন্তু সে দেশের নৌবাহিনী তাদের ইন্দোনেশিয়ার জলসীমায় ঠেলে দেয়।’ তিনি বলেন, উপকূলের কাছাকাছি অন্য আরেকটি নৌকায় ছিল ৪৭ জন অভিবাসী। ক্ষুধার্ত এসব মানুষ পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে উদ্ধার মিনতি জানায়। স্থানীয় জেলেরা তাদের উদ্ধার করে।

এদিকে সম্প্রতি উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশী ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো হবে না বলে জানিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নাসির বলেছেন, ইন্দোনেশিয়া ১৯৫১ সালের উদ্বাস্তু বিষয়ক সম্মেলনে স্বাক্ষর না করলেও অভিবাসীদের ফেরত পাঠাবে না।

গত সপ্তাহের শেষদিকে প্রায় ছয়শ’ বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা অভিবাসী উদ্ধার করেছে ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ। তাদের বর্তমানে আচেহ প্রদেশের উত্তরাঞ্চলে লোকসুকোন শহরে একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্সে রাখা হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, এই অভিবাসীদের সাগরে প্রায় ডুবন্ত অবস্থা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার পাওয়া অভিবাসীদের পুনর্বাসন করতে ইন্দোনেশিয়ায় একটি বসতিহীন দ্বীপ ঠিক করা হবে বলে জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের (আইওম) আঞ্চলিক প্রশাসন। মানব পাচারের এই সমস্যার জন্য মিয়ানমার সরকারকে অনেকাংশে দায়ী করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উপ-এশিয়া পরিচালক ফিল রবার্টসন বলেছেন, দেশটির সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে এই সমস্যার জন্ম দিয়েছে।

অপরদিকে মানব পাচার প্রকট আকার ধারণ করায় এর সমাধান খুঁজতে ২৯ মে সম্মেলনের আহ্বান করেছে থাইল্যান্ড সরকার। গত মঙ্গলবার থাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্যাংকক সম্মেলন আহ্বান করে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো। ব্যাংকক সম্মেলনে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যোগ দেবেন বলে জানা গেছে। এছাড়া এই সম্মেলনে উপস্থিত থাকবেন কম্বোডিয়া, লাওস, যুক্তরাষ্ট্র, ভিয়েতনাম ও অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধিরাও। থাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, মানব পাচার রোধে আঞ্চলিক সরকারগুলোকে এই বিশেষ বৈঠকে যোগ দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বর্তমান সংকট নিরসন করতে হলে সবগুলো সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। বৈঠকে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক কমিশন (ইউএনএইচসিআর), ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম), অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংগঠনকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া যৌথ কমিশনের চতুর্থ বৈঠক বসছে আজ। বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। বৈঠকে যোগ দিতে চার দিনের সফরে মালয়েশিয়া গেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আজ শনিবার থেকে দেশটির সাবাহ প্রদেশের কোতা কিনাবালুতে দু’দিনের ওই বৈঠক বসছে। দ্বিপক্ষীয় অন্য বিষয়গুলোর পাশাপশি মানব পাচার বন্ধের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের বর্ডার থেকে অবৈধভাবে মালয়েশিয়াসহ ওই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে যেভাবে মানব পাচার হচ্ছে তা নিয়ে ঢাকা উদ্বিগ্ন। মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশীদের যেভাবে নিয়ে যাচ্ছে সংঘবন্ধ মানব পাচারকারী চক্র সেটি ভাবিয়ে তুলছে সরকারকে। এটি বন্ধে দ্বিপক্ষীয় সহয়োগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক উদ্যোগ চায় ঢাকা। কোতা কিনাবালুতে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট কমিশনের বৈঠকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলতে চান বাংলাদেশের কর্মকর্তারা। এমনটাই ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রতিনিধি দলের একাধিক সদস্য। কর্মকর্তারা বলেছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে মানব পাচার বন্ধের জন্য যৌথ উদ্যোগ আলোচনায় অগ্রাধিকার পাবে। মানব পাচার বন্ধে বৃহত্তর পরিসরে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে আলোচনার জন্য বাংলাদেশ মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ডকে আগেই চিঠি দিয়েছে। অবৈধভাবে মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ড গিয়ে বাংলাদেশী যারা আটকা পড়েছেন, তাদের ফেরত আনার ব্যাপারেও বাংলাদেশ সহযোগিতা চাইছে। কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনের শ্রমবিষয়ক কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম মুকুল এ প্রতিবেদককে জানান, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের সময় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে মানুব পাচার বন্ধের বিষয়টি। যারা ইতিমধ্যে পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডে গিয়ে আটকে পড়েছে তাদের কিভাবে ফেরত আনা যায়, সেটা নিয়েও আজকের বৈঠকে কথা হবে।

মানবিক বিপর্যয় : মালয়েশিয়াগামী বোটগুলোকে তিন দেশের উপকূলে ভিড়তে না দেয়ায় সাগরে ভেসে থাকা কয়েক হাজার বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা নাগরিক এখন মৃত্যুপথ যাত্রী। খাদ্য ও পানি সংকটে বোটগুলোতে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। বিবিসির একজন সংবাদিক জানিয়েছেন, বেঁচে থাকার জন্য ক্ষুধার্ত অভিবাসীরা নিজেদের মূত্র পান করতে বাধ্য হচ্ছেন। থাইল্যান্ড উপকূলে তিনি এ দৃশ্য দেখতে পান। না খেয়ে এ পর্যন্ত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে এএফপির এক খবরে বলা হয়েছে। বার্তা সংস্থাটি জানায়, নিজেদের ভূখণ্ডে যাতে না ভিড়ে, এজন্য কৌশল হিসেবে ভাসমান বোটগুলোতে হেলিকপ্টারের সাহায্যে কিছু খাবার ফেলছে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া। অপ্রতুল এ খাবার নিয়ে অভিবাসীদের মধ্যে কাড়াকাড়ি লেগে যায়। হেলিকপ্টার থেকে সাগরের পানিতে পড়ে যাওয়া প্যাকেট খাবার আনতে সাগরে ঝাঁপ দিয়ে সাতরিয়ে উঠতে না পেরে ১০ জনের প্রাণহানি হয়েছে বলে জানা গেছে।

ভয়াবহ এ পরিস্থিতি দেখেও মন গলছে না মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের। তারা সামান্য কিছু খাবার দিয়ে কোনো মতে অভিবাসীদের বাঁচিয়ে রেখে বোটগুলোকে প্রত্যার্পণের কৌশল গ্রহণ করেছে। কিন্তু তাদের এই কৌশলের কারণে মরতে বসেছে কয়েক হাজার বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা। বোটগুলোকে তিন দেশের উপকূলে ভিড়তে দেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও দেশ বারবার আহ্বান জানানোর পরও তা গ্রাহ্য করছে না মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড।

এদিকে মালয়েশিয়ায় ভিড়তে না পেড়ে মিয়ানমারের নাগরিক বোঝাই একটি বোটকে বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার মধ্যবর্তী অন্দামান সাগারে ভাসতে দেখা গেছে। অন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কয়েকজন সাংবাদিক ওই বোটের কাছে গিয়ে ক্ষুধার্ত মানুষের আহাজারি দেখতে পান। বোট থেকে তারা সাংবাদিকদের উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমাদের কছে কোনো পানি নেই। আমাদের সাহায্য করুন।’ মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চল থেকে আগত সিরাজ নামের ১৫ বছরের এক তরুণ বলেন, ‘আমরা ক্ষুধার্ত। আমাদের খাবার দিন।’
বারবার ঠেলে দেয়া সত্ত্বেও অভিবাসী বোঝাই বোটগুলো উপকূলে ভেড়ার জন্য পুন:পুন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। থাইল্যান্ডের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে জানান, মালয়েশিয়া থেকে প্রত্যাখ্যাত একটি জাহাজ থাইল্যান্ড উপকূলে প্রবেশের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়।

অভিবাসীদের বাঁচানোর আহ্বান জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের : মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে সাগরে নৌযানে ভাসতে থাকা বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা মুসলিম অভিবাসীদের জীবন বাঁচাতে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার পৃথক সংবাদ সম্মেলনে এ আহ্বান জানায় তারা। এর আগে নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) দুর্গত অভিবাসীদের জায়গা দিতে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডকে তাগিদ দেয়।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জাতিসংঘ মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেন, ‘মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে আন্দামান ও মাল্লাকা প্রণালীতে নৌযান ভাসতে থাকা হাজারো অভিবাসীর বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব বেশ উদ্বিগ্ন। ওইসব অভিবাসী ও শরণার্থী বহনকারী নৌযানগুলো প্রবেশে কিছু দেশ বাধা দেয়ার খবর তার (মহাসচিব) কাছে রয়েছে। সরকারগুলোর প্রতি তিনি আহ্বান জানিয়েছেন, সাগরে উদ্ধারের বাধ্যবাধকতা যেন নিশ্চিত করা হয় এবং উদ্বাস্তুদের নিষিদ্ধ করার বিষয়টি যথাযথ আইনে যেন রক্ষা করা হয়।’

মুখপাত্র আরও বলেন, ‘তিনি (মহাসচিব) সরকারগুলোর প্রতি আরও আহ্বান জানিয়েছেন, (অভিবাসীদের) যথাসময়ে উপকূলে ভেড়ার সুযোগ দিতে হবে এবং সীমান্ত ও বন্দর উন্মুক্ত রেখে সেসব বিপন্ন লোকদের সহায়তা করতে হবে, যাদের এটা দরকার।’

বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা মুসলিম অভিবাসীদের সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে মানবাধিকার সংগঠন এবং কংগ্রেসের কিছু সদস্য। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সাগরে ভাসমান অভিবাসীরদের রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জেফ রাথকে বলেন, ‘এটা একটা আঞ্চলিক ইস্যু। তাৎক্ষণিকভাবে দরকার এর আঞ্চলিক সমাধান। তবে এ জন্য মেরিটাইম ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে বিশ্বসম্প্রদায় আঞ্চলিক দেশগুলোকে সহয়তা করতে পারে।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

এরপর কোন ব্লগার…? 

ঢাকা, ১৩ মে : আবার একজন ব্লগারকে হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হলো। মঙ্গলবার সিলেটে দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত হন অনন্ত বিজয় দাশ নামে এক ব্লগার। সকালে অফিস যাওয়ার পথে বাসার কাছেই তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঠিক একই কায়দায় হত্যা করা হয় ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায় ও ওয়াসিকুর রহমান বাবুকে। এভাবে একের পর এক হত্যাকাণ্ডে আতঙ্কিত ব্লগার ও মুক্তচিন্তার মানুষেরা। সবার প্রশ্ন, এরপরে কার পালা। এভাবে কি হতাকাণ্ড ঘটেই যাবে? এসব হত্যার বিচার না হওয়াকেই নতুন হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, যারা ব্লগে লিখছেন, ধর্মীয় বিষয় নিয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করছেন এমন লোকদের বিশেষ টার্গেটে নিয়েছে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা। এজন্য আলাদা আলাদা হিটলিস্ট তৈরি করছেন তারা। উগ্রপন্থিদের এমন হিটলিস্টে আছেন কমপক্ষে ৮৪ জন। এই ৮৪ জনের মধ্যে শুধু যে ব্লগার রয়েছেন তা নয় রয়েছেন প্রগতিশীল দলের সংগঠক, বিভিন্ন প্রগতিশীল আন্দোলনের সংগঠক, মুক্তমনা, প্রগতিশীল লেখক ও সাংবাদিক। প্রাথমিক পর্যায়ে জঙ্গিরা হুমকি দেবে তাতে কাজ না হলে চিরতরে সরিয়ে দেবে।

লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের দুই মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে কোনো অগ্রগতি নেই। বলা চলে, ক্লু না থাকায় তদন্ত অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। যদিও তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, তারা সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যে হত্যাকাণ্ডের মোটিভ সম্পর্কে তারা পরিষ্কার ধারণাও পেয়েছেন। কিন্তু এখনও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করতে পারেননি।

অপরদিকে একই অবস্থা ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যাকাণ্ডের তদন্তেও। হত্যাকাণ্ডের সময় স্থানীয় লোকজন যে দুই খুনিকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করেছিল এর বাইরে আর কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের সময় তারা ৫-৬ জন ছিল বলেও স্বীকার করেছিল গ্রেপ্তারকৃত দুই তরুণ। ঘটনার পরপরই তারা পালিয়ে যায়। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাদের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে। কিন্তু অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি।

অপরদিকে অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের ৩২ দিনের মাথায় গত ৩০ মার্চ তেজগাঁওয়ের দক্ষিণ বেগুনবাড়ি এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে একই কায়দায় খুন হন আরেক ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু। সকালে বাসা থেকে বেড়িয়ে কয়েক গজ হেঁটে যেতে না যেতেই পেছন থেকে চাপাতি দিয়ে হামলা করে দুর্বৃত্তরা। এতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় বাবুর। আর পালিয়ে যাওয়ার সময় এক হিজড়ার সহায়তায় স্থানীয় লোকজন দুই দুর্বৃত্তকে ধরে ফেলে। গ্রেপ্তারের পর তারা সাংবাদিকদের কাছে আদর্শগত বিরোধের জের ধরেই তাকে হত্যা করেছে বলে স্বীকার করে। বর্তমানে দুটি ঘটনায় তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ-ডিবি।

শুধু খুন নয়, এর দুই দফায় আঘাতের শিকার হন ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিন। ২০১৩ সালের ১৩ জানুয়ারি রাতে উত্তরায় নিজ কার্যালয়ের সামনে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করা হয় তাকে। একই বছরের ৭ মার্চ রাতে মিরপুরের পূরবী সিনেমা হলের কাছে কুপিয়ে জখম করা হয় ব্লগার সানিউর রহমানকে।

২০১৩ সালের জুনে এলিফ্যান্ট রোড এলাকায় কোপানো হয় গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ও ব্লগার রাকিব আল মামুনকে। এর বাইরে উগ্রপন্থিদের হাতে বিভিন্ন সময় খুন হয়েছেন আরো অনেক প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব। ব্লগার ও অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই পেছন থেকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রতিটিতেই টার্গেট ছিল মস্তিষ্ক ও মাথা। কারণ উগ্রপন্থিরা মনে করে, মস্তিষ্কই তাদের মূল আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। পেছন থেকে কোপানো হয়, যেন চেহারা না দেখা যায়।

গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ও ব্লগার ইমরান এইচ সরকার বলেন, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জনগণের নিরাপত্তা দিতে উদাসীন। ব্লগারদের হত্যা করছেন ধর্মান্ধরা। হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও তা সম্পর্কে ক্লু দিতে পারছে না পুলিশ। হত্যাকারীরা প্রশ্রয় পেয়ে আরো বেশি শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ পাচ্ছে বলেও মনে করেন তিনি।

এ ব্যাপারে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানান, ব্লগার ও মুক্তমনা লেখকদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা হচ্ছে।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

সমুদ্রের বুকে ভেসেছিলাম ২ মাস ! 

ঢাকা, ১২ মে : ইন্দোনেশিয়ার উপকূলে যখন আমাদের নামিয়ে দেয়া হয়, তখন ভেবেছিলাম মালয়েশিয়া পৌঁছে গেছি। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে প্রত্যেকে বুঝতে পারলাম আমাদের  স্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বৃথাই প্রতারণার শিকার হয়েছি। এভাবেই বর্ণনা দিলেন উপকূলে উদ্ধারকৃত এক বাংলাদেশী।

ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় নেমেছিলেন উন্নত জীবনের আশায়। এর পরিবর্তে মিলেছে অবর্ণনীয় দুর্দশা আর নির্যাতন। অনাহারে কাটাতে হয়েছে দিনের পর দিন। অসুস্থ হয়ে যাত্রার মাঝেই প্রাণ গেছে কারও। তখন ছুড়ে ফেলা হয়েছে নৌকা থেকে। মারধর, যৌন নিপীড়ন তো আছেই।

সম্প্রতি থাইল্যান্ড সরকার মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু করার পর থেকে এসব নৌকা আরোহীদের কপালে যোগ হয়েছে নতুন দুর্ভোগ। তিন দিনেও পেটে দানা পানি পড়েনি। দুমাসেরও বেশি সময় ছিলেন সমুদ্রের বুকে।

পাচারকারীরা ধরা পড়ার আশঙ্কায় তাদের মাঝপথে ফেলে রেখে পালিয়ে যাচ্ছে। থাইল্যান্ড না গিয়ে নিকটবর্তী মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার উপকূলে ফেলে দিয়ে আসছে শরণার্থীদের।

গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় সমুদ্র উপকূল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ২০০০ বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গাকে। এদের মধ্যে বহু নারী ও শিশু রয়েছে। রবিবার আনুমানিক ৬০০ যাত্রীবাহী ৪টি নৌকা ইন্দোনেশিয়ার উপকূলবর্তী আচেহ প্রদেশে পৌঁছায়। গতকাল সকালে আরও ৪০০ জনকে উদ্ধার করা হয়।

এদিকে মালয়েশিয়ার লঙ্কাওয়িতে তিনটি নৌকায় ১০১৮ জন পৌঁছায়। এর মধ্যে ৫৫৫ জন বাংলাদেশী আর বাকিরা রোহিঙ্গা। এদের মধ্যে নারী রয়েছেন ৯৯ জন এবং শিশু ৫৪ জন। পাচারকারীরা আরোহীদের ফেলে রেখে পালিয়ে যাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় আরও বিপাকে পড়ছে পাচারের শিকার ব্যক্তিরা। পরশু মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছানো শরণার্থীদের উদ্ধার করা হয় অসুস্থ ও দুর্বল অবস্থায়। বার্তাসংস্থা এপি ও রয়টার্সের খবরে এসব কথা বলা হয়েছে।

লঙ্কাওয়ির উপ-পুলিশ প্রধান জামিল আহমেদ বলেন, এক বাংলাদেশী পুলিশকে জানিয়েছে যে, পাচারকারীরা তাদের নির্দেশনা দিয়ে গেছে মালয়েশিয়ার উপকূলে পৌঁছানোর পর তারা কোন দিকে যাবেন। এরপর দুটি নৌকায় তারা পালিয়ে যায়। বাংলাদেশী ওই ব্যক্তি জানিয়েছে, তারা তিনদিন ধরে কিছুই খায়নি। নৌকার আরোহী প্রত্যেকেই প্রচণ্ড দুর্বল ও অসুস্থ হয়ে পড়ে। জামিল বলেন, আমাদের ধারণা আরও নৌকা রয়েছে। তাদেরকে অভিবাসন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। দ্বীপের চারপাশে উদ্ধার অভিযান জোরদার হওয়ায় আরও অনেক অভিবাসীকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন ।

এদিকে, ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার স্টিভ হ্যামিল্টন বলেন, রবিবার ভোরে চারটি নৌকা যখন সমুদ্রতীরের কাছাকাছি পৌঁছায় তখন নৌকাগুলো থেকে অনেক যাত্রী পানিতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরানো শুরু করে।

উদ্ধারকৃতদের উত্তর আচেহ জেলার রাজধানী লোকসুকোনে একটি ক্রীড়া স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে তাদের দেখাশোনা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানিয়েছেন উত্তর আচেহ এলাকার পুলিশ প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল আকমাদি। এসব নৌকাযাত্রীরা দু’মাসেরও বেশি সময় ধরে সমুদ্রে ছিল। তাদের অনেককে জরুরি চিকিৎসা সেবা দেয়ার প্রয়োজন পড়ে। ইন্দোনেশিয়ায় উদ্ধারকৃতদের মধ্যে মোট ৫০ জনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আকমাদি বলেন, অসুস্থ প্রত্যেকেই অনাহারে থাকার কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

ইন্দোনেশিয়ায় উদ্ধারকৃতদের মধ্যে মোহাম্মাদ কাসিম (৪৪) নামক এক বাংলাদেশীর সঙ্গে কথা বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। বগুড়া জেলার নিবাসী কাসিম জানিয়েছে,  নৌকার যাত্রীদের প্রত্যেকে ৪৪০০ রিঙ্গিত করে দিয়েছে পাচারকারীদের। তারা ভেবেছিলেন তাদের মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়া হবে। তাদের নৌকার তিনজন যাত্রা পথে মারা যায়। তাদেরকে সাগরে ফেলে দেয়া হয়। মালয়েশিয়ায় চাকরি পাওয়ার আশায় এক মাস আগে কাসিম আপনজনদের ফেলে রওনা দেন। তার সঙ্গে নৌকায় আরও ৩০-৪০ জন ছিল।  প্রথমে তাদের নৌকা থাইল্যান্ডের একটি সমুদ্রসৈকতে পৌঁছায়। সেখানে তারা ২১ দিন ছিলেন। পরে বড় আরেকটি নৌযানে তাদেরকে ওঠানো হয়। সেখানে ছিল শ’ শ’ যাত্রী।

লোকসুকোনের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, এতো সংখ্যক শরণার্থী আগমনের জন্য তারা প্রস্তুত ছিলেন না। হঠাৎ করে এ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে শ’ শ’ দুর্বল ও অসুস্থ মানুষের খাবার আর আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষের পরিস্থিতিও একইরকম।

ইন্দোনেশিয়ার উত্তর আচেহ প্রদেশের সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অফিসের মোহাম্মদ ইয়ানি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, আমাদের বাজেটে এ খাতে কোন অর্থ নেই। একইসঙ্গে তিনি এও বলেন, আমরা এ নিয়ে পরে চিন্তা করবো। এখন এটা জরুরি পরিস্থিতি। উদ্ধারকৃত অনেকে এতো বেশি দুর্বল ছিল যে, উঠে দাঁড়ানোর মতো শক্তি তাদের ছিল না। স্থানীয় এক সরকারি কর্মকর্তা তেগাস বলেন, আগত অভিবাসীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, বিমর্ষ, ক্লান্ত আর নিদারুণ পীড়াগ্রস্ত। লোকসুকোনে তাদেরকে যেখানে রাখা হয়েছে তা এতোগুলো মানুষকে রাখার মতো পর্যাপ্ত প্রশস্ত নয়। টয়লেটের সংখ্যাও কম। অভিবাসীদের নীল রংয়ের ত্রিপল বিছিয়ে দিয়ে ঘুমাতে দেয়া হয়েছে। কোন বালিশ বা কম্বল ছাড়া।

তেগাস বলেন, আমাদের আরও বেশি সরবরাহ প্রয়োজন। তাদেরকে উন্নত স্থানে পুনর্বাসনও জরুরি। কর্তৃপক্ষকে এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম  খেতে হচ্ছে দেখে স্থানীয়রা সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। অনেকেই খাবার, পোশাক দিয়ে সাহায্য করছেন। অন্যরা যে যেভাবে পারছেন উপকারে আসার চেষ্টা করছেন। খাবার, পানি আনা-নেয়া করছেন তারা। ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও আলাপচারিতা করার চেষ্টা করছেন তারা। তেগাস বলেন, তাদের মন ভাল করার জন্য এটা স্থানীয়দের পদ্ধতি। স্থানীয়দের উষ্ণ সহায়তায় দুর্দশা কিছুটা লাঘব হবে এতে কোন সন্দেহ নেই। তবে ভোগান্তির যে এখানেই শেষ নয়, তা হয়তো বুঝতে পারছেন শরণার্থীরা।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

৫ বছরের নির্বাচিত চেয়ারম্যানের ১২ বছর পার! 

ছাদেকুল ইসলাম রুবেল, গাইবান্ধা, ১০ মে : অবিশ্বাস্য হলেও সত্য বিগত ৩৫ বছরেও গাইবান্ধার জনগুরুত্বপূর্ণ পলাশবাড়ী পৌরসভা বাস্তবায়নে আইনি জটিলতায় ৫ বছরের নির্বাচিত ৩ ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ১২ বছর পার করছে। ২০১১-২০১২ অর্থবছরে পৌরসভা অবকাঠামো নির্মাণের বিপরীতে বরাদ্দপ্রাপ্ত ৩৯ লাখ টাকা অবশেষে ফেরত গেছে।

সুপ্রিম কোর্টে জনৈক শফিকুলের দায়েরকৃত রীট দীর্ঘ ২০ বছর পর খারিজ হলেও অসৎ উদ্দেশে পৌরসভা বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতায় আবারও রীট পিটিশন দায়ের করেছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এলাকার উন্নয়নে গত ১৯৮১ সালে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় পলাশবাড়ীকে পৌরসভা ঘোষণা করেন। তৎসময় অতিদ্রুত পৌরসভা বাস্তবায়নে স্বয়ং  প্রেসিডেন্ট জিয়া যাবতীয় অবকাঠামো নির্মাণে সংশিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন। এরই ধারাবাহিকতায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় স্থানীয় সরকার বিভাগ, আইন-২ শাখা (স্মারক নং-৪৬.০২১.০০৪.০০.০০.০০৪.২০১৪-৪৯) গাইবান্ধার পলাশবাড়ী  পৌরসভার কার্যক্রম চলমান রাখার বিষয়ে মতামত প্রদান করে। কিন্তু পৌরসভা বাস্তবায়নে উপজেলা সদরের উদয়সাগর গ্রামের মৃত মোহাম্মাদ আলীর পুত্র শফিকুল ইসলাম নবসৃষ্ট পৌরসভা বাতিল আদেশ চেয়ে মহামান্য সুপ্রিমকোর্ট বিভাগে (নং-৭৬৯৩/২০১১) রীট মামলা দায়ের করেন।

আদালত জেলা প্রশাসক, গাইবান্ধাকে জানান পলাশবাড়ী পৌরসভা সংক্রান্ত দায়েরকৃত রীট মামলা শুনানির পর খারিজ হয়। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পিটিশন ফর-লীভ-টু-আপিল নং-৭১৯ অফ-২০১১ দায়ের করা হয়। বর্তমানে এ মামলার সকল কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। এদিকে গত ২০১৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর চলমান লীভ-টু-আপিল মোকদ্দমা খারিজ হয়। উপজেলা নির্বাহী অফিসার সূত্র জানায় মামলার বাদী শফিকুল ইসলাম খারিজের বিরুদ্ধে পুনরায় সিভিল মিস পিটিশন (নং-৭১৯/২০১১) আপিল শুনানি আবেদন করেছেন। যা মহামান্য সুপ্রিম কোর্টে শুনানির জন্য অপেক্ষমাণ।

উক্ত মামলার মতামত প্রসঙ্গে সর্বশেষ আদেশের সার্টিফাইড কপি এবং (নং-৭১৯/২০১১) সিএমপি মামলা খারিজের বিরুদ্ধে  রেজিস্ট্রেশনের আবেদন সার্টিফাইড কপি দাখিল এবং শুনানির জন্য দিন ধার্য থাকলে বা শুনানি হয়ে থাকলে মামলার সর্বশেষ অবস্থার সার্টিফাইড কপি দাখিলের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়। মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব পাপিয়া ঘোষ স্বাক্ষরিতপত্রে জানা যায়, পলাশবাড়ী সদর ইউনিয়নের ১৯টি গ্রাম, বরিশাল ইউপির রাইগ্রাম এবং কিশোরগাড়ী ইউপির শিমুলিয়া, আন্দুয়া, পলাশগাছী ও রাঙ্গামাটিসহ ২৪টি মৌজা নিয়ে পৌরসভা গঠিত হয়।

পরবর্তীতে উপজেলার কিশোরগাড়ী ও বরিশাল ইউনিয়নের ৫টি  মৌজা বিধিবহির্ভূতভাবে এসআরও নং-১৩৭-আইন/২০০৩ মূলে পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পৃথক পত্রে তা কর্তন করে পুনরায় সীমানা সংকোচনের কথা উল্লেখ করা হয়। পৌরসভা ভৌতিক অবকাঠামো নির্মাণে গত ২০১২ সালের ২৫ জুন (অর্থবছর-২০১১-২০১২) প্রথম দুই কিস্তিতে ২৫ লাখ, পরবর্তীতে পৃথক তিন কিস্তিতে একযোগে সাড়ে ১২ লাখ এবং সর্বশেষ দুই কিস্তিতে যথাক্রমে ৩৫ হাজার ও ৭৫ হাজারসহ ৩৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়।

পৌরসভা ঘোষণা বাস্তবায়নে যাবতীয় বিধি-বিধান অনুসরণ করে ঘোষিত মৌজা সমূহকে আরবান এলাকা ঘোষণা করা হলেও মহামান্য সুপ্রিম কোর্টে দায়েরকৃত রীট পিটিশন খারিজ না হওয়া ও আপত্তিসহ নানামুখী আইনি জটিলতা পৌরসভা বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় রীট পিটিশন মামলা দায়ের করায় পলাশবাড়ী পৌরসভা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। এতে করে পলাশবাড়ী সদর এলাকাবাসী পৌসসভার সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

সুনামগঞ্জে বজ্রাঘাতে তিন মাসে নিহত ২১ 

অরুন চক্রবর্তী, সুনামগঞ্জ, ৯ মে : সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বজ্রাঘাতে গত তিন মাসে ২১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক ব্যক্তি।

সুনামগঞ্জের বিভিন্ন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), এলাকাবাসী অনুসন্ধানে জানা গেছে  এসব তথ্য। গত ২৮ মার্চ শনিবার তাহিরপুর উপজেলার পুরানঘাট গ্রামের সিরাজুল ইসলাম (১৩), বড়গোপটিলা গ্রামের শাহজালাল মিয়া (৪০) বজ্রাঘাতে মারা যান। এ ঘটনায় আহত হন আরো চারজন। গত ২৯ মার্চ ধর্মপাশা উপজেলার দক্ষিণউড়া গ্রামের আলী হোসেন (১৬) মারা যান, এঘটনায় আরো ২ জন আহত হন।

১লা এপ্রিল বুধবার জামালগঞ্জ উপজেলার পাকনার হাওড়ে হঠামারা গ্রামের আবুবকর (৬৫) মারা যান, আহত হন আরো ৫ জন। গত ৫ এপ্রিল রবিবার তাহিরপুর উপজেলার অলিপুর (বাগগাঁও) গ্রামের সুমন মিয়া (১৬) নামের এক কিশোর মারা যায়, আহত হয় আরো ২ জন।

১৭ এপ্রিল দিরাই উপজেলার রননারচর গ্রামের জ্ঞানেন্দ্র দাস (৬২), ভরারগাঁও গ্রামের জমসেদ মিয়া (৪২),নগদীপুর (ছয়হারা) গ্রামের শামছুল হক (৩২), দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার ঠাকুরভোগ গ্রামের জুয়েল মিয়া (১৭), জামালগঞ্জের গজারিয়া গ্রামের বাঁধন মিয়া (৩২), হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার দেবপুর গ্রামের মিলাদ মিয়া (২০) পৃথক বজ্রাঘাতে মারা যান। এ ঘটনায় আহত হন আরো ৩ জন। ১৮ এপ্রিল সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার পাঠানবাড়ি এলাকার আব্দুল মজিদ (৪৫) মারা যান।

২১ এপ্রিল মঙ্গলবার দুপুরে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোহাম্মদপুর গ্রামের আজিজুর রহমান (৪০) এবং দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের আস্তমা গ্রামের গিয়াস উদ্দিন (২০) মারা যান। এ ঘটনায় আহত হন আরো ৭ জন।

১লা মে দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া ইউনিয়নের উর্ধ্বপাড়া গ্রামের আব্দুল কাদির (২০), সরমঙ্গল ইউনিয়নের মাহতাবপুর গ্রামের হরিভক্ত দাস (৪৫), রাজানগর ইউনিয়নের অনন্তপুর গ্রামের রাজু মিয়া (২১) এবং ধর্মপাশা উপজেলার মধ্যনগর থানার শিবরামপুর গ্রামের আব্দুল জলিল (৫০) এবং তাহিরপুর উপজেলার কোনাটছড়া গ্রামের বাসির মিয়ার স্ত্রী রাশেদা বেগম (৪০) বজ্রাঘাতে নিহত হন।

সর্বশেষ ৭ মে  বৃহস্পতিবার  তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের মোল্লাপাড়া গ্রামের হুসেন আলী (৫০),ধর্মপাশা উপজেলার মধ্যনগর থানার মাসুয়াকান্দা গ্রামের নজরুল ইসলাম (২৬) পৃথক বজ্রাঘাতে নিহত হন। এ ঘটনায় তাহিরপুর, ধর্মপাশা ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় আহত হয়েছেন আরো কমপক্ষে ১০ জন।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

ব্রিজ নয়, যেন মৃত্যু কূপ 

আলিফ আবেদীন গুঞ্জন, ঝিনাইদহ, ২১ এপ্রিল : ঝিনাইদহ হরিণাকুণ্ডু উপজেলার কয়েকটি ব্রিজে ভাঙনের ফলে ইউনিয়ন ও পৌরসভার সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। এতে যান চলাচলও বাধার মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী। মাঝে মধ্যেই এই ব্রিজে ইঞ্জিন চালিত স্থানীয় কিছু যানবাহন চলাচলের সময় দুর্ঘটনার মুখে পড়ছে। তবে এ ঘটনার জন্য জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকে দায়ী করছেন তারা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পৌরসভাধীন চটকাবাড়ীয়া গ্রামে খালের উপর পানি উন্নয়ন বোর্ডের ই-১-এ পানি নিষ্কাশন খালের উপর ব্রিজ, একই খালের উপর নির্মিত পৌরসভাধীন আদর্শ পাড়া ব্রিজ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের এস-৪এ, ঋষিপাড়া খালের উপর ব্রিজ, লালন সড়কের উপজেলা সদরের অডিটোরিয়ামের সামনে বক্স কালভার্টসহ প্রায় ৮/১০টি ব্রিজে একই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ব্রিজগুলো বেশ কয়েকমাস আগেই ভাঙনে ছোট বড় গর্তের সৃষ্টি হয়। একারণে যানবাহন ও সাধারণ মানুষের চলাচলের অনুপোযোগী হয়ে পড়ছে ব্রিজগুলো।

ইতোপূর্বে ব্রিজ ভেঙে ট্রাক, ইঞ্জিন চালিত যানবাহন লাটাহাম্বাসহ বেশ কয়েকটি ভ্যান রিকশাও দুর্ঘটনায় কবলিত হয়ে খালের মধ্যে পড়ে গেছে। এসব ঘটনায় হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। ব্রিজগুলো ষাটের দশকে তৎকালীন ই পি আই ওয়াবদা তৈরি করলেও পরবর্তীতে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ ব্রিজগুলোর দিকে নজর না দেয়ায় ব্রিজগুলোতে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে এবং চলাচলের চরম অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় ব্রিজগুলো মেরামত কিংবা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ব্রিজগুলো ভাঙনের ফলে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

নাম প্রকাশ না করার স্বার্থে পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা  বলেন, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকায় এ সমস্ত ব্রিজগুলো মেরামত করা যাচ্ছে না। সীমিত সংখ্যক অর্থ বরাদ্দের ফলে সেচ কাজে সমস্ত অর্থ ব্যয় হওয়ায় জনগুরুত্ব সম্পূর্ণ এ সমস্ত ব্রিজগুলো মেরামত করা যাচ্ছে না।

এ ব্যাপারে হরিণাকুণ্ডু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই জনগুরুত্ব সম্পূর্ণ এ সব ব্রিজগুলো মেরামতের ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো কর্ণপাত করেন না।

স্থানীয় হরিণাকুণ্ডু পৌরসভার মেয়র শাহিনূর রহমান রিন্টু বলেন, ব্রিজগুলো পানি উন্নয়ন বোর্ডের হওয়া সত্ত্বেও বার বার তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না। পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও গাফিলতির কারণে ব্রিজগুলো ভাঙনের ফলে জনগণের চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।

তিনি বলেন, তিনি ইতোপূর্বে বেশ কয়েকবার জনস্বার্থে পৌর তহবিল থেকে এ সমস্ত ব্রিজগুলো মেরামত করেছেন। সম্প্রতি চটকাবাড়ীয়া ব্রিজে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। যাহার কাজ দ্রুত শুরু হবে বলেও তিনি জানান।

হরিণাকুণ্ডু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এরশাদুল কবীর চেধুরী জানান, ব্রিজগুলো ভাঙনের ফলে ইউনিয়ন ও পৌরসভার কয়েকটি এলাকায় পুলিশের পিকআপভ্যান যেতে না পারায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে চরম সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। জনস্বার্থে ও আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির স্বার্থে দ্রুত এ সমস্ত ব্রিজগুলোর মেরামত প্রয়োজন। এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপ-সহকারী প্রকৌশলীর সেল ফোনে কয়েকবার যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

মনপুরা জেলে পল্লীর বাচ্চারা জানে না নববর্ষ কি? 

এলিজা হাওলাদার, মনপুরা (ভোলা), ১৫ এপ্রিল : বিশেষ দিনে নতুন পোশাকতো দুরের কথা গায়ে আহমরি কোন পোশাকই দেখা যায়নি তাদের গায়ে। নুর আলম, শাহীন, কবির, আলমগীর, আল-আমিন, জান্নাত, শিমা, খাদিজা, ইব্রাহীমদের মতো ছোট ছোট বাচ্চারা জানেই না পহেলা বৈশাখ আর নববর্ষ কি। ধুলো আর কাঁদা নিয়ে খেলাই এদের কাছে বিশেষ কিছু। ওদের পরিবারেরও একই অবস্থা। ১৪ এপ্রিল মঙ্গলবার মনপুরার হাজিরহাট ঘাট সংলগ্ন জেলে পল্লীর শতাধিক পরিবারে গিয়ে দেখা যায় এমন চিত্র।

নাজমা বেগম। বয়স ৮। কাঁদছে। সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি। মা শেপু বেগম। পাশের বিলে গেছেন শাক তুলতে। দুপুর ১২ টায়ও চুলোয় হাড়ি উঠেনি। পাশের বাড়ি থেকে ধার করা চাল ও পরিত্যক্ত জমি থেকে তুলে আনা শাক রান্না হবে পহেলা বৈশাখের এই দিনে। এটাই ওদের পরিবারে বিশেষ খাবার।

ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, রাকীব মাঝি। স্ত্রী আকলিমা। একমাত্র পুত্রসন্তান আবদুল মোতালেবকে (০১) নিয়ে নৌকায় ছেড়া জাল বুনছেন। তাদের করুন অভিব্যক্তি, ভাইরে কিসের পহেলা বৈশাখ আর কিসের নববর্ষ। পেটে ভাত নাই। সকাল থেকে কিছু খাই নাই। জাল বুনে নদীতে মাছ ধরুম। অবরোধের কথা বলতেই বলে ওঠেন, পেটে ক্ষূধার জ্বালা, সমিতির লোনের কিস্তি, আর বাইচা থাকতে হলে চুরি কইরা মাছ ধরা ছাড়া কোন উপায় নাই। জেলে পুর্ণবাসনের চাল জীবনেও পাননি বলে জানান।

সরেজমিনে হাজিরহাট, মাস্টারহাট, মাঝেরঘাটি, পঁচা কোড়ালিয়া, সূর্যমুখী, জনতা, তালতলা, ফৈজুদ্দিন, রিজির খাল, জংলারখাল, কাটাখাল, রামনেওয়াজ, আন্দির পাড়, নায়েবের হাট মাছের ঘাট ও জেলে পল্লী ঘুরে দেখা যায়, এই সমস্ত ঘাট সংলগ্ন গড়ে উঠেছে অসংখ্য জেলে পল্লী। জেলে পল্লীর সব পরিবারে একই অবস্থা। কোন পরিবারে সকালে রান্না হয়নি, কোন পরিবারে চলছে ডাল আর শাক রান্নার প্রস্তুতি। প্রতিদিনই তারা অর্ধাহারে-অনাহারে দিন যাপন করছেন বলে জানান তারা। ওয়াপদার বেড়ীবাঁধের পাশে গড়ে ওঠা ঝুপড়ি ঘড়ে বসবাস এদের। তাদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, পহেলা বৈশাখ সম্পর্কে জানেন তারা। তবে সংসারে অভাব, পেটের দায়, সমিতির লোনের কিস্তির টাকা পরিশোধ করতেই যেন প্রান যায়। গত ০১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত নদীতে সকল প্রকার মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় জেলেরা মাছ ধরতে পারছেনা। সরকার ঘোষিত জেলে পুনর্বাসনের চালও পাননি তারা। অনেকের গায়ের ছেড়া ও মলিন পোশাকই ভাল পোশাক তাদের। আর নববর্ষের এই দিনে ভাল কিছু রান্না করে খাওয়ার স্বাধ্য নেই। বাঙ্গালী সংস্কৃতির এক বড় উৎসব পহেলা বৈশাখ। এই উৎসব কারো জন্য মহা আনন্দের আরো জন্য বড় অসহায়ত্বের। নববর্ষ উৎসব বৈষম্য দুর করে কাছে আসার উৎসব। মনপুরার জেলে পল্লীর এমন চিত্র অনেকটাই পহেলা বৈশাখী উৎসবকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

জেলে পুনর্বাসন সম্পর্কে উপজেলা মৎস্য অফিসার মোঃ সাইদুর রহমান রেজা জানান, উপজেলায় প্রায় ১৫ হাজার জেলে রয়েছে। তবে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৬ হাজার ৬ শত ৭১ জন। উপজেলায় সাড়ে ৪ হাজার জেলেকে পুনর্বাসনের চাল বিতরন করা হবে। অবশিষ্ট জেলেদের পুনর্বাসনের জন্য উপরস্থ কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করছি।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

জীবন যুদ্ধে থমকে গেছে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দল হামিদ 

ছাদেকুল ইসলাম রুবেল, গাইবান্ধা, ২৬ মার্চ : একাত্তরে আব্দুল হামিদ তখন টগবগে যুবক। সময়টা ছিল খুব উত্তাল। মুক্তির নেশায় কাপছে পুরো দেশ। পাকিস্তানিদের অত্যাচার আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে এদেশের আপামর জনগণ। আব্দুল হামিদ চাইলে স্বার্থপরের মতো কাপুরুষ হয়ে ঘরে চুপসে থাকতে পারতেন। কিন্তু তার অদম্য সাহস আর নিখাদ দেশপ্রেম তাকেও নিয়ে যায় মুক্তির মিছিলে ও মুক্তিযুদ্ধে। আব্দুল হামিদের সাথে ছিলেন আরেক বীর আবু তাহের।

তার এই  মহাবীরের  এমন অনেক সফল সাহসী অভিযান হয়েছিল মুক্তি যুদ্ধকালীন সময়ে। দেশ হয়েছিল স্বাধীন। জনগণ পেয়েছিল স্বাধীনতার সুখ। আব্দুল হামিদ জীবন বাজী রেখে ৭১-এ  দেশ স্বাধীন করলেও জীবন যুদ্ধে তিনি আজ পরাজিত সৈনিক।  বর্তমানে তিনি দু’নয়নের দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে অন্ধত্ব বরণ করে মানবেতর জীবন যাপন করছে। দেশ স্বাধীনের ৪৪ বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো সরকারি সুবিধা পাননি।

গাইবান্ধা জেলার সাদুল্যাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের জয়েনপুর গ্রামের মৃত্যু মুনছুর আলীর ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হামিদ। বয়স ৬৫ এর কাছাকাছি। তিনি জানান, ১৯৬৯ সালে মুজিববাদ ছাত্রলীগের সাদুল্যাপুর থানা শাখার সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে সম্মেলনে যোগদেন। সম্মেলন শেষে নিজ জেলা গাইবান্ধার বিভিন্ন আন্দোলনে অংশ নিয়ে সক্রীয় ভুমিকা পালন করেন।এছাড়াও গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর থানা শহরে একটি শহিদ মিনার স্থাপন করার লক্ষে তৎকালীন সিও আঃ খালেকের সাথে যোগাযোগ করেন। তার সার্বিক সহযোগিতায় ওই শহিদ মিনারটি নির্মাণ করেন। এভাবে তার ছাত্র আন্দোলন অব্যাহত রেখে ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন। ১১নং সেক্টরে সুবেদার আলতাফ হোসেনের নেতৃত্বে তৎকালীন জেলা ছাত্রলীগের নেতা নাজমুল আরেফিন তারেকসহ অন্যান্যদের সাথে নিয়ে পীরগঞ্জ উপজেলার মাদারগঞ্জ এলাকায় সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

এরপরে পাকিস্তানী বাহিনী পীরগঞ্জের আংড়ার ব্রীজে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ করলে তিনি তার সহযোগী আবেদ আলীকে সাথে নিয়ে ওই যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে প্রতিহত করেন। এ কারণে তৎকালীন স্ব-রাষ্ট্র সচিব তসলিম আহম্মেদ ও আঞ্চলিক অধিনায়ক মনিরুল ইসলামের স্বাক্ষরিত একটি স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদপ্রাপ্ত হন। যাহার নং-২০২৩১। এখন পর্যন্ত তিনি সরকারী কোনো সুবিধা না পাওয়ায় বর্তমানে তিনি স্ত্রী ছালেহা বেগমসহ ৪ ছেলে ও ৪ মেয়েকে নিয়ে অন্ধত্ব জীবনে মানবেতর জীবন যাপন করে আসছেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হামিদ জানান, তিনি সরকারী সুবিধা পেতে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করেও কোন ভাতা কিংবা সুবিধাদী পাননি। জীবন চলার পথে তিনি সাদুল্যাপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল লিখক হিসাবে কাজ করে সংসার চালিয়ে আসলেও, ২০১৩ সালের ডিসেম্বর থেকে বয়সের কারণে অন্ধত্ব বরণ করেন । যেন থমকে গেল জীবন। এর ফলে পরিবার পরিজন নিয়ে মাববেতর জীবন যাপন করে আসছেলন।

অন্ধ বীরমুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হামিদ আরও জানায়, স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে স্থানীয় ডাক্তার সহ ঢাকা জাতীয় চক্ষু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে থমকে গেছে। অর্থাভাবে চিকিৎসা সেবা নিতে না পারায় অবশেষে চোখের দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ফেলে ঘরের কোনে বসে দিন পাড় করছে।  তিনি দেশ স্বাধীন করে শুধুই  পেয়েছে  একটি সাটিফিকেট। এটাই শুধুই স্মৃতি হয়ে আছে।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর