২৩ মে ২০১৭
ভোর ৫:১২, মঙ্গলবার

একজন শেখ হাসিনা ও তাঁর সাফল্যের ৩ যুগ

একজন শেখ হাসিনা ও তাঁর সাফল্যের ৩ যুগ 

0136

আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন : মানুষ একবার জন্মে, একবারই মরে। জীবন-মৃত্যুর মাঝখানের সময়টায় অধিকাংশ মানুষ নিজ ও নিজ পরিবার নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করে। কিছু মানুষ থাকে ব্যতিক্রম। এই ব্যতিক্রমগণ সমাজের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য, ধর্মের জন্য, মানবতার জন্য, ন্যায়ের জন্য তথা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য কল্যানকর কিছু মহৎ কর্ম করে যান । তাঁরা স্বমহিমায় ইতিহাসের বিষয়বস্তু হন, বিজ্ঞান, দর্শন, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠেন। শতাব্দীর মহাকাল পেরিয়েও তারা বেঁচে থাকেন । কর্ম তাদের অমরত্ব দান করেন। দেহ পরপারে যাবার পরও মানুষের হৃদয়ের গহীনে শ্রদ্ধায়, ভক্তিতে তাঁরা বেঁচে থাকেন শতাব্দীর পর শতাব্দী । বিশ্বময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এসব মহৎ মানুষদের জীবন, কর্ম, চিন্তা, বাণী, লেখনী নিয়ে যুগ যুগ ধরে গবেষকগণ গবেষণা করেন। অভিসন্দর্ভ রচনা করে উচ্চতর ডিগ্রী লাভ করেন ।

বাংলার প্রধানমন্ত্রী উন্নয়নমাতা শেখ হাসিনা এমনই একজন ব্যতিক্রমী মানুষ। তিনি তাঁর সময়কে, কাল কে, নিজ রাষ্ট্রের সীমানাকে অতিক্রম করে আজ এক অনন্য উচ্চতায় আসীন হয়েছেন। দেশপ্রেম, মানবপ্রেম, উন্নয়ন কর্ম, কল্যান সাধন এবং পরাক্রমশালী বিশ্ব মোড়লদের নিকট মাথা নত না করে সত্য ও ন্যায়ের পথে দৃঢ়চেতা পথ চলা তাঁকে সমকালিন বিশ্বে এক ভিন্ন মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে ।

আজ ১৭ মে বঙ্গবন্ধু-কন্যার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ৩ যুগ পূর্ণ হল। এই তিন যুগ তিনি দেশের প্রধানতম রাজনৈতিক দলের সভাপতি। এই তিন যুগের মধ্যে মাত্র এক যূগ এক বছর তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন। সরকার যায়, সরকার আসে, রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী যায়, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী আসে। এটিই সতত রীতি। কিন্তু শেখ হাসিনা বারবার আসেন না। তিনি একজনই এবং তাঁর তুলনা কেবলই তিনি। খুব কম রাষ্ট্রনায়কের পক্ষে তাঁর মত উন্নয়ন ও কল্যান করা সম্ভব হয়েছে এবং একটি বিশ্ব অস্থিতিশীল সময়ে নিজ দেশে শান্তি বজায় রাখা এবং সহযোগিতার বেশে এসে আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত করা থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে পেরেছন। বাংলাদেশ ও বাঙালির যতগুলো বড় বড় অর্জন তার অধিকাংশই হয় পিতার নেতৃত্বে অথবা কন্যার নেতৃত্বে অর্জিত হয়েছে।

বাঙালির স্বাধীনতা অর্জন এ’জাতির সবচেয়ে বড় ও মহত্ত্বম অর্জন। এরপরের সবচেয়ে বড় অর্জন সব মানুষের ভাত খাওয়ার অধিকার বাস্তবায়ন। এমনি আরও অনেক বড় বড় অর্জন রয়েছে বাংলাদেশ ও বাঙালির। যেমন: মায়ের ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা লাভ, বিনা রক্তপাতে বিশাল সমুদ্র বক্ষে বাংলাদেশর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা ও মহীসোপান পর্যন্ত একক অর্থনৈতিক অধিকার লাভ, মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের সীমানা বৃদ্ধি করন, মহান মুক্তিযুদ্ধের ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, গ্যারান্টি ক্লজ সহ গঙ্গা পানি চুক্তি সম্পাদন, তলাবিহীন ঝুড়ি অপবাদকারীদের মুখে ছাঁই দিয়ে ৩৩ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ সৃষ্টি, স্বল্পতম সময়ে বিদ্যূৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১.৫ গিগাওয়াটে উন্নীতকরন, জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি ও রপ্তানী আয় ৩০ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ, ফ্লাইওভারসহ বিভিন্ন বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ, নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সৃষ্টির মাধ্যমে অসহায় সিনিয়র সিটিজেনদের বেঁচে থাকার পথ রচনা, গণতন্ত্রের ধারা নিরবিচ্ছিন্ন করন, সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী ও বিজিবি, কোস্টগার্ডের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন করে জাতীয় নিরাপত্তা সুসংহতকরন, পুলিশ বাহিনীর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন করে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নতকরণ ও বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলা, তৃনমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ই-সেবা চালুকরন, সবার জন্য শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি, ক্রিকেটের বিশ্বমর্যাদা লাভ, আইপিইউ ও সিপিএ’র মত মর্যাদাশীল প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদ লাভসহ বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের মর্যাদা লাভ বাঙালীর অন্যতম উল্লেখযোগ্য অর্জন।

সবচেয়ে মজার বিষয় হ’ল এসব অর্জন এসেছে জাতির পিতার হাত দিয়ে, নয়ত তাঁর আদরের কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে। জাতির পিতার মৃত্যুর পর অনেকেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছেন। কিন্তু কারও হাত দিয়ে বড় মাপের মহৎ কৌন অর্জন হয় নাই। এখানেই উন্নয়নমাতা শেখ হাসিনার বিশেষত্ব।

শুধু দেশেই নয়, তাঁর কর্ম, নেতৃত্ব ও সাহসিকতা আজ দেশের মানচিত্র অতিক্রম করে বিশ্বস্বীকৃতি লাভ করেছে। আয়তনে ছোট, জনশক্তিতে বড় রাষ্ট্রটির প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব জলবায়ু আন্দোলনের শীর্ষভাগে আসন নিয়েছেন। অভিবাসীর প্রশ্নে তিনি উচ্চকন্ঠ ও আপোষহীন। জঙ্গী সৃষ্টি ও জঙ্গী ইস্যু করে মুসলমান নিপীড়নের বিষয়ে বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম শাসক নিরব ও আপোষকামী। অকূতোভয় শেখ হাসিনা এই ইস্যুতেও সোচ্চার, উচ্চকন্ঠ ও প্রতিবাদী। মৃত্যু ভয় উপেক্ষা করে তিনি জঙ্গী উৎপাদন ও অস্ত্রের উৎস সম্পর্কে নির্ভীক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে এই মুহূর্তে সমগ্র বিশ্বের মুসলমান রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানদের মধ্যে মুসলমানদের নিরাপত্তার প্রশ্নে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বাপেক্ষা সোচ্চার। তাঁর মত সাহসিকতা নিয়ে মুসলমানের পক্ষে আর কেউ বলেন না।

এছাড়াও মানবতার অন্যান্য প্রশ্নে, নিপীড়নের প্রশ্নে, শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকারের প্রশ্নে শেখ হাসিনা বিশ্বনেতৃত্বের প্রথম কাতারে অবস্থান সৃষ্টি করে নিয়েছেন। আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন জননেত্রী শেখ হাসিনাকে শতবর্ষী করলে এবং অসীম রহমতে তাঁকে কর্মক্ষম রাখলে তিনি এ পৃথিবীকে আরো অধেক মহৎ কিছু দিতে পারবেন।

ইতিমধ্যেই উন্নয়ন মাতার কর্মকৌশল নিয়ে শিশ্বব্যাপী আগ্রহ বেড়েছে। অনেক উন্নয়নশীল দেশ তাঁর কর্মকৌশল অনুসরণ করা শুরু করেছে। তিনি বিশ্ব রোলভডেলে উন্নীত হয়েছেন।

১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে আজকের এই দিনে স্বজনহারা স্বদেশের মাটিতে ফিরে আসেন এতিম, অসহায় শেখ হাসিনা। পিতা, মাতা, ভাই, ভাবী, স্বজন হারানোর সমুদ্রসম বেদনা বুকে পাথর চাপা দিয়ে তাঁকে দূর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। পদে পদে হত্যার লক্ষ্যে পরিচালিত হামলা মোকাবেলা করতে হয়েছে। নিজ দলে, নিজ দেশে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে জনতাকে সাথে নিয়ে বন্ধুর পথ চলতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধু কন্যার তিন যুগের অধ্যবসায়, সাহসিকতা, দেশপ্রেম, দেশের মানুষ ও সার্বভৌমত্বের প্রতি নিগূঢ় ভালবাসা, জ্ঞান অর্জন ও বিশ্রামহীন অমানবিক পরিশ্রম তাঁকে দলের গন্ডি পেরিয়ে দেশের, দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন ও কল্যানের দক্ষ কারিগরের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। তিনি আজ ক্ষুধা মুক্তি, দারিদ্র্য মুক্তি, সন্ত্রাসবাদ মুক্তির দিশারী। উন্নয়ন ও কল্যানের রূপকার।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। নিউজ৬৯বিডি ডট কম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

ধর্ষকরা কি ক্ষমতাবলে বেঁচে যাবে 

1473161906

সাহাদাত সাঈদ, ৩০ এপ্রিল : ক্ষমা করে দিস বোন, তোকে রক্ষা করতে পারেনি তোর এই হতভাগ্য ভাইয়েরা। বলছি সাত বছরের আয়শার কথা, যাকে ফারুখ নামের হায়ওয়ান ধর্ষণ করছে। শুধু ধর্ষণ করেই ক্ষ্যান্ত দেয়নি, ধর্ষণের বিচার চাওয়ার জন্য তাদের পরিবারকে শারীরিক ও মানসিকভাবে এমন নির্যাতন করেছে, শেষ পর্যন্ত মেয়েকে নিয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে তার পিতা হযরত মাহমুদ। গতকাল (২৯ এপ্রিল ২০১৭ইং) শনিবার নিজের মেয়েকে নিয়ে তার পিতা ট্রেনের নিচে ঝাপ দিয়েছে। আর সেখানেই দু’জন নিহত হয়েছে।

প্রায় ৩০ বছর আগে দিনমজুর হজরত মাহমুদ শ্রীপুর উপজেলার কর্নপুর ছিটপাড়া গ্রামের হালিমাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর হজরত স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে ঘরজামাই হিসেবে থাকতেন। অভাব-অনটনের সংসারের জোগান দিতে হালিমা ভিক্ষাবৃত্তি ও অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। নিঃসন্তান হওয়ায় এ দম্পতি আয়েশাকে দত্তক নিয়ে লালন-পালন করতেন।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদেন মাধ্যমে জানা যায়, ফারুক নামের এক বখাটে যুবক প্রায় দুই মাস আগে আয়েশাকে ধর্ষণ করে। থানায় এ ব্যাপারে অভিযোগ দেওয়া হলে ফারুক ও তার লোকজন হালিমা ও তার স্বামীর ওপর ক্ষুব্ধ হয়। পরে স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল হোসেন এ ঘটনার বিচারের দায়িত্ব নেন। কিন্তু কোনো মীমাংসা ছাড়াই তিনি বিষয়টি ধামাচাপা দেন।

ক্ষমতাবানদের ছায়াতলে আশ্রয় পায় যত সব কুলাঙ্গার। ক্ষমতাবানদের উচিৎ সমাজের এই সকল নরাধমদের যে কোন মূল্যে বিচারের আওতায় নিয়ে আশা। জনগণ যাদের ক্ষমতার মসনদে বসান, তাদের দায়িত্ব হলে জনগণের নিরাপত্ত্বার বিধান করা। যে নেতা এটা না করবেন তারা নিজেরাই নিজেদের সাথে জুলুম করবে। অপেক্ষা করবেন মৃত্যুর আগেই ভুগ করতে হবে নিজের কৃতকর্মের ফল।

সাংবাদিকতার জন্য প্রতিদিন নিউজ করি, নিউজ পড়ি, প্রতিদিনই দেশের নানান প্রান্ত থেকে ধর্ষনের খবর পড়ে বিরক্ত হই এবং ভাবি,আমরা পশুর চেয়েও জঘন্য হয়ে গেলাম, ধর্ষণের মত খারাপ কাজ করতে একটুও বিবেকে বাঁধে না। বিচারের জন্য বাবা দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে, বিচারতো পায় না, উল্টো তাকে হয়রানির শিকার হয়।
১৪টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে করা বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে,২০০৮ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আট বছরে ধর্ষণের শিকার ৪ হাজার ৩০৪ জনের মধ্যে ৭৪০ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

বছরভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী,২০০৮সালে ধর্ষণের শিকার ৩০৭ জনের মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ১১৪ জনকে। ২০০৯ সালে ধর্ষণের শিকার ৩৯৩ জনের মধ্যে ১৩০ জন, ২০১০ সালে ধর্ষণের শিকার ৫৯৩ জনের মধ্যে ৬৬ জন, ২০১১ সালে ধর্ষণের শিকার ৬৩৫ জনের মধ্যে ৯৬ জন, ২০১২ সালে ধর্ষণের শিকার ৫০৮ জনের মধ্যে ১০৬ জন, ২০১৩ সালে ধর্ষণের শিকার ৫১৬ জনের মধ্যে ৬৪ জন, ২০১৪ সালে ধর্ষণের শিকার ৫৪৪ জনের মধ্যে ৭৮ জন এবং ২০১৫ সালে ধর্ষণের শিকার ৮০৮ জনের মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৮৫ জনকে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস)এর পরিসংখ্যান বলা হয়েছে, (জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য) ২০০১ সাল থেকে ২০১৬ সালপর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হন ১৮১ জন গৃহকর্মী। তাঁদের মধ্যে ধর্ষণের পর মোট কতজনকে হত্যা করা হয়েছে, সেই পরিসংখ্যান দিতে না পারলেও সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু গত বছরেই ধর্ষণের শিকার ১১ জনের মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় চারজন গৃহকর্মীকে।

১৪টি দৈনিক পত্রিকা থেকে সংগৃহীত তথ্য দিয়ে বিএনডব্লিউএলএ দেয়া এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ধর্ষণের চেষ্টা, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, ধর্ষণের পর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ৪ হাজার ৪২৭টি। এর মধ্যে মামলা দায়ের করা হয়েছে ২ হাজার ৭৩৪টি। গত ছয় বছরে ধর্ষণের পর ৫০৮ নারীকে হত্যা করা হয়েছে এর মধ্যে মামলা হয়েছে মাত্র ২৮০টি ঘটনায়। আর ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন ১৬৮ নারী এবং মামলা হয়েছে মাত্র ১১৩টি।
২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর দিল্লিতে এক ছাত্রীকে চলন্ত বাসে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা গোটা ভারতকেই নাড়িয়ে দিয়েছিল। এর কিছুদিন পরই ২০১৩ সালের ২৪ জানুয়ারি ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে (মানিকগঞ্জ এলাকায়) চলন্ত বাসে এক পোশাককর্মীকে ধর্ষণ করে দুই বাসকর্মী।এভাবে সোহাগী জাহান তনুর মত অসংখ্য বোনেরা ধর্ষনের শিকার হয়ে জীবন দিয়েছে। এখনো তাদের পরিবার নিরবে কেঁদে যাচ্ছে একটু ন্যায় বিচারের আশায়।

এই যদি হয় দেশের অবস্থা তাহলে মা-বোনেরা কোথায় নিরাপদ হবে।এখানে আইনের শাসন বাস্তবায়িত না হওয়ায় দিনকে দিন এই ধর্ষনের সংখ্যা বাড়ছে।
আমাদের সমাজকে এই সকল ধর্ষকদের বিরুদ্ধে হতে হবে সোচ্চার। ধর্ষকদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। শিক্ষার জন্য শিক্ষা নয়, মানবতার জন্য শিক্ষা গ্রহন করতে হবে। প্রত্যেক পরিবার তার পরিবারের সন্তানদের সর্ম্পকে খোঁজ খবর নিতে হবে। সন্তান কোথায় যায় কি করে সব। ধর্মীয় শিক্ষা মানুষকে অন্যায়-অবিচার থেকে দূরে রাখে তাই প্রত্যেককে তার স্ব স্ব ধর্মের শিক্ষা নিতে হবে।

মেয়েরা আমাদের মায়ের জাত তাদের সম্মান দেখাতে শিখতে হবে। স্কুল, কলেজ, মাদ্রসা, মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা সব জায়গায় ধর্ষকদের বিরুদ্ধে জনমত গড়তে হবে। আইনের শাসন প্রয়োগ করতে হবে। ধর্ষক এমন শাস্তির আওতায় আনা উচিৎ, যাতে কেউ ধর্ষণের চিন্তা মাথায় আনতে হাজার বার চিন্তা করে।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

ঔপন্যাসিক কাসেম বিন আবুবাকার : সাহাদাত সাঈদ 

আমরা একটা কথা সবাই জানি, “যে দেশে গুণীদের কদর নেই, সে দেশে গুণীর জন্ম হয় না”। আসলেই আমরা যদি সম্মানী ব্যক্তিদের সম্মান দিতে না পারি, তাহলে আমাদের দেশে সম্মানী ব্যক্তিদের জন্ম হবে না। আমরা নিজেরা নিজেদের প্রগতিশীল মনে করলেও আসলে আমাদের গতি একটা জায়গায় এসে থেমে যায়। তা হল আমরা অন্যের গতিকে সহ্য করতে পারি না। যদি অন্যের গতি সহ্যই করতে না পারি তাহলে আমরা কেমন প্রগতিশীল?

আবার আমরা অনেকই নিজে খুব মুক্তমনা বলে দাবি করি। আসলে কখনো কি ভেবে দেখেছি আসলেই আমরা কি মক্ত মনের অধিকারী। যদি মুক্ত মনের অধিকারী হই তাহলে অন্যে মত প্রকাশ আমাকে উত্তেজিত করতো না। মূল প্রগতিশীল সেই যে অন্যের গতিকে সামনে এগিয়ে নেয়ার জন্য তাকে  উৎসাহ দেয়। মুক্তমনাতো সেই যে অন্যের মন্তব্য বা মতকে সম্মান দেখায়। যেদিন আমরা এটা দেখাতে পাবরো সেদিন আমরা উন্নত ও সভ্য জাতি হিসেবে নিজেকে পরিচয় নিতে পারবো।

আজ একজন লেখকের কথা বিশ্ব মিডিয়ায় ব্যপক আলোচিত। তিনি একজন লেখক যে নিবরে লিখে গেছেন তার লেখা। আমরা হয়তো তাকে মূল্যায়ন করতে পারিনি। বিশ্ব গণমাধ্যম তাকে ঠিকই সম্মান জানাতে পেরেছে। এটা কি আমাদের ব্যর্থতা নয়। সে মোল্লা না মুন্সি সেটা বড় কথা নয়, সে আমার দেশের সাহিত্যের ভুবনের একটা সম্পদ। তাকে যথাযথ মূল্যায়ন আমাদের করতে হবে।

আমরা এমন একটা জাতি যারা তাদের নেতাদের সমালোচনার পাত্র বানিয়ে রেখেছি। আমরা আজও বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সম্মান দেখাতে পারি না। তাকে নিয়ে রাজনৈতিক কাদা ছোরা-ছুরি করি। আমরা সম্মান দেখাতে পারি না জিয়াউর রহমানের প্রতি। তারা আমাদের স্বাধীনতা জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন তা আর দ্বিতীয় বার কেউ করতে পারবে না। আমরা যখন এই জাতীয় নেতাদের দলমত নির্বিশেষ সম্মান ও ভালবাসতে পারবো সেদিন আমরা দেশের অগ্রতি দূর্বার গতিতে এগিয়ে নিতে পারবো।

গতকাল ব্রিটেনের প্রভাবশালী দৈনিক মিরর, বার্তা সংস্থা এএফপি, ভারতের টাইমসনাওসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় তাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে বাংলাদেশের মেইন স্ট্রিম পত্রিকাগুলো তাকে সেভাবে তুলে না আনলেও সাধারণ পাঠকরা তার বই একচেটিয়া কিনে থাকে। শুধু বাংলাদেশ নয় পশ্চিমবঙ্গেও তার বইয়ের ব্যাপক বাজার রয়েছে।

অনেকের দাবি, কাসেম বিন আবুবাকার বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক। তবে বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যমে বরাবরই আলোচনার বাইরে ছিলেন কাসেম বিন আবুবাকার। ঔপন্যাসিক হিসেবেও সাহিত্য সমাজে ‘স্বীকৃতি ও সমাদর’পাননি তিনি। কিন্তু আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি কাসেম বিন আবুবাকারকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছেন তিনি। যুক্তরাজ্যের শীর্ষ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইল, মার্কিন সংবাদমাধ্যম ইয়াহু নিউজ, মধ্যপ্রাচ্যের আরব নিউজ, মালয়েশিয়ার দ্যা স্টার ও মালয়মেইল, পাকিস্তানের দ্য ডন, ফ্রান্সের ফ্রান্স টুয়েন্টি ফোর ও রেডিও ফ্রান্স ইন্টারন্যাশনাল, হাঙ্গেরির হাঙ্গেরি টুডেসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ফলাও করে কাসেমকে নিয়ে ওই প্রতিবেদন ছেপেছে।

এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাসেম বিন আবুবাকার ১৯৭০ দশকের শেষের দিকে একজন বই বিক্রেতা হিসেবে প্রায় সব উপন্যাসের মধ্যে শুধু শহুরে অভিজাতদের জীবনযাত্রার কথা দেখতে পেয়ে নিজেই হাতে কলম তুলে নেন। এরপর ১৯৭৮ সালে কাসেম তার প্রথম উপন্যাস ‘ফুটন্ত গোলাপ’লেখেন। তবে ‘মোল্লার উপন্যাস বিক্রি হবে না’বলে এটি প্রকাশকের নজর কারতে প্রায় এক দশক সময় লাগে। ওই প্রকাশকের কাছে মাত্র এক হাজার টাকায় এটির সত্বও বিক্রিও করে দেন তিনি। এরপর ইসলামী মূল্যবোধকে সামনে রেখে কাসেমের লেখা একের পর এক প্রেমের উপন্যাস প্রকাশিত হতে থাকে। এসব উপন্যাস দ্রুতই তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। লাখ লাখ পাঠকের হাতে হাতে ঘুরতে থাকে তার উপন্যাস।

এএফপিকে বাংলাদেশের সাংবাদিক কদরুদ্দিন শিশির বলেছেন, কাসেম বিন আবুবাকার এমন এক নতুন পাঠকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছেছেন, তার আগে যাদের অস্তিত্বের কথা কেউ ভাবেইনি। তিনি আরও বলেন, গ্রাম এলাকায় তরুণ প্রেমিকরা তাদের প্রেমিকাকে সেরা উপহার হিসেবে কাসেমের উপন্যাস দিয়ে থাকে। কাসেমের উপন্যাস মাদ্রাসা বা ধর্মীয় আবাসিক স্কুলের ছাত্রদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় হওয়ার একটি ব্যাখ্যা এএফপির কাছে তুলে ধরেন সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ। তিনি বলেন, তারা কাসেমের গল্পের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারে। আর এসবের কাহিনী বিন্যাস এবং ভাষাও তাদের কাছে আরামদায়ক মনে হয় বলে পারভেজের মত।
এএফপি বলছে, স্যেকুলার লেখকরা এমন এক দুনিয়ার গল্প বলেছে, যেখান থেকে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের প্রধান অংশের গ্রামীণ ও ধর্মীয় জীবনের অস্তিত্ব মুছে ফেলা হয়েছে। কাসেম এই শূন্যতার বিষয়টি অনুধাবন করে তার উপন্যাসের বাজার গড়ে তুলেছেন।

এছাড়া কাসেমের এ প্রচেষ্টা থেকে নতুন প্রজন্মের অনেক বাংলাদেশী লেখক অনুপ্রাণিত হয়ে সমকালীন ‘ইসলামী উপন্যাস’লিখে সাফল্যের পথ খুঁজে পেয়েছেন। এদের মধ্যে আবদুস সালাম মিতুল, কাউসার আহমেদ এবং আবদুল আলিমের মতো লেখক উল্লেখযোগ্য। (সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন)

কাশেম বিন আবু বকের উল্লেখিত উপন্যাস হল ফুটন্ত গোলাপ, বিদায় বেলা, কেউ ভোলে, কেউ ভোলে না, শরিফা, প্রতিবেশিনী, প্রতিক্ষা, বোরখা পরা সেই মেয়েটি।
বাংলাদেশের এক প্রবীন আইনজীবী রফিকুল হক বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দেখে বলেছিলেন, আমরা কত বড় বেকুবের দেশে আছি, যেখানে গুনীদের সম্মান দিতে জানি না। গুণী জনকে সম্মান দিলে সম্মান কমে না, বাড়ে। (সূত্র: প্রথম আলো)

এ দেশে দল বা মতের কারণে অনেক মেধা অঙ্কুরে ধ্বংশ হয়ে যায়। আবার অনেকেই এদেশে মূল্যায়ন না পেয়ে বিদেশি সেলিব্রেটি হয়েছেন। আমরা আমাদের মেধাবীদের সম্মান দিতে শিখিনি। চাকরির ক্ষেত্রে এখন যারা পিছনের দিক থেকে প্রথম হয় তাদের চাকরিতে নিয়োগ দেয়া হয়। রাজনীতি তারা প্রথম সারির নেতা যারা দূর্নীতিবাজ।

আমরা সবাই যদি মেধার কদর করি, মেধাবীদের মূল্যয়ন করি, গুনীজনকে সম্মান করি তাহলে দেশ হবে সুখি-সমৃদ্ধ। জাতি পাবে মেধাবী ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাহিত্যিক-সাংবাদিক, উপন্যাসিক, বুদ্ধিজীবী। সব জায়গায় থাকবে মেধাবীরা।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

তুষার কিবরিয়া তোমাকে নিয়ে আমি আতংকিত 

আসাদুজ্জামান সাজু, লালমনিরহাট, ৬ এপ্রিল : এই তো কয়েক দিন আগে বন্ধুবর ও ছাত্রলীগ সাবেক সভাপতি জুয়েলসহ আমার অফিসে আড্ডায় মেতে ছিলাম। ওই সময় ছোট একটা পিচ্ছি ছেলে এসে জুয়েলের সামনে দাড়িঁয়ে ভয় ভয় করে কি যেনো বলছিলো। জুয়েল তাকে ধমকের সুরে মিষ্টি ভাষায় পুরো বিষয়টি বুঝিয়ে দিলেন । ছেলেটি মহা খুশি। আমি তখনও ছেলেটি চিনতে পারি নাই । পরে আমি নিজেই তাকে জিজ্ঞাসা করলাম তুমি কার ছেলে ভাই ? উওরে এলোমেলো ভাবে আমাকে বলেছিল ভাই, আমি আপনাদের মাহবুব বিএসসি স্যারের ছেলে তুষার কিবরিয়া। তারপর অনেক অনেক কথা হলো।

সেই দিন তার মাঝে আমি দেখে ছিলাম নেতৃত্বের লক্ষ। দেখেছিলাম বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার প্রেম, দেখেছিলাম ছাত্রলীগের প্রতি তার ভালোবাসা। পরে তাকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে কথা হয় বন্ধু জুয়েল ও ছোটভাই লালমনিরহাট জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সম্পদের সাথে। সম্পদের মুখে শুনেছি তার ছাত্র জনপ্রিয়তার কথা। আমি ছোট ভাই সম্পদের কথা গুলো সেভাবে বিশ্বাস করতাম না। ভাবতাম হাতীবান্ধার ছেলে হয়ে রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ব বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে জনপ্রিয় হওয়া ছোট বিষয় নয়। আমি ছোটভাই ছাত্রলীগের জনপ্রিয় ছাত্রনেতা সম্পদের এসব কথা রাজনৈতিক চাপা মনে করতাম। কিন্তু সত্যি সেই পিচ্ছি ছোট ছেলে প্রিয় ছোট ভাই তুষার কিবরিয়া বঙ্গবন্ধুর ছাত্রলীগের বেগম রোকেয়া বিশ্ব বিদ্যালয়ে সভাপতির দায়িত্ব পেলো।

তুষার তোমাকে ধন্যবাদ জানাবো না। শুধু বলবো ছাত্রলীগের হাজারও কর্মী মুক্তির অপেক্ষায় বসে আছে তোমার নেতৃত্বের জন্য। তুমি এখনো বিজয়ী হওনি । স্বাধীনতা অর্জন করা যতটা সহজ, তা রক্ষা করা ততটাই কঠিন।

আমরা স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও স্বাধীনতার স্বাদ পায়নি। যারা মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিরোধীতা করেছে। যারা বাংলাদেশের অপর নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরোধীতা করেছে। যারা বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আনন্দ উল্লাস করেছে। তারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলো, আছে , কতদিন থাকবে তা জানি না ?

তুষার কিবরিয়ার স্বপ্ন সারা জীবন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ লালন করে রাজনীতি করে মানুষের পাশে থাকবে। ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পাওয়ার পর আমাকে ফোনে বলেছে, ভাই জীবনের বিনিময় হলেও এ ক্যাম্পাসকে সন্ত্রাস, মাদক ও শিবির মুক্ত রাখবো। আমার জন্য শুধু দোয়া করবেন। সে ইতোমধ্যে আলোচনা সভা ডেকে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের বলে দিয়েছে, যারা নেশাগ্রস্ত তাদের ছাত্রলীগের থাকার দরকার নেই। সে আশাবাদী ছাত্রদের হাতে অস্ত্র নয়, আমি কলম দিয়ে তাদের রাজনীতিতে এগিয়ে নিয়ে যাবো

আমি আতংকিত ছোটভাই বঙ্গবন্ধু প্রেম পাগল তুষার কিবরিয়া কতটা তার দায়িত্ব পালন করতে পারবে ? তুষার ছাত্র হিসাবে শুধু মেধাবীই নয়, নেত্বতে আছে তার বেশগ্রহন যোগ্যতা। তার বন্ধুদের মতে তুষার কিবরিয়া সৎ, নিজের নীতিতে আপোষহীন বটে। আমিও বলছি সৎ ও আদর্শবান শিক্ষকের সন্তান তুষার কিবরিয়া অবশ্যই সৎ হবেই। বর্তমানের নোংরা রাজনীতিতে সৎ ও নীতি আপোষহীনদের স্থান নেই। তাই তুষার কিবরিয়াকে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। আমি জানি না তুষার কতটা সফল হবে ?

তবে তুষারকে বলবো তোমাকে সৎ ও নীতি ঠিক রেখে সফল হতে হবে রাজনীতিতে। অবহেলিত ছাত্র-ছাত্রীদের পাশে দাড়াতে হবে। তোমাকে বন্ধবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে যেতে হবে। তোমাকে আরও অনেক দুর গিয়ে বিজয়ী হতে হবে……

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

অভিনেতা তোফা ই-লাইব্রেরির স্বপ্নে বিভোর 

50

নজরুল ইসলাম তোফা, রাজশাহী, ৯ ডিসেম্বর : সময়ের সঙ্গে মানুষের পড়ার অভ্যাস কমছে, কথাটি কতটুকু সত্য তা নিয়ে তর্কের অবকাশ থাকতে পারে। তবে নিশ্চিত করেই বলা যায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের পড়ার অভ্যাসটি অনেকটাই বদলে গেছে। আগে যেখানে লাইব্রেরিতে গিয়ে কিংবা লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে এসে ঘরে আরাম করে পড়ার দৃশ্যদেখা দেখা যেত। সেখানে বই পড়তেই এখন মানুষের হাতে এসে পড়েছে ই-বুক রিডার, স্মার্টফোন কিংবা ট্যাবলেট পিসি। কম্পিউটার বা ল্যাপটপের পর্দাতেই এখন কেবল ছবি দেখা বা গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্যই নয়, বই পড়ার জন্য ও তাকিয়ে থাকেন অনেকেই।

ক্রমান্বয়ে মানুষের হাতে স্মার্টফোন আর দ্রুতগতির ইন্টারনেট ছড়িয়ে পড়ায় স্মার্টফোনেও বই পড়ার হার বেড়েছে । সব মিলিয়েই অনলাইনে বই খোঁজে নিজস্ব চাহিদা পূরণের লক্ষে অনেকেই সময় ব্যয় করে থাকেন। এর বাইরে ই-কমার্সের বদৌলতে অন্যান্য পন্যের মতো বইও কেনার সুযোগ রয়েছে অনলাইনে। ফলে যে যার ঘরে বসে পছন্দের বইটি কেনার সুযোগ ও পাচ্ছেন খুব সহজেই।

লাইব্রেরি কথাটির সাথে আমারা সকলেই কোন না কোনভাবে জড়িত রয়েছি। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল গণ্ডি পেরিয়েও রয়ে যায় লাইব্রেরির শখ। এই শখ থেকেই হয়তো লাইব্রেরিকে নিয়ে একটি  প্রবন্ধ লিখে ফেলেন প্রমথ চৌধুরী। ডিজিটাল বিশ্বের এই যুগে লাইব্রেরিকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌছে দিতে আরো সহজ করতে ই-লাইব্রেরির স্বপ্নে বিভোর একজন নাট্যপ্রেমী। যাকে একাধারে বলা যায় নাট্যপ্রেমী, গ্রন্থপ্রেমী মানুষ। তিনি নাটকের সমগ্র (নাট্যগ্রন্থ) পড়তে ভালোবাসেন। তাই দেশি বিদেশি লেখকদের লেখা নাটকের সমগ্র সংগ্রহ করেন। বর্তমানে তার সংগ্রহে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, উৎপল দত্ত, বাদল সরকার, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, বুদ্ধদেব বসু, শরবিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, অলোক রায়, শুম্ভ মিত্র, মনোজ মিত্র, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, নভেন্দু সেন, চন্দন সেন, লোকনাথ ভট্টাচার্য, ধনঞ্জয় বৈরাগী, ব্রাত্য রাইসু, সেলিম আল দীন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, মামুনুর রশীদ, হুমায়ূন আহমেদ, মান্নান হীরা, মমতাজউদ্দীন আহমদ, রামেন্দ্র মজুমদার, আলী যাকের, আহম্মেদ সফা, আবুল হোসেন, সিকান্দার আবু জাফর, প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক সহ দেশি বিদেশি খ্যাতিমান সব লেখকদের বাংলা ভাষায় লেখা নাটকের প্রায় সাড়ে তিন হাজার নাটক সমগ্র।

১৯৭৫ সালের ৫ জুলাই নওগাঁ জেলার কশব ইউনিয়নের মোঃ কমর উদ্দীন শাহানা এবং মোসাঃ মনোয়ারা বেগমের কোল জুড়ে আসেন নজরুল ইসলাম তোফা। ছয় ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় তোফা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা চলাকালীন থেকেই বই সংগ্রহের নেশা তার। তার সংগ্রহে রয়েছে তার প্রথম শ্রেণী থেকে শুরু করে শিক্ষাজীবনে কেনা সব বই-ই। তোফা গ্রামের স্কুলে পঞ্চম শ্রেণী আর চকউলী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে এস এস সি পাশ করেই এইচ এস সি সমমান হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বি এফ এ (প্রাক) কোর্সে চারুকলায় ভর্তি হন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে পড়াশোনা শেষ করে রাজশাহী চারুকলা মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি অভিনয় করেন। তারপর প্রচণ্ড স্বপ্নবাজ এ গ্রন্থ-প্রেমী নাট্যাঙ্গনে নাটক নির্মাণে মগ্ন হন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব নাট্যকার ও পরিচালক শিমুল সরকারকে সঙ্গে নিয়ে নাট্যদুয়ার নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। দীর্ঘ আন্দোলনের ফসল হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা বিভাগ খোলা হয়। তারপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারুকলার উপর বিএফএ এবং এমএফএ পাশ করেন।

তিনি বাস্তবে একজন নাট্যাভিনেতা হলেও তার বইয়ের প্রতি রয়েছে প্রচণ্ড আগ্রহ। তাই তিনি আস্তে আস্তে হয়ে উঠেন গ্রন্থপ্রেমীও। তবে তার নাটকের সমগ্র সংগ্রহের নেশা তৈরি হয় ১৯৯২ সালের দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা বিভাগে ভর্তি হবার পর।

নাটকের গ্রন্থ সংগ্রহের কথা বলতে গিয়ে নজরুল ইসলাম তোফা বলেন, ২০১০ সালে আমি যখন ধারাবাহিক নাটক ‘চোর কাব্য’তে কাজ করি তখন শ্যুটিং এর জন্য ঢাকায় ছিলাম। সেজন্য ‘টিভি নাটক সমগ্র’ গ্রন্থটি সংগ্রহ করার জন্য আমি নীলক্ষেতে যাই। সেখানে গিয়ে আমাকে অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হয়। রিকশায় লেগে আমার পরনে থাকা শার্ট ছিঁড়ে যায়। আমি ছিঁড়া শার্ট পরেই মার্কেটের ভিতরে ঘুরতে থাকি গ্রন্থটি কেনার জন্য।  মন কিছুটা খারাপ হলেও শার্ট কেনার জন্য কোন আগ্রহ ছিল না। কারণ তখন শার্টের চেয়ে গ্রন্থটি বেশি প্রয়োজন ছিল।

আবেগতাড়িত কন্ঠে তিনি আরো বলেন, আর একটা বিষয় হলো সেই সময় চাইলেই হয়তো শার্ট কিনতে পারতাম, তবে শার্ট কিনলে গ্রন্থটি কেনার টাকা হতো না। কারণ ঢাকা থেকে বাড়িতে ফেরার টাকা ব্যতিত পকেটে তখন ছিলো মাত্র পাঁচশো টাকার মত।

তিনি বলেন, বই সংগ্রহের বড় শক্তি ছিলেন আমার বাবা। গ্রন্থ সংগ্রহের ব্যাপারে আমার বাবা হঠাৎ একদিন বলে বসেন এতো বই সংগ্রহ করছো কি হবে?  উত্তরে আমি বলি, ‘বই আমার রক্তে, সংগ্রহ না পড়তে পারলে অসুস্থ হয়ে পড়ি। জীবনের অপূর্ণতাকে কাটিয়ে উঠার সহায়ক হচ্ছে আমার বই। তাছাড়া তুমি তো যখন থাকবে না, তখন আমার ছেলেকে বলবো, আমার বাবা আমাকে এই লাইব্রেরি করে দিয়েছে’। নজরুল ইসলাম তোফার বাবা সেই সময় কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, তোমার চিন্তা চেতনার জায়গায় বুঝি আমি! তারপর বাবা বই সংগ্রহ নিয়ে কোন কথা বলেননি।

গ্রন্থ সংগ্রহ করতে করতে বর্তমানে তার সংগ্রহে শুধুমাত্র নাটকের সমগ্র গ্রন্থ রয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার। তার সংগৃহীত বইয়ের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খ্যাতিমান লেখকদের বাংলা ভাষায় লেখা নাট্যসমগ্র ও বাংলা অনুবাদ নাট্যসমগ্র গ্রন্থ। সেই গ্রন্থগুলো দিয়ে নিজের বাড়িতে তৈরি করেছেন একটি সংগ্রহশালা। শুধু তাই না সেই গ্রন্থগুলোকে ক্রমিক নম্বরের আওতায় এনে একটি ডায়রিতে লিপিবন্ধ করে রেখেছেন।

কেন তিনি এতো নাট্যসমগ্র সংগ্রহ করেছেন ও এখনো সংগ্রহ করে যাচ্ছেন এবং সেগুলোকে সযত্মে সংরক্ষণ করেন জানতে চাইলে নজরুল ইসলাম তোফা বলেন, আমি ছোট বেলা থেকেই নাটক করি আর নাটকে অভিনয় করতে ভালোবাসি। স্কুলে পড়াকালে মঞ্চ নাটকের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় আমার নাটক বা অভিনয় করা। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর নাট্যগুরু পরিচালক শিমুল সরকারের সঙ্গে থিয়েটারে যুক্ত হই। এভাবে নাটক করতে করতে একসময় টিভি নাটকে কাজের সুযোগ পাই। কিন্তু সেখানে গিয়ে কাজ করার সময় নিজের ভিতরে কিছু অপূর্ণতা আছে বলে মনে হয় আমার। সেই অপূর্ণতাকে কাটিয়ে উঠতে আর নাটক ও অভিনয় সম্পর্কে আরো বেশি জ্ঞানার্জনের লক্ষে বিভিন্ন খ্যাতিমান নাট্যকার ও লেখকদের লেখা নাট্যগ্রন্থ সংগ্রহ করে পড়তে শুরু করি। এভাবেই আমার সংগ্রহে জমা হতে থাকে একের পর এক নাট্যগ্রন্থ।

এসব নাট্যগ্রন্থ নিয়ে ভবিষ্যতে কিছু করার কোন পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে তোফা বলেন, এসব কাগজের গ্রন্থ তো বেশিদিন অক্ষত অবস্থায় সংরক্ষণ করা সম্ভব না। সে জন্য এসব মূল্যবান গ্রন্থগুলোকে অক্ষত অবস্থায় সংরক্ষণ করার জন্য আমি এগুলোকে ই-বুকে রূপান্তরিত করে ই-লাইব্রেরি (অনালাইন আর্কাইভ) তৈরির পরিকল্পনা করছি। যাতে সযত্নে নিজের সংগ্রহে রাখার পাশাপাশি গ্রন্থগুলোর দ্বারা অন্যদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারি।

সংগ্রহের মধ্যে কার লেখা গ্রন্থ ভালো লাগে বললে তোফা বলেন, শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাটক সংগ্রহ গ্রন্থের ‘স্বর্গে কিছুক্ষণ’ নাটকের একটি সংলাপ, “শুনেছো ঠিকই শুনেছো। কেন সুনাম থাকবে না বলো? কতকাল ধরে কৃতিত্বের সঙ্গে এ কাজ করে আসছি” এ সংলাপটি আমার অনেক ভালো লাগে। তাই মাঝে মধ্যেই এ গ্রন্থটি পড়ে মজা পাই। যেখানে যে অবস্থায় থাকি, সংগ্রহের নেশা আর অভিনয় হৃদয়ে  সব সময় কলরব করে।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

পৃষ্ঠপোষকতা পেলে চামড়া শিল্পে শীর্ষ নেতৃত্ব দিতে পারে বাংলাদেশ 

111

মোস্তাফিজ আহমাদ, ১৬ নভেম্বর : স্বাধীনতার পূর্ব এবং স্বাধীনতার অব্যবহিতপর শুরুতে বাংলাদেশের এককভাবে রফতানী পণ্য ছিল পাট ও পাটজাত পণ্য। আজকের বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান বাহন ছিল এটি। সে কারণে তখন বাংলাদেশের পরিচিত সোনালি আঁশের দেশ হিসেবে।কিন্তু আজকের বাংলাদেশ বাইরে বিশ্বের অন্যতম কাঁচা চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানীকারক দেশ হিসেবে সুনাম অর্জন করেছে। কাঁচাচামড়ার পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য রফতানীতে জোর দেওয়া হচ্ছে গত কয়েক বছর ধরে। এ খাতে সম্ভাবনাও বাড়ছে। আশা করা হচ্ছে বাংলাদেশের চামড়ার মান ভালো হওয়ায় চামড়াজাত পণ্য রফতানী করে দ্রুত এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানীতে আয় হয়েছে ৩১ কোটি ৯০ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার বা প্রায় ২ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা, যা এই সময়ের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরের একই সময়ের রফতানী আয়ের তুলনায়ও ১৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে এ খাতে।
প্রক্রিয়াজাত চামড়ার চেয়ে চামড়াজাত পণ্যে রফতানী আয় তুলনামূলকভাবে বাড়ছেই। বিশেষ করে আমাদের দেশের জুতা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো বিখ্যাত সব ব্রান্ডের জুতা প্রস্তুতে সক্ষম। ফলে বর্তমানে বাংলাদেশের তৈরি চামড়াজাত পণ্য প্রধানত ফ্রান্স, পোলান্ড, নিউজিল্যান্ড, বেলজিয়াম, ইতালি, জার্মানি, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে রফতানী হচ্ছে। সস্তা শ্রম ও নিজস্ব চামড়ার কারণে দেশে তৈরি চামড়ার পণ্যও অল্প দিনেই বিদেশী ক্রেতাদের নজর কাড়ে। বাংলাদেশী চামড়াপণ্যের মধ্যে ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান আছে জুতা পণ্য। ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রের সেরা ব্র্যান্ডের জুতার শোরুমেও আছে বাংলাদেশের তৈরি জুতা। শুধু চামড়ারই নয়, রয়েছে সিনথেটিক জুতাও। দেশের কারখানাগুলোয় বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলোর জুতা তৈরি হওয়ায় প্রতিবছরই বাড়ছে রফতানী। রফতানীর শীর্ষ দশে আছে জুতা। বিশ্ব জুতাশিল্পে শিগগিরই নেতৃত্ব দেবে বাংলাদেশ।

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানী খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আগামী দুই বছরের মধ্যে ৫ হাজার কোটি টাকা রফতানীর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। চামড়া শিল্প শতভাগ দেশীয় কাঁচামালনির্ভর রফতানীমুখী শিল্পখাত। এ শিল্পের সঙ্গে ২২০টিরও বেশি ট্যানারি, সাড়ে ৩ হাজার ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং ১১০ বৃহৎ শিল্প জড়িত। এসব কারখানায় বছরে ২৫ কোটি বর্গফুটেরও বেশি চামড়া উৎপাদিত হয়। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ শিল্পখাতে প্রায় ৭০ লাখ দক্ষ ও অদক্ষ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এ শিল্পে শতকরা ৯০ ভাগ মূল্য সংযোজনের সুযোগ রয়েছে।
বিশ্বের দরজায় বাংলাদেশ চামড়া শিল্পে সুনাম অর্জন করতে পারলেও এই শিল্প এখনো নানা সমস্যায় জর্জরিত। যার কারনে এই শিল্পের সম্ভাবনা পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হতে পারছে না। বিভিন্ন সমস্যার কারণে রি-লোকেশন, অর্থসঙ্কট সবকিছু মিলে বৈশ্বিক-অর্থনৈতিক মন্দাসহ চামড়াশিল্পে একটা ধস নেমেছে। হ্যাজার্ডাস পরিবেশে চামড়া প্রস্তুত করা হচ্ছে। কাজেই কোনো ব্র্যান্ড বায়ার, বড় বায়ার তারা আমাদের এখানকার চামড়া দিয়ে তৈরি জুতা কিনতে রাজি নয়, চামড়াও কিনতে রাজি না। এছাড়া প্রতিবছর দেশ থেকে চামড়া পাচার হয়ে যাওয়ার কারণে কাচামাল সঙ্কটে বিপর্যয়ের শিকার হতে হচ্ছে চামড়া শিল্পে।

এছাড়া নানামুখী ষড়যন্ত্রে চামড়া শিল্প বিপর্যস্ত। গত কুরবানী ঈদেও কুরবানী চামড়া সংগ্রহ করা নিয়ে বহুমুখী জটিলতা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম কমে গেছে বলে অপপ্রচার, গত বছরের চামড়া বিক্রির টাকা এখনো না পাওয়া, মাঠ পর্যায়ে বেশি দামে চামড়া কেনা, চামড়া সংরক্ষণের জন্য লবণের দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাওয়া, ভারত থেকে নিম্নমানের লবণ আমদানি ইত্যাদি কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। চামড়ার আড়তদাররা ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ না পাওয়ায় তাদের চামড়া কিনতে ট্যানারি মালিকদের উপর নির্ভর করতে হয়েছে।

অন্যদিকে চামড়ার দাম প্রতি বছর কমানো হচ্ছে।     বারবারই দাম নির্ধারণের বিপক্ষে তাদের অবস্থান। তবে শেষ সময়ে এসে তাড়াহুড়ো করে তারা একটা দাম ধরে দেয়। প্রতিবছর কুরবানীর পশুর দাম বাড়লেও ট্যানারি মালিকরা সিন্ডিকেট করে বছরের পর বছর চামড়ার দাম কমিয়েই যাচ্ছে।

জানা যায়, ট্যানারির মালিকরা সিন্ডিকেট করে চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করায় প্রতি বছর চামড়া পাচার হয়ে যায়। এ সুযোগে সীমান্ত জেলাগুলোতে ভারতের চামড়া ব্যবসায়ীরা বিপুল অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করে। একথা এখন বলতেই হচ্ছে, দেশের প্রধান রফতানীশিল্প গার্মেন্টস খাতের মতোই চামড়া খাতটিকেও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দেয়ার চক্রান্ত শুরু হয়েছে। চামড়া শিল্পকে বাহানায় ধ্বংস করে দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তা না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার মূল্য স্থিতিশীল, সরকারি সহায়তাসহ সার্বিক পরিস্থিতি অনুকূল থাকা সত্ত্বেও ট্যানারি মালিক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানীকারকরা কেন খোঁড়া যুক্তি দেখিয়ে চামড়ার মূল্য কমায়?

বলার অপেক্ষা রাখে না, অনতিবিলম্বে সরকারের উচিত- চামড়া শিল্পে এসব অরাজকতা দূর করা। সরকার ২০২১ সালের মধ্যে চামড়াখাত থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা রফতানীর লক্ষ্য নিয়েছে। কিন্তু আমরা মনে করি, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানীতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অনেক। চামড়ার ক্ষেত্রে রফতানীর লক্ষ্যমাত্রা ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।

সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্প ও চামড়াজাত পণ্যের মানোন্নয়নে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি, প্রয়োজনে এ খাতের রফতানীর উপর প্রণোদনা প্রদান এবং বিনাসুদে ব্যাংকগুলোর তরফে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মতো সুযোগ সুবিধাকে আরো প্রসারিত করতে হবে।

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানী দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও বিগত অর্থবছরে নানা প্রতিকূলতার কারণে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। তবে চীনের বাণিজ্যিক নীতিতে পরিবর্তন আসায় তারা বিশ্ব বাজারে জুতার মতো প্রয়োজনীয় খাত ছেড়ে দিচ্ছে। এখন সে দেশের ছেড়ে দেওয়া জুতার বাজারের পুরো অংশই দখল করতে পারেন। মূলত, চামড়াজাত পণ্যের দিকে দৃষ্টি দিলে তা বাংলাদেশের জন্য হয়ে উঠতে পারে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি রফতানী পণ্য।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

আমার ভাবনায় বিএনপি : মাহমুদা হাবীবা 

4qxowow8

মাহমুদা হাবীবা : আমার বাল্যকালে বাংলাদেশের স্থিতি ও উন্নয়নের স্থপতি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অপ্রতিরোধ্যভাবে জায়গা করে নিয়েছিলেন  আমার মন ও মননে। তাই স্বাধীনতা উত্তর তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক ভাবনা থেকে আমি বিএনপিকে বেছে  নিয়েছি  আমার রাজনীতি চর্চার ক্ষেত্র হিসেবে।

একজন ব্যবসায়িক উদ্যোক্তা হিসেবে আমার মুগ্ধতা সীমা ছাড়ায়, যখন আমি দেখি যে,   অন্যান্য আরো অনেক সফল উদ্যোগের মত, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান উৎস- তৈরী পোষাক শিল্প এবং মধ্যপ্রাচ্যীয় রেমিটেন্স- এই দুইএর সূচনা ঘটেছিল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। ব্যক্তিখাতের উদ্যোগ এবং সরকারী নীতি ও পরিকল্পনার যে মেলবন্ধন তিনি করেছিলেন তা ছিল অভূতপূর্ব। এই কার্যকরী সমন্বয় সদ্য স্বাধীন দেশের ধ্বংসপ্রায়, ভাঙাচোরা অর্থনীতিকে একটি টেকসই ও শক্তিশালী ভিত্তিমূল প্রদান করে যার ফলশ্রুতিতে জিডিপির অর্জন সাতের ঘর স্পর্শ করেছে প্রায় অবধারিতভাবে। শুধু বিগত বছরগুলোতে নয় বরং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এই দুই খাত আরো বহুদিন রাজত্ব করবে দাপটের সাথে। আধুনিক বাংলাদেশের এই রূপকার, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাঁর স্বল্পকালীন শাসনামলে যে সর্বব্যাপী, সুদূরপ্রসারী ও গতিশীল কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করেছেন তাঁর নজির বাংলাদেশ তো বটেই, বিশ্বের অনেক দেশেও খুঁজে পাওয়া সহজ নয়।

সময়ের চাওয়া বড় কঠিন চাওয়া। তাই স্বাধীনতা অর্জনের প্রশ্নে যেমন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের কোন বিকল্প ছিলনা তেমনি স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত করে এদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে নিজস্ব পরিচয়ে সমুন্নত রাখার প্রশ্নে বিএনপির নেতৃত্বের কোন বিকল্প আজও নেই। দেশের মানুষের প্রাণস্পন্দন অনুভব করেছেন বলেই, কালজয়ী নেতা জিয়াউর রহমান যেমন স্বাধীনতা যুদ্ধ ঘোষনার সুমহান দায়িত্ব পালন করেছেন ঠিক তেমনি স্বাধীনতা পরবর্তী ক্রান্তিকালে দেশের মানুষের সুগভী্র নিরাপত্তাহীনতার বর্ম হয়ে রাজনীতির মাঠে আবির্ভুত হয়েছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ।

স্বতন্ত্র জাতিস্বত্বা কেড়ে এক ও অভিন্ন জাতির কথা বলে নয়, বরং প্রতিটি মানুষের নিজস্ব জাতিস্বত্বা, সংস্কৃতি ও ধর্মবিশ্বাস অটুট রাখার নিশ্চয়তা এই দলটি দিয়েছে। এই অতুলনীয় সার্বজনীনতা নিঃসন্দেহে বিএনপির ঈর্ষনীয় জনপ্রিয়তার আরেকটি প্রধান কারন।

বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের সেই চারা গাছটি, বিএনপির চেয়ারপার্সন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপোষহীন ও চমকপ্রদ নেতৃত্বে বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে।   স্বল্পতম সময়ে বিএনপি অভিষিক্ত হয়েছে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের মর্যাদায়।  বিএনপির চেয়ারপার্সন কেবল বাংলাদেশ নয়, সমগ্র বিশ্বের নারী ক্ষমতায়নের সেই রোল মডেলে পরিণত হয়েছেন, যিনি অন্তঃ পুর থেকে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশের তিন তিন বারের সফল প্রধান মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পেরিয়েছেন নানা অনতিক্রম্য বাধা। তৈরি করেছেন সাফল্যের অসংখ্য মাইলফলক। দেশের গ্ণডী পেরিয়ে  আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের  সম্মানে ভূষিত হয়েছে তাঁর নাম।

বিএনপির রাজনীতির আরেকটি বড় সুবিধা হলো এই যে, আগামীর নেতৃত্ব নিয়ে কোন দ্বিধায় এই দলের সমর্থকরা ভোগেন না। বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের মাঝে বেড়ে ওঠা তারেক রহমান, যিনি তৃণমূলের অলিতে গলিতে চষে বেড়ানো একজন বিশাল মাপের মানুষ এবং দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানও বটেন, তিনি আজ যেখানেই থাকুন না কেনো, দলের সাধারণ সমর্থকদের হৃদস্পন্দন তাঁর সাথেই স্পন্দিত হয়। অন্যরা যখন নিজ দলের মধ্যে তাদের আগামী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন তখন তারেক রহমান দাপটের সাথে বসবাস করছেন  ক্ষমতাসীনদের ভীতিপ্রদ দু:স্বপ্নে  এবং  নিজ দলের সমর্থকদের ভালোবাসায়।

বৃটিশ শাসকদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বিভাজন নীতি যাদের রাজনীতির মূলনীতি তাদের পক্ষে দেশ শাসন করা যতটা সহজ, দেশের মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়া ততটাই কঠিন। বিএনপি লালিত হয় এদেশের সাধারণ জনগনের নীরব ও অপরিমেয় সমর্থনে, যা বুঝে ওঠা যে কোন স্বৈরশাসক এবং তাঁদের তাঁবেদারদের জন্য কঠিন। দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতি এবং ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের মুখে সন্দেহাতীতভাবে বিএনপির এই সমর্থন  বেড়েছে বহুগুন। আগামীতেও এর অন্যথা হওয়ার সম্ভবনা নেই বললেই চলে। এই নিদারুন বাস্তবতা সকলের জন্য সুখকর নয়। তাই অতীত সাফল্যের রথে চড়ে যারা বর্তমান পাড়ি দিতে চেষ্টা করছেন তাদের জন্য দুঃখবোধ করি আমি। তাদের বন্ধ চোখে বিএনপিকে দেখার চেষ্টাটাও তাই সমবেদনা পাওয়ার যোগ্য।

মাহমুদা হাবীবা
সদস্য, জি নাইন
চেয়ারম্যান, এন্টারপ্রেনিয়ার্স ফোরাম

(এখানে প্রকাশিত সব মতামত লেখকের ব্যক্তিগত, নিউজ৬৯বিডি’র সম্পাদকীয় নীতির আওতাভুক্ত নয়)

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

ভবদহ জালাবদ্ধতা : স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার তাগিদ 

13012793_1686405498287160_6907890553503317124_n

ঢাকা, ১৭ অক্টোবর :  যশোরের ভবদহ’তে জলাবদ্ধতায় নিদারুন কষ্টে থাকা মানুষের দুর্ভোগের সমাধানে দ্রুত স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

জলাবদ্ধতার নেপথ্যে বেশ কয়েকটি কারন চিহ্নিত করে তারা বলছেন, এজন্য আশু নদীর পলি সরানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী।

“নদীতে পলি অপসারনে টিআরএম (টাইডার রিভার ম্যানেজমেন্ট) প্রয়োগ করতে হবে। তবে সঠিকভাবে টিআরএম বাস্তবায়ন করতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। কারন টিআরএম-এর সঠিক বাস্তবায়ন না হলে এটি মারাত্মক কুফলও আসতে পারে”, বলেন তারা।

সোমবার দুপুরে রাজধানীর দৈনিক বাংলায় রাইজিংবিডির কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব বিষয় উঠে আসে। ‘ভবদেহ জলাবদ্ধতা : সমাধান ও করনীয়’-শীর্ষক এই বৈঠকের আয়োজন করে জনপ্রিয় নিউজ পোর্টাল রাইজিংবিডি.কম।

যশোরের ভবদেহ এলাকার প্রায় ৬টি উপজেলা, ৪৩ টি ইউনিয়ন, ৪৯০টি গ্রাম, ৮০ হাজার হেক্টর জমি এবং প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ জলাবদ্ধতায় অমানবিক দুর্ভোগের শিকার। অবর্ননীয় এই দুর্ভোগ তাদের আর্থ সামাজিক ভিত্তি ভেঙে দিয়ে সর্বশান্ত করে তুলেছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় করনীয় নির্ধারনে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবি সমিতির নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ান হাসানের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক প্রভাব চন্দ্র মল্লিক,  দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অধিদপ্তরে পরিচালক মো. গিয়াস উদ্দিন, সেন্টার ফর ইনভায়রেনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিআইজিআইএস)-এর পরিচালক সুব্রত কুমার মন্ডল, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ণ বোর্ড এর অবসরপ্রাপ্ত চিফ ইঞ্জিনিয়ার শেখ নুরুল আলা, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বাসসে’র বিশেষ প্রতিনিধি এবং ঢাকাস্থ ভবদহ জলাবদ্ধতা নিরসন সমন্বয় কমিটি’র আহ্বায়ক মধুসূদন মন্ডল, ‘ভবদহ জলাবদ্ধতা ও উপকূলীয় পলি ব্যবস্থাপনা’ বিষয়ক গবেষক  মোহাম্মদ মাহির উদ্দিন, ‘ঢাকাস্থ ভবদহ জলাবদ্ধতা নিরসন সমন্বয় কমিটি’র সদস্য সচিব মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান মিলন,  ‘আমরা অভয়নগরবাসী’ সংগঠনের সংগঠক মো. ইমরান গাজী।

এতে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন রাইজিংবিডি.কমের সম্পাদক মো. নওশের আলী, সমাপনী বক্তব্য রাখেন রাইজিংবিডির প্রকাশক মো. জাহিদ হোসেন। উপস্থিত ছিলেন রাইজিংবিডি.কমের নির্বাহী সম্পাদক তাপস রায়।

বৈঠকের মুল প্রবন্ধ উপাস্থাপন করেন রাইজিংবিডির প্রধান প্রতিবেদক মো. হাসান মাহমুদ। অনুষ্ঠান উপাস্থাপন করেন রাইজিংবিডির সহকারী বার্তা সম্পাদক মো. রাসেল পারভেজ।

জলাবদ্ধতায় ভবদহ এলাকার মানুষ ‘ভয়ংকর দু:স্বপ্নের মতো’ দিন কাটাচ্ছে জানিয়ে সৈয়দা রিজওয়ান হাসান বলেন, ‘দিনের পর দিন. সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস- এই সমস্যা চলে; কিন্তু এই সংকটের কোনো সমাধান হয়না।’

তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে মানুষগুলোকে পানিমুক্ত একটি জীবন দেওয়ার দরকার। এজন্য দ্রুত সমাধানের জন্য কিছু কথা উচ্চারি হচ্ছে, এটি একমাস আগেও শুনেছি, পনেরদিন আগেও শুনেছি, আজও শুনলান। আগামী ১৯ অক্টোবর মন্ত্রী মহোদয় আমাদের মিটিংয়ে আসবেন সেখানেও শুনবো।’

ভবদেহ এলাকার সংশ্লিষ্ট নদী থেকে পলি নিস্কাশনের জন্য তিনটি স্কেবেটার যন্ত্র পেতে একমাস ধরে কথা বললেও এখন পর্যন্ত তা আসেনি উল্লেখ এই পরিবেশকর্মী বলেন, ‘বিকাউস দ্যাট ইজ ল্যাক অব সিরিয়াসনেস।’

তিনি বলেন, ‘সংকট নিরসনের ভুক্তভোগী এলাকা থেকে পানি বের করতে হবে, বিভিন্ন জায়গায় ফাঁকা করতে হবে, খাল কেটে সংস্কার করে এর প্রবাহ বাড়াতে হবে, একই সাথে ওই এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষনা করতে হবে। অথবা দুর্গত এলাকা ঘোষনার যে বিধান আছে তা তুলে দিতে হবে। শুধু শুধু এটাকে রেখে মানুষের উপহাস ও দুর্ভোগের মকারি করে কোনো কারন নেই।’

এসবের পাশপাশি যেসব জায়গায় বাঁধ আছে সেগুলো খুলে দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

‘দুর্ভোগের শিকার ভবদেহ এলাকার মানুষ মনে করে পানি উন্নয়ন বোর্ড জলাবদ্ধতার সমাধান করতে পারবেনা’ জানিয়ে রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘সেখানকার মানুষের অভিযোগ করেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবেনা। সেখানে তিনটি কথা বারবার উচ্চরিত হচ্ছে-ক্ষতিপূরন, অধিগ্রহন-লীজ আর বিরোধ। বিরোধী নিস্পত্তির একটি নিরপেক্ষ মেকানিজম থাকবে হবে। আপাতত সেটা ডিসির নেতেৃত্ব হবে পারে। সেখানে জনপ্রতিনিধিরা থাকতে পারে।’

সংকট সমাধানের বেশ কিছু পরামর্শ দিয়ে এই পরিবেশ কর্মী বলেন, ‘লং টার্ম (দীর্ঘ মেয়াদী) সমাধানের জন্য একটি কাউন্সিলের মতো হতে পারে কী না, সম্ভব কী না? যে কাউন্সিলে মানুষ যেতে পারবে।  কারন প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রনালয়ের একজন সচিব আজকে আছেন, আজকে এটার গুরুত্ব আছে, কালকে হয়তো তিনি থাকবেননা। ওই সময় এর গুরুত্ব নাও থাকতে পারে। সরকার বদলে যেতে পারে। লং টার্মের জন্য একজন কর্তৃপক্ষ ভাবতে পারি কী না, দীর্ঘ সময়ের জন্য এটাকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিশেষ মনোযোগ দিতে পারি কী না? ওই কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জনগণের মতামত নিয়ে নদী, পানি এবং পলি-এই তিনটির ব্যবস্থাপনায় মোটামুটি একটি টেকসই সমাধানের দিকে যেতে পারি কী না?’

তিনি বলেন, ‘স্থায়ী সমাধান হবে কী না আমি জানিনা। স্থায়ী সমাধান নাও হতে পারে। কারন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা বিবেচনা করে নতুন আরো কিছু করতে হতে পারে। সেক্ষেত্রে একটি টেকসই সমাধানের কথা আমরা ভাবতে পারি কী না। এগুলো ছিলো সেই সময়কার আলোচনা।

“এখন আমরা বুঝে গেছি যে, ভুক্তভোগী মানুষকে দেওয়ার জন্য ১২ লক্ষ টাকার মধ্যে ৪ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা রয়ে গেছে। যে পরিমান মানুষ আমরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে (প্রায় ১০ লক্ষ) তার পরিমান দিয়ে এই টাকাকে ভাগ করলে কত পড়ে। এটা অত্যন্ত অপ্রতুল। আর এই এলাকার মানুষ এখন ত্রান একেবারেই চায়না”, বলেন তিনি।

পাশ্ববর্তী দেশ ভারত উজানের এক তরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে ভাটির দেশ বাংলাদেশের মানুষকে কি পরিমান দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হচ্ছে সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা উচিত বলেও মনে করেন রিজওয়ানা।

“আমরা পদ্মা নিয়ে অনেক কথা বলেছি। কিন্তু এখানে (ভবদহ) আমরা সেভাবে ভাবছিনা। আমার মনে হয়, এখানে একটি আন্তর্জাকি ডাইমেনশন (মাত্রা) আছে। কারন কয় কেজি বস্তা গেলো, কতটুকু কৃষি ঋন গেলো-সেটা বিষয় নয়, বিষয় হচ্ছে উজানের পানি প্রত্যহারের ফলে ভাটিতে যে বিপর্যয় হচ্ছে তা আন্তর্জাতিক মহলে জানানো।”

শিগগিরই ভবদেহ নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সম্ভাব্য বৈঠকের বিষয়ের দিকে প্রসঙ্গে টেনে তিনি বলেন, ওই মিটিংয়ের আগে স্থানীয় জনগণের দাবি, সংকট ও সমাধানের পরামর্শের সম্বলিত বার্তা পয়েন্ট আকারে দিলে সেটি কার্যকর হবে।

বৈঠকে অংশ নিয়ে প্রভাষ চন্দ্র মল্লিক বলেন, জলাবদ্ধতার কারনে ভবদেহ অঞ্চলে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে।

তিনি বলেন, যশোর খাদ্যে উদ্বৃত্ত অঞ্চল। স্থানীয় খ্যাদ্য চাহিদা পুরন করে এখানকার ফসল দেশের বিভিন্নস্থানে যায়। অথচ জলাবদ্ধতার কারনে সেটি হচ্ছেনা। বাড়ি ঘরের পাশাপাশি ফসলী জমি, মাছের ঘের পানিতে ভেসে গেছে। আসছে বোরো মৌসুমেও পানি নিস্কাশন হবে কী না সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।

দ্রুত পানি নিস্কাশন করে ওই এলাকায় কৃষি পুনর্বাসন দরকার উল্লেখ করে প্রভাষ বলেন, বর্তমান সরকার কৃষি বান্ধব সরকার। ভুক্তভোগী এলাকার কি পরিমান শষ্য, মৎস ও প্রানী সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সেই তথ্য আসলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে কৃষি পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হবে।

তিনি বলেন, ‘যতই ঋনের ব্যবস্থা করা হোকনা কেন, আগে পানি সরানো দরকার। সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, স্থানীয় জনগণ মিলে এর সমাধান করতে হবে।’

ভবদেহ এলাকায় সরকারিভাবে ভুক্তভোগী মানুষকে আপদকালীন সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলে জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক মো. গিয়াস উদ্দিন।

তিনি জানান, তিনটি উপজেলার ৩১ টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার ১১৮টি আশ্রয়কেন্দ্র ৭ হাজার ৮৪০ পরিবারকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার ৪ লক্ষ ৭২ হাজার ২৪৪টি, ২ হাজার ৩৩৯ পরিবারের ২০ কেজি করে ভিজিএফ চাল দেওয়া হয়েছে। ৩০৪ মেট্রকটন জিআর চাল দেওয়া হয়েছে। ৪৯ টন মজুদ আছে। জিআর ক্যাশ বরাদ্দ ১১ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে দেয়া হয়েছে ৬ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা, মজুদ ৪ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা। এছাড়া বাড়িঘর পুননির্মানের জন্য ৪’শ বান ঢেউটিন এবং ১২ লক্ষ টাকা চাওয়া হয়েছে।

এসব পদক্ষেপকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সাময়িক ব্যবস্থা উল্লেখ করে গিয়াস উদ্দিন বলেন,  নদীগুলো থেকে পলি নিষ্কাশনের জন টিআরএম পানি উন্নয়ন বোর্ড করে থাকে। জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পরিকল্পনা কমিশনের কাছে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সরকারের কাছে দাবি পাঠাতে হবে। অবশ্যই সরকার এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।

তবে ভবদেহের জলাবদ্ধতা সিরসনে শুধু ওই এলাকার নয় পুরো দক্ষিনাঞ্চলের জন্য একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করেন সুুব্রত কুমার মন্ডল।

তিনি বলেন, এই দুর্ভোগ সমাধানে পুরো দক্ষিনাঞ্চল ধরে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। টিআরএমই সব সমস্যার সমাধান নয়। যদি প্রতিনিয়তই টিআরএম করা না হয় তাহলে এটিতে মারাত্মক কুফলও আসতে পারে। সেক্ষেত্রে ওই সব নদীতে এতো পরিমান পলি ধারন ক্ষমতা হতে পারে যে, হঠাৎ করে টিআরএম বন্ধ করে দিলে নদীটি পুরো ভরাট হয়ে যাবে। এক-দুই মাসের মধ্যে নদীগুলো ভরাট হয়ে যেতে পারে, যদি পলিগুলোকে ঠিকভাবে অপসারন করা না যায়।’

তিনি বলেন, ‘আশু যেটা সমাধান করা দরকার সেটি হচ্ছে, খালগুলোকে কিছুটা খনন করে মানুষের দু:খ দুর্দশার পরিত্রান করার ব্যবস্থা করা। দীর্ঘমেয়াদে কিভাবে সমাধান করা যায় তারও পদক্ষেপ নেওয়া।’

পানি উন্নয়ন বোর্ড টিআরএম করতে গিয়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি দাবি করে সুব্রত বলেন, ‘পানি উন্নয়ণ বোর্ড যদি সঠিকভাবে টিআরএমের গতি, প্রকৃতি ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পারতো, তাহলে এই অবস্থা কখনো হতোনা। সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন একটি মুল ব্যাপার। সেজন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে এগোতে হবে।’

জলাবদ্ধতার দুটি কারন তুলে ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রাক্তন কর্মকর্তা শেখ নুরুল আলা বলেন, জলবদ্ধাতার কারন নদী তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ার কারনে। বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ দিয়ে নদীর স্বাভাবিক জোয়ার আসার পথ বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু পলি আসা তো বন্ধ হয়নি। ফলে নদীতে জমেছে। দুই. ফারাক্কার বাধের কারনে নদী প্রকৃতিগত প্রবাহ হারিয়েছি। পানির চাপ নাই।

তিনি বলেন, ‘বড় বড় মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন পরের কথা, আশু কি করা যাবে সেটি নিয়ে ভাবতে হবে। এজন্য স্বল্প মেয়াদী পরিকল্পনার সঙ্গে মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে। আগে নদীর পথ খুলে দিতে হবে। পানি যাওয়ার রাস্তা না থাকলে পানি যাবে কিভাবে?’

জলবদ্ধতা নিরসনে সাংবাদিক মধুসূদন মন্ডল মনে করেন, এজন্য দক্ষিনাঞ্চলের জন্য একটি মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন, যাতে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও পরামর্শ থাকবে। এতে জনগণের সঠিক ও কার্যকর অংশগ্রহনও চান তিনি।

তিনি বলেন, অচিরেই এই ধরনের পরিকল্পনা না করলে কয়েকবছরের মধ্যে ভবদহ এলাকা থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট এলাকার বিশাল অংশ মাইগ্রেশন করে ভারতে অথবা দেশের অন্য জেলায় চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

সঠিক পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতায় পুরো দক্ষিনাঞ্চলে বিপর্যয় আসতে পারে বলে সংশয় প্রকাশ করেন নদী ও পলি নিয়ে প্রায় ৩০ বছর কাজ করা গবেষক মোহাম্মদ মাহির উদ্দীন।

তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা সমস্যা নয়, সমস্যাটি হচ্ছে পানি ব্যবস্থাপনা। এই বিষয়ে দৃষ্টি দিতে হবে। পানির প্রবাহ স্বাভাবিক করতে পারলে পলি সমস্যার সমাধান হবে। এক্ষেত্রে সমুদ্রের পানি এনে নদীগুলোর ন্যব্যতা সংকট মোকাবেলা করা যেতে পাওে বলে পরামর্শ দেন তিনি।

ভবদহ এলাকার জলাবদ্ধতা নিয়ে কাজ করা জাহিদুর রহমান মিলন ও মো. ইমরান গাজী বলেন, সেখানকার মানুষ এখন ত্রান নয় জলাবদ্ধতা থেকে পরিত্রন চায়। মানবিক বিষয় বিবেচনা করে দ্রুত ওই এলাকার মানুষের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

সন্তানের হাতে ভালবাসা ও মমতার খুন 

Azan-Top20160917153408

সাহাদাত সাঈদ, ১১ অক্টোবর : আমরা মানব জাতি দিন দিন উন্নতির শিখরে পৌছে যাচ্ছি। একদিন মানুষ রান্না করে খেতে জানতো না, পোষাক পরতে জানতো না। সব কিছুর পরিবর্তন হয়েছে আজ।

এমন কি মাইলের পর মাইল পায়ে হেটে বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত করতো মানুষ। এমনকি হজ্ব করতে যেত পায়ে হেটে। এখন তা শুধু গল্প। আমাদের কাছে আমাদের দাদা-দাদী,নানা-নানীরা এসব কথা বলতো তখন আমাদেরই গল্প মনে হত। এখনকার এই প্রযুক্তির যুগে এটা অবিশ্বাস্য ব্যপার।

দিনকে দিন সব কিছুর উন্নতি হলেও এখন পর্যন্ত আমাদের মানবতার উন্নতি সাধিত হয়নি। প্রযুক্তির এই সময় দাঁড়িয়ে যখন আমরা পৃথিবীকে ছোট একটি গ্রাম মনে করছি, ঠিক তখনই আমাদের সমাজের কিছু অসভ্য, কুলাঙ্গার এমন মানবতা বিরোধী কর্মকান্ড করে যা মুর্খতার যুগকেও হার মানায়।

যে বাবা-মা শত কষ্ট করে সন্তানকে বড় করে তোলে। সে সন্তান সেই মা-বাবাকে সামন্য মটর সাইলের জন্য পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করছে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ইং বৃহস্পতিবার ফরিদপুরে নতুন মডেলের মোটর সাইকেল কিনে না দেওয়ায় ফারদিন হুদা মুগ্ধ (১৭) নামের এক যুবক তার মা  সিলভিয়া হুদা (৪০) এবং বাবা এটিএম রফিকুল হুদা (৪৮) কে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করে। কয়েকদিন পরে  ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ইং তারিখে এটিএম রফিকুল হুদা মারা যান।

চট্টগ্রাম মহানগরীর গোসাইলডাঙ্গা এলাকায়  (১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ইং) সুমিত চৌধুরী নামের এক তরুণ তার মা কুমকুম চৌধুরী (৪৫) দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যার চেষ্টা করছিল।

এর আগে ২০১৩ সালের ১৪ই অগাস্ট রাতে ঢাকার চামেলীবাগের নিজ বাসায় নিজের কন্যা ঐশী রহমানের হাতে খুন হন পুলিশ কর্মকর্তা (পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ) মাহফুজুর রহমান এবং তাঁর স্ত্রী স্বপ্না রহমান। (সূত্র: বিভিন্ন গণমাধ্যম)

মানবতার এ যে কত বড় ষ্খলন হয়েছে তা ভাষায় ব্যক্ত করা অসম্ভব। শিক্ষার এই অগ্রতির রুটে দাঁড়িয়ে মানবতার যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক কু-লক্ষণ।

সমাজের কিছু বাব-মা আছে তারা সামাজিক স্ট্যাটাস বজায় রাখতে গিয়ে সন্তানকে যেমন খুশি চালাচ্ছেন সমাজের সাথে তাল-মিলিয়ে। যখন যা চাচ্ছে তা দিচ্ছে। এর পর মাত্রা এমন পর্যায় পৌছায় যখন সন্তান তার পিতা-মাতা আঘাত করতে দ্বিধা করে না।

আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এমন এক অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে,যেখানে বড় ছোট কোন সম্মান নেই। আগে আমরা যেভাবে বড়দের সম্মান করতাম এখন আর সেগুলো সমাজ থেকে বিদায় দিতে বসেছে। আমরা বড় ভাইদের মুখের উপর কোন কথা বলতাম না, কিন্তু এখনকার ছোট ভাইরা ঠাস ঠাস করে মুখের উপর কথা বলে।

ছোট বেলায় সন্তানকে সু-শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। বড়দের প্রতি সম্মান বোধ শিক্ষা দিতে হবে। বড়দের সালাম দেয়া,তাদের সামনে বিনয়ী হওয়া,কল্যাণ ও ভাল কাজের প্রতিযোগিতা করা। এসকল ছোট বেলায় বাবা-মা আমাদের শিখিয়েছে।

ছোট বেলায় বাবার সাথে বাজারে গেলেও কোন খাবার বা কিছু কিনে দেয়া আবদার করেনি। এছাড়া কখনো বলিনি আমাকে একটা ভাল জামা প্যান্ট কিনে দিতে হবে। আজও বাবার কাছে টাকা চাই লজ্জা লাগে।

সমাজ ও মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, নৈতিক অবক্ষয় ও মানসিক বিষন্নতা দূর করা না গেলে এবং পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় না হলে বাড়তেই থাকবে এ ধরনের খুন।

সমাজবিজ্ঞানী ড. গাজী সালাহ উদ্দিন বলেন,‘অতিমাত্রায় আধুনিকতার প্রতি আগ্রহী হওয়ায় মানুষের মধ্যে সামাজিক এবং পারিবারিক আদর্শ লোপ পাচ্ছে। ভেঙে যাচ্ছে পারিবারিক বন্ধন। ফলে পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা কমছে। আদর্শহীন ও রংচঙে আবহের কারণে ঘটছে নৈতিক অবক্ষয়। এতে করে পিতা-মাতাকে খুন করতে দ্বিধা করছে না সন্তানরা। এ অবস্থা থেকে বের হতে হলে মেনে চলতে হবে সামাজিক অনুশাসন এবং সুদৃঢ় করতে হবে পারিবারিক বন্ধন।’

অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক এবং বিকৃত মানসিকতার জন্য সন্তানের হাতে পিতা-মাতা খুনের মতো ঘটনা ঘটছে বলে মনে করেন মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আফজাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘নৈতিকতার চরম বিপর্যয়ের ফলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বাড়ছে দূরত্ব। এতে করে তুচ্ছ ঘটনার কারণে প্রিয়জনকে খুন করতে দ্বিধা করছে না।’ (সূত্র: বাংলাদেশ প্রিতিদন ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬)

আমরা আজ শিক্ষা-দিক্ষা, তথ্য-প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়েছি এর পাশা-পাশি আমাদের নম্রতা ভদ্রতা ও মানবতায় এগুতে হবে। তাহলে আমরা হব সুখি, সমাজ হবে সুন্দর, পরিবার পাবে একটা সুখি, সুন্দর, নির্মল, পরিচ্ছন্ন পরিবার।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

কিশোরীদের জন্য বিনিয়োগ বৃথা যাবে না 

কিশোরীদের জন্য বিনিয়োগ বৃথা যাবে না

রোকেয়া রহমান, ১৬ সেপ্টেম্বর : ‘কিশোরীদের জন্য বিনিয়োগ, আগামী প্রজন্মের সুরক্ষা’। এটা ছিল চলতি বছরের বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের প্রতিপাদ্য। গত ১১ জুলাই বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়েছে। বাংলাদেশেও দিবসটি উপলক্ষে সরকারি–বেসরকারি নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছিল। এসব কর্মসূচির মধ্যে ছিল সভা ও সেমিনার। এসব সভা ও সেমিনারে কিশোরীদের উন্নয়নের জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়। তাদের জন্য বিনিয়োগ করার কথা বলা হয়। বলা হয়, কিশোর-কিশোরীদের পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা নিশ্চিতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে হবে এবং এই বিনিয়োগের সুফল যেন তারা পায়, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে।

সভা-সেমিনারে বলা এসব কথার কোনোটিই বাগাড়ম্বর নয়। প্রতিটি কথা একেবারে সত্য। কিন্তু আমাদের দেশের কিশোরীদের প্রকৃত অবস্থা কী?

দেশের অনেক মেয়েরই কৈশোর বয়সে না পৌঁছাতেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, তারা খুব অল্প বয়সে মা হচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে এক-তৃতীয়াংশ কন্যাশিশুর ১৫ বছরের আগে এবং দুই-তৃতীয়াংশ কন্যাশিশুর ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হয়। গ্রামে এ হার ৭১ শতাংশ এবং শহরে ৫৪ শতাংশ। ২০১৪ সালে এ গবেষণা করা হয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ বলছে, কিশোরীদের ৪৯ শতাংশের বিয়ে হয় ১৮ বছরের আগে। অল্প বয়সে বিয়ের ফলে একটি কিশোরী অল্প বয়সে মা হচ্ছে। অথচ তার শরীর কোনোভাবেই গর্ভধারণ বা মা হওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। আগামী প্রজন্মের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা এবং সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে বাল্যবিবাহ একটি বড় বাধা। একটি কিশোরী যখন সন্তানের মা হয়, তখন সে মারাত্মক অসুবিধায় পড়ে। সে যেখানে নিজেকে সামলাতে পারে না, সেখানে কী করে একটি শিশুকে সে লালন পালন করবে। এর কিছুই তো সে জানে না। ফলে শিশুটিও নানা অসুবিধায় ভোগে। সে ঠিকভাবে বেড়ে ওঠে না। নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, অপুষ্টিতে ভোগে।

বাল্যবিবাহের কারণে কিশোরীরা পড়ালেখা থেকে ঝরে পড়ে। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০১৪ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষায় মেয়েদের অন্তর্ভুক্তি প্রায় শতভাগ এবং মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণও আশাব্যঞ্জক, প্রায় ৬৯ শতাংশ। তবে ঝরে পড়ার হার এখনো অনেক বেশি, ৪৭ শতাংশ। এতে স্পষ্ট হয় যে অধিকাংশ মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারছে না। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষায় ঝরে পড়ার উচ্চ হারের নেপথ্যে একটি বড় কারণ হচ্ছে বাল্যবিবাহ।

এ তো গেল কিশোরীদের অল্প বয়সের বিয়ের কথা। এ ছাড়া তারা নানা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তাদের উত্ত্যক্ত করা হচ্ছে, যৌন নিপীড়ন করা হচ্ছে, ধর্ষণ করা হচ্ছে; এমনকি খুনও করা হচ্ছে।

এই তো সেদিনের কথা, বখাটের ছুরিকাঘাতে খুন হলো রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিসা। তারও আগে থেকে ওই বখাটে রিসাকে মোবাইল ফোনে উত্ত৵ক্ত করে আসছিল। রিসার মতো আরেক কিশোরী কণিকা ঘোষ একইভাবে বখাটের ধারালো অস্ত্রের কোপে প্রাণ হারায়। গত মে মাসে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে এ ঘটনা ঘটে। এ রকম আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে।

কিশোরীরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয় পরিবারে। জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) বলেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় কিশোরী নির্যাতনের হার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। এখানে প্রায় প্রতি দুজনের একজন (৪৭ শতাংশ) বিবাহিত কিশোরী (১৫ থেকে ১৯ বছর) স্বামী বা সঙ্গীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয়; বিশেষ করে মামা, চাচা কিংবা ভাইয়ের হাতে নির্যাতন, এমনকি যৌন নিপীড়নেরও শিকার হচ্ছে কিশোরীরা। এ ঘটনাগুলোয় আইনের আশ্রয় নেওয়া হয় না বলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব নিপীড়নের ঘটনা প্রকাশ পায় না।

পাঠক বলুন, কিশোরীদের এই পরিস্থিতিকে আপনি কী বলে অভিহিত করবেন? এরপরও বলবেন, তারা ভালো আছে?
তাহলে করণীয় কী? আজকের কিশোরীরাই আগামী দিনের মা। তারাই মা হিসেবে জন্ম দেবে ভবিষ্যতের কান্ডারিদের। তাই পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিশোরীদের উন্নয়ন না হলে দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করা যাবে না। তাই জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে আজকের কিশোরীদের জন্য আমাদের বিনিয়োগ করা প্রয়োজন।

কিশোরীদের উন্নয়নে সরকারের অনেক কর্মসূচি চালু আছে। বেসরকারি সংস্থাগুলোও প্রজননস্বাস্থ্যের উন্নতিসহ কিশোরীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রের উন্নয়নের জন্য কাজ করছে। কিন্তু দেশের সব কিশোরী এসব কর্মসূচির আওতায় নেই। সে জন্য সরকারকে আরও ব্যাপকভিত্তিক কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। আরও অনেক বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। তবে কিশোরীদের জন্য বিনিয়োগের প্রথম দায়িত্বটি পরিবারকে নিতে হবে। দেশের প্রতিটি পরিবারকে তার কিশোরী সদস্যের প্রতি বেশি খেয়াল রাখতে হবে।

তার শিক্ষার ব্যবস্থা প্রথমে পরিবারই করবে। তার যাতে বাল্যবিবাহ না হয়, সেটা নিশ্চিত করবে পরিবার। তার সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হবে। তার নিরাপত্তার দিকটিও পরিবারকে দেখতে হবে। নিজ ঘরেই তারা যাতে কোনো ধরনের নির্যাতনের বা যৌন হয়রানির শিকার না হয়, সে জন্য পরিবারকে সচেতন হতে হবে।

বাংলাদেশ সরকার ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে চায়। মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ও সুস্থ শ্রমশক্তি, যেখানে নারী ও পুরুষ উভয়েই থাকবে। তাই এ দেশের মেয়েদের অবশ্যই সংশ্লিষ্ট শিক্ষা
ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে। কিশোরীদের উন্নয়ন ছাড়া দেশ কখনো প্রকৃত মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে পারবে?

কাজেই আসুন, কিশোরীদের উন্নয়নে আমরা তাদের জন্য আরও অনেক বেশি বিনিয়োগ করি। এই বিনিয়োগ বৃথা যাবে না, এটা নিশ্চিত।
রোকেয়া রহমান: সাংবাদিক।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

বিএনপির বর্ষপূর্তি বয়ে আনুক তরুন নেতৃত্বের সাফল্য : রাকেশ রহমান 

বিএনপির বর্ষপূর্তি বয়ে আনুক তরুন নেতৃত্বের সাফল্য : রাকেশ রহমান

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বয়ে আনুক সকল নেতৃত্বে নতুন ভাবে জেগে উঠার আবেগ।একে অপরের প্রতি ও দেশবাসীর প্রতি জেগে উঠুক ভালোবাসা।সকল পিছু টান ফেলে তারা জেগে উঠুক নতুন দিনের সূর্য জয়ে জন্য সেই কামনাই করছি।পাশাপাশি আশাকরছি তরুন নেতৃত্বের সাফল্য।

আজ অসহায় বাংলাদেশের কোটি কোটি জনতা। গভীর অন্ধকারে তলিয়ে গেছে বাংলাদেশের জনগণ। মানুষ বেঁচে থাকার জন্য কী চায়? চায় দু’বেলা দু’মুঠো পেট ভরে খেতে, স্বস্তিতে দম ফেলে একটু ঘুরে বেড়াতে, চায় জীবনের নিরাপত্তা, চায় স্বাধীনতা।

বাংলাদেশের মানুষের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। কী করবে, কীভাবে চলবে বহুমুখী সমস্যা। দেশ কে চালাচ্ছে বা চালাবে তা অধিকাংশই জনগণ দেখতে বা জানতে চায় না। চায় সে নিজে কী খাবে, কীভাবে জোগান দিবে তার জীবিকা, এটাই বড় কথা। কিন্তু এই অবৈধ সরকার কি দিচ্ছে দেশের জনগণকে? শুধু হাহাকার ও হতাশা ছাড়া কিছু কি দিতে পেরেছে?

আজ জিনিসপত্রসহ সব পণ্যের দাম ঊর্ধ্বগতি, সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে। কর্মসংস্থান ও বেতন স্কেলের মান নিম্নগামী, চরম চাঁদাবাজি, গুম, খুন, দলীয় নেতাদের উত্পাতে মুখ খোলার কোনো উপায় নেই। সরকার দলীয় নেতারা আঙুল ফুলে হচ্ছে কলাগাছ।অবাধে চলছে তাদের চাঁদাবাজি। এলাকার তরুণীদের আজ ভয়াবহ সমস্যা। বাড়ির বাইরে গেলেই সরকারি দলের বখাটে লীগ নেতাকর্মীদের কাছে হচ্ছে প্রথমে লাঞ্ছিত, তারপর হচ্ছে ধর্ষিত, অবশেষে খুন। এটা কোন বর্বর মধ্যযুগে এসে দাঁড়িয়েছি আমরা?

মুখ বুজে সহ্য করে আত্মাহুতি দিচ্ছে জীবন ,জেনে-শুনেও ফরমালিনযুক্ত খাবার খাচ্ছে।আবার কোনো কথা বলবে বা প্রতিবাদ করবে তাতে তো মহাবিপদ। প্রশাসনকে দিয়েছে উদার ক্ষমতা। যখন তখন গুলি করে মেরে ফেলে দিচ্ছে এবং এছাড়াও প্রশাসনের সামনে পা কেটে দ্বিখণ্ড করে ফেলে দিচ্ছে সরকারি দলের সোনার ছেলেরা। এটা কী ধরনের ব্যবহার, এদেরকে সভ্য মানবজাতি না অসভ্য নরপিশাচ বলে তা নিয়ে আর কোনো সংশয় নেই। জাতি আজ পরিষ্কার বুঝে গিয়েছে কার চরিত্র কেমন।

গোটা দেশ আজ তাকিয়ে রয়েছে সেই দিনের অপেক্ষায়, যেই দিন চূর্ণবিচূর্ণ হবে এই অহঙ্কারি, একমুখা, জালিম, অবৈধ সরকার।
কিন্তু আজ প্রশ্ন, কে করবে উচ্ছেদ এই জালিমদের, কার নেতৃত্বে দেশ ও জাতি হবে আবারও স্বাধীন।

এতে নিশ্চিতভাবে নাম চলে আসছে ও দেশে,বিদেশে যার নাম উচ্চারিত হচ্ছে সে আর কেউ নয়, বাংলাদেশের জনগণের ৯৫ ভাগ সম্মতি পাওয়া নেত্রী আপসহীন নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

আমি লেখক রাকেশ রহমান। আমার জন্মস্থান ঢাকাসহ পুরো বাংলাদেশে অবৈধ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সত্যের শক্তির পক্ষ থেকে জনে জনে কথা ও প্রতিনিধির মাধ্যমে সাধারণ ও ত্যাগী তৃণমূলদের সঙ্গে যোগাযোগ করে যে জরিপ পেয়েছি তা থেকে বলতে পারে যে বাংলাদেশের জনগণ গভীর আগ্রহে আছে শুধু একটা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচনের অপেক্ষায়, ব্যস, জনগণ তাদের ক্ষোভ, দুঃখ, কষ্টের বহিঃপ্রকাশ ব্যালোটের মাধ্যমে দিবে।

৯৫ ভাগ মানুষের সাড়া পাওয়া জননেত্রী বেগম খালেদা জিয়াই এখন বাংলাদেশের জনগণের শেষ ভরসা। শুধু একটা জোরালো আন্দোলন দরকার দেশে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে।

কিন্তু তা কি করে সম্ভব? দলের ভিতরে রয়েছে শত্রুপক্ষের লোক। যারা প্রতিনিয়ত তথ্য পাচার থেকে শুরু করে ত্যাগী নেতাদের তালিকাও দিচ্ছে শত্রুপক্ষকে যাতে আন্দোলন জোরালো না হয় এবং তাদের হাতে আজ দেশনেত্রী বন্দী । দেশনেত্রীকেও এইসব সুবিধাবাদী নেতারা হুমকি দিয়েছে তার জাতীয়তাবাদী দল নিয়ে।

আজ বেগম খালেদা জিয়ার কাছে কোনো তহবিল নেই যে ত্যাগী নেতাকর্মীদের সাহায্য করবে। আর যারা বিগত সময়ে প্রচুর পরিমাণে কামিয়েছে তাদের কোনো ইচ্ছাই নেই দলের হয়ে খরচ করার, যে যার স্থানে বসে আছে।

হলুদ মিডিয়াগুলো কেনই-বা সরকার পক্ষের খবর দিবে না। একে তো জীবনের ভয় তার ওপর তারা আর্থিক সহযোগিতাও পাচ্ছে। আর অপরদিকে বন্ধ হওয়া ইসলামিক টিভি, দিগন্ত টিভি ও আমার দেশ সহ ৩৫ টি অনলাইন পত্রিকার নিষ্ঠাবান সাহসী সাংবাদিক ভাইবোনেরা কীভাবে আছে, কীভাবে দীর্ঘদিন বেতন ছাড়া তাদের জীবন চলছে পরিবার-পরিজন নিয়ে, তাদের ছেলেমেয়েদের আজ লেখাপড়া বন্ধ, সামনে ঈদ, নতুন জামা-কাপড় তো দূরের কথা তাদের মুখে একমুঠো অন্ন তুলে দেয়ারও নেই কোনো সামর্থ্য—তা কি জাতীয়তাবাদী কোনো নেতা খবর রেখেছেন? রাখেননি আর সাহায্য করা তো দূরের কথা। তাহলে মিডিয়াগুলো হলুদ থেকে সবুজ হবে কীভাবে।

আমি নিজে এসব কথা বলার সাহস পাই একটি কারণে, সেটি হচ্ছে জীবনের হুমকি নিয়ে আমি ও আমাদের পরিবার ২০০০ সালের জুন মাস থেকে শুরু করে ২০০১-এর জুন জুলাই মাস পর্যন্ত পুরো একটা বছর বাংলাদেশের ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব করে, প্রতিবাদ করে, নিষিদ্ধ বই প্রচার করে দুর্বিষহ জীবনযাপন করেছিলাম। ওই সময়ের প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি দিন এক একটি প্রতিবাদের ইতিহাস যা সারাজীবন আমাকে প্রতিবাদ করার অনুপ্রেরণা দিবে।

কিন্তু ২০০১-এ বিএনপি ক্ষমতায় এলে ১ পয়সাও দুর্নীতি করিনি যদিও যথেষ্ট সুযোগ আমার ছিল। এখনও জাতীয়তাবাদী ও দেশের জনগণের জন্য প্রতিবাদ করে যাচ্ছি ও যাব ইনশাআল্লাহ।

দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে একটা অনুরোধ জানিয়ে আজকের লেখা শেষ করব।

বাংলাদেশের মাদার অব ডেমোক্রেসি বেগম খালেদা জিয়া,
আজ ঢাকা শহরে একটা আন্দোলন খুব বেশি প্রয়োজন,যদিও আপনি ব্যাকুল চেষ্টা করে যাচ্ছেন তবুও বলতে হয় বাংলাদেশের সব বিভাগ বাদ দিয়ে, সব সিনিয়র নেতা বাদ দিয়ে আপনি একক আলোচনায় বসেন ঢাকা মহানগরের সব ওয়ার্ড সভাপতিসহ ওয়ার্ডের নেতাকর্মীদের সঙ্গে এবং তাদের হাতেই ঢাকা মহানগরের আন্দোলন জমানোর দায়িত্ব দিয়ে দেন। এছাড়াও তাদের কাজে কেউ বাধা দিলে তারা সরাসরি কোনো মাধ্যম ছাড়াই যাতে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে সেই ব্যবস্থাও করে দেন।
আশা করা যায়, ১ মাসের মধ্যেই ঢাকা মহানগরের আন্দোলন জমে উঠবে ইনশাল্লাহ।

-রাকেশ রহমান, প্রেসিডিয়াম সদস্য ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক  পার্টি

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

অপরাজেয় বাংলা : ওয়াসিম ইফতেখার 

uguh8veu

১৯৭৩-১৯৭৯ এই সময়ে তিনটি প্রান প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসের, প্রতিরোধ , ত্যাগ, অর্জন ও প্রান গৌরবের প্রতীক হিসাবে। একজনের কাঁধে রাইফেল, দৃঢ় প্রত্যয়ে বেল্টটি ধরা, লম্বা এই তরুণের পরনে কাছা দেয়া লুঙ্গি আর ডান হাতের মুঠোয় একটি গ্রেনেড। এর চোখে মুখে স্বধীনতার আকাঙ্ক্ষা দিপ্তমান।

থ্রি নট থ্রি রাইফেল দু হাতে কোনাকুনি ভাবে ধরা আরেক যুবক, ঈষৎ ঘাড় কাত করে রাখা এই যোদ্ধাটি যেন আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান। এই শহুরে যোদ্ধাটির পরনে বেলবটম ডেনিম যেন নাগরিক প্রতিমূর্তি।

রেডক্রসের ফাস্ট এইড বক্স হাতে , পরিপাটি কুঁচি দিয়ে শাড়ি পরা মেয়েটি হাজির হয়েছিল শাস্বত বাংলার মমতাময়ী অথছ দৃঢ়চেতা একজন নারী রূপে।

সাংবাদিক সালেহ চৌধুরী এই তিনজনকে নিয়ে পত্রিকাতে একটি প্রবন্ধ লেখেন যার শিরনাম ছিল “অপরাজেয় বাংলা”

সেই থেকেই মানুষের মুখে মুখে, তিন জনের ভাস্কর্যটির নাম হয়ে যায় “অপরাজেয় বাংলা”। উল্লেখ্য ভাস্কর্যটির বেদী বা কোথাও অপরাজেয় বাংলা নামটি লিপিবদ্ধ করা নেই। ৬ ফুট বেদীর উপর নির্মিত ভাস্কর্যটির উচ্চতা ১২ ফুট, প্রস্থ ৮ ফুট ও ব্যাস ৬ ফুট।

১৯৭২-৭৩ সালে ডাকসুর ভিপি মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং জিএস ছিলেন মাহবুব জামান, ম. হামিদ তখন ডাকসুর সাংস্কৃতিক সম্পাদক তাঁরাই প্রথম ডাকসুর উদ্যোগে অপরাজেয় বাংলার কাজ শুরু করার উদ্যোগ নেন।

অনেক খোঁজাখুঁজি করে ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লা খালিদকে দায়িত্ব দেওয়া হয় অপারজেয় বাংলা নির্মানের জন্য। ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ প্রায় তিন মাস সময় নিয়ে চার ফুট সাইজের একটি রেপ্লিকা তৈরি করেন। আর ভাস্কর্যটির বেদী তৈরির কারিগর ছিলেন রবিউল ইসলাম নামের একজন প্রকৌশলী।

১৯৭৩ সালে কাজ শুরু হলেও খুব একটা মসৃণ ছিলনা অপারজেয় বাংলার নির্মানকাল। ১৯৭৫ সালে শেখ সাহেবের মৃত্যুর পর প্রথম, কাজ বন্ধ হয়ে যায়, ১৯৭৭ সালে ভাস্কর্যটি একবার প্রায় ধ্বংসের মুখোমুখি হয়।

সেই সময় জিরো পয়েন্ট ছিল ঢাকার কেন্দ্রস্থল। ঢাকা জিপিওকে ভিত্তি ধরে প্রাচীন ডাক ব্যাবস্থার প্রতীক হিসাবে বর্শা নিক্ষেপরত রানার বা ডাক বাহকের ভাস্কর্য স্থাপনকে কেন্দ্র করে জাতিয় মসজিদ বাইতুল মোকাররম কেন্দ্রিক মৌলভীদের সাথে অনাকাঙ্ক্ষিত দন্দ শুরু হয় , যেহেতু জিরো পয়েন্ট বরাবর বায়তুল মোকাররম মসজিদটিও অবস্থিত।

তবে জিরো পয়েন্টের বর্শা নিক্ষেপকারী স্থাপনা নির্মানের ধর্মীয় অনুভুতিকে কাজে লাগিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মানাধীন “অপরাজেয় বাংলা” স্থাপনা বাতিল করার অপতৎপরতা শুরু করে কিছু ধর্মান্ধ অমুক্তিযোদ্ধা গোষ্ঠী। এই গোষ্ঠী ‘অপরাজেয় বাংলা’ ভাস্কর্য নির্মূলের সমর্থনে স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান শুরু করলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতে উত্তম মধ্যমের স্বীকার হয় এবং তাঁদের মুখে আক্ষরিক অর্থে চুনকালি লেপে দেওয়া হয়। ফলশ্রুতিতে ভাষ্কর্য নির্মানের নিরাপত্যা পরিস্থিতি চরম ঘোলাটে হয়ে আসে।

সেই সময় সেক্টর কমান্ডার ও মুক্তিযোদ্ধা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হস্তক্ষেপে পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে ১৯৭৫ সালে বন্ধ হয়ে যাবার পর পর্যাপ্ত নিরাপত্যার মাধ্যমে আবার অপারাজেয় বাংলার কাজ শুরু করা হয়। ১৯৭৯ সালে ভাস্কর্য “অপরাজেয় বাংলা” নির্মান শেষ হয় এবং একদল যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ৭৯র ১৬ ডিসেম্বর ভাস্কর্যটি উন্মুক্ত করেন।

কালক্রমে “অপরাজেয় বাংলা” বাংলাদেশে মানুষের কাছে স্বাধীনতা , সার্বভৌমত্ব, গনতন্ত্র, প্রতিবাদ ও অধিকার আদায়ের জ্বালামুখে পরিণত হয়। দলমত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে “অপরাজেয় বাংলা” হয়ে ওঠে মানব হৃদয়ের আকাংকা ও কথা বলার প্রতীক।

“অপরাজেয় বাংলা” নির্মানের সাথে ক্যামেরা হাতে প্রথম থেকেই এ্যক্টিভ ছিলেন তখনকার সময়ে এ্যামেচার ফটোগ্রাফার, পরবর্তিতে প্রতিষ্ঠিত সংবাদ কর্মি মিশুক মনির।

আসুন “অপরাজেয় বাংলা’র সার্বজনীনতা নিয়ে মিশুক মনিরের চমৎকার বক্তব্যটি দেখি।

“অপরাজেয় বাংলা দেশের মানুষের কাছে পৌঁছতে কোন লিফ্লেটের দরকার পরেনি…

ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, হোয়াটেভার ইট ইজ, যাদেরই রাজনৈতিক কোন বক্তব্য রাখার প্রয়োজন হতো, কোথায় হবে ?

অপরাজেয় বাংলায় হবে। এই যে একটা ইউনিভার্সেল এক্সেপ্টেন্স, এটা ৭৮, ৮৫, ৮৮ কন্সট্যান্টলি হয়েছে।

…… এরকম উদাহরণ হয়তো খুব কমই আছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এক্রস দা প্ল্যাটফর্ম,  একই ভেন্যু,  একই ইমেজ,  একই ফিলিংস থেকে রিলেট করছে । গ্রেট এচিভমেন্ট !”

তথ্যসুত্র  – পুরাতন সংবাদ পত্র ও নেট থেকে নেওয়া ছবি

ভাষ্কর্যটির মডেল হবার বিরল সৌভাগ্য যাঁদের হয়েছিলঃ

আর্ট কলেজের ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা বদরুল আলম বেনু -লুঙ্গি পড়া সৈয়দ হামিদ মকসুদ ফজলে , -বেলবটম প্যান্ট আর নারী মূর্তির মডেল ছিলেন হাসিনা আহমেদ।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

অতীত খুঁড়ে কে হায় বেদনা জাগাতে চায়! 

বঙ্গবন্ধু

ঢাকা, ২৩ আগস্ট : পঁচাত্তরের মধ্য আগস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চে ঘটেছিল রক্তাক্ত পালাবদল। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় সেনাবাহিনীর দুটি ইউনিট বিদ্রোহ করে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল। কয়েক ঘণ্টা যেতে-না-যেতেই দেখা গেল পুরো সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, বিডিআর এবং অসামরিক আমলারা অভ্যুত্থানকে হয় স্বাগত জানাল, নয়তো ​তা বিনা প্রতিবাদে মেনে নিল। পুরো দৃশ্যপট যেন ভোজবাজির মতো পাল্টে গেল। ওই সময় ঢাকা সেনানিবাসের স্টেশন কমান্ডার ছিলেন লে. কর্নেল এম এ হামিদ। এই অভ্যুত্থান সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন ছিল: ফারুক-রশিদের অভ্যুত্থান স্রেফ দুটি ইউনিটের একক দুঃসাহসিক অভিযান মনে করা হলেও তাঁদের পেছনে বড় র‍্যাঙ্কের কিছু অফিসার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদ জুগিয়েছিলেন। ৪৬ ব্রিগেডের নিষ্ক্রিয়তাই এর একটি দৃষ্টান্ত।

ফারুক-রশিদ এ রকম কিছু একটা ঘটাতে পারেন, এ ধরনের অস্পষ্ট তথ্য আলাদাভাবে জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ ও আবদুর রউফ (ডিজিএফআইয়ের প্রধান) কমবেশি জানতেন। তাঁরা খুব সম্ভব চেপে যান এই মতলবে যে পাগলদের প্ল্যান যদি সত্যিই সফল হয়, তাহলে ক্ষমতার মসনদে বসার সহজ সুযোগটার সদ্ব্যবহার করতে তাঁরা যেন অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে না থাকেন। কর্নেল হামিদের মনে জিজ্ঞাসা ছিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মতো একজন জনপ্রিয় নেতার এমন পরিণতি কেন হলো? তাঁর করুণ মৃত্যুতে কোথাও ‘টুঁ’ শব্দটি উচ্চারিত হলো না কেন? কোথায় ছিল তাঁর ব্যর্থতা? ইতিহাসের প্রয়োজনে এগুলো খতিয়ে দেখা দরকার।

এটা সবারই মোটামুটি জানা, আমাদের দেশের রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ রয়েছে। কিন্তু তাঁকে নিয়ে বস্তুগত নির্মোহ বিশ্লেষণ খুব কমই হয়েছে। ৪১ বছর ধরে চলছে সমর্থন–বন্দনা কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত সমালোচনা। এর মধ্যেই ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ উঠেছে বারবার। মুশকিল হলো, ইতিহাস তো লেখাই হয়নি! এ জন্য আরও অনুসন্ধান দরকার। দরকার আরও সময়ের।

স্বাধীনতার আগে ও পরে রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পক্ষ-বিপক্ষ ছিল। মুজিব-শাসনের শেষ দিনগুলোতে মুজিববিরোধীদের সামনের কাতারে ছিল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এবং পরীক্ষিত মিত্র ছিল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। আগস্ট-অভ্যুত্থান নিয়ে এই দুটি দলের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আমলে নেওয়া যেতে পারে।

জাসদ জন্মমুহূর্তেই সরকার উৎখাতের ঘোষণা দিয়েছিল। ১৯৭৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত দলের অন্যতম মুখপত্র সাম্যবাদ-এর চতুর্থ সংখ্যায় শেখ মুজিবের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে বলা হয়, ‘ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ইতিমধ্যেই ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপ শুরু করে দিয়েছিল। প্রতিক্রিয়াশীল আওয়ামী লীগ (পরবর্তীকালে বাকশাল)-এর সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধল সংশোধনবাদের বাংলাদেশস্থ এজেন্ট গণধিক্কৃত মণি-মুজাফফর চক্র। কিন্তু চরম ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপ শেখ মুজিবকে ঠেকিয়ে রাখতে পারল না।…বুর্জোয়াবাদের মধ্যে দেখা দিল অস্থিরতা ও অন্তঃকোন্দল। দেশীয় প্রতিক্রিয়াশীলদের বিদেশি মুরব্বিরাও দিশেহারা হয়ে উঠল; কোন নেতৃত্বের মাধ্যমে তাদের স্বার্থ প্রতিপত্তি কায়েম থাকবে—এ প্রশ্নে তারা দ্বিধান্বিত হয়ে উঠল। এই ডামাডোলের একপর্যায়ে এল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। এদিন শেখ মুজিব ও তাঁর কতিপয় সহযোগী নিহত হলো। সামরিক বাহিনীর একাংশের সহযোগিতায় শেখ মুজিবেরই অন্যতম সহচর খন্দকার মোশতাক ক্ষমতায় বসল।’

জাসদের বিপরীত মেরুর দল ছিল সিপিবি। সিপিবির মূল্যায়নটিও অনুরূপ, যদিও তা করা হয়েছিল জাসদের মূল্যায়নের তিন বছর পর। ১৯৭৯ সালে সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির এক সভায় ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব এবং আমাদের পার্টির ভূমিকা ও করণীয়’ শিরোনামে একটি দলিল গৃহীত হয়। ওই দলিলে মন্তব্য করা হয়, দেশে একটি প্রগতির ধারা সূচিত হলেও দলের নেতা, মন্ত্রী, এমপি এবং দলের কর্মীদের একাংশ ব্যাপক দুর্নীতি, লাইসেন্স-পারমিট, ব্যাংকঋণ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রভৃতির মাধ্যমে বিত্তশালী হয়ে ওঠে। এমনকি জাতীয়করণকেও তারা নিজেদের বিত্ত সঞ্চয়ের কাজে ব্যবহার করতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর আমলে ৩৪০ কোটি ৩৮ লাখ ডলার বৈদেশিক সাহায্য বাংলাদেশে আসে।

‘বঙ্গবন্ধুর ভাষায় এই টাকার শতকরা ৩০ ভাগ দুর্নীতিবাজদের পকেটে চলে যায়। এদের মধ্যে আওয়ামী লীগের লোকজনও ছিল। এভাবে দলের মধ্যে বুর্জোয়া ও নব্য-ধনিকদের শক্তি ও প্রভাব বৃদ্ধি পায়। বস্তুতপক্ষে ১৯৭৪ সালে দেশের প্রগতির ধারাকে অগ্রসর করার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগই প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।…শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদঘেঁষা আওয়ামী লীগের দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল অংশ জাতীয়-আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াশীল অংশের সঙ্গে শরিক হয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে এবং আওয়ামী লীগের একাংশ খুনি মোশতাকের সহযোগী হয়।’

রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের উত্থান ছিল নানা নাটকীয়তায় ভরা। নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী, একজন সুবক্তা এবং অত্যন্ত মিশুক প্রকৃতির। তাঁর সাহসের জুড়ি ছিল না। তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী মিজানুর রহমান চৌধুরী ওই সময়ের একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, ‘এ সময় আমরা দেখেছি, যারা বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য জীবনপণ করতে প্রস্তুত—এ ধরনের অনেককেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে বা নিজ প্রচেষ্টায় দেখা করে বাকশাল প্রবর্তনের জন্য তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করছেন। সব মানুষই নিজের প্রশংসা শুনতে ভালোবাসে।…কিন্তু এটা যে প্রশংসাকারীকে চাটুকারে পরিণত করে তা-ই নয়, প্রশংসিত ব্যক্তির যে কী সর্বনাশ করা হলো, তা তিনি উপলব্ধিও করতে পারেন না। নিজের অজান্তেই তিনি নিজের সৃষ্ট একটা বলয়ের মধ্যে একাকী হয়ে যান।…এ কথা ভুলে যান যে চাটুকার কেবল তার আপন স্বার্থেরই বন্ধু।’

এ কথা সত্য যে, একটা পর্যায়ে এসে শেখ মুজিব বড্ড একা হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর আশপাশে যাঁরা ঘিরে ছিলেন, তাঁরা প্রায় সবাই ছিলেন অনুগত কিংবা সুযোগসন্ধানী। তাঁর চারপাশে ভিড় করে এত লোক থাকা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন অনিশ্চিত পথের যাত্রী।

দৈনিক ইত্তেফাক-এর সঙ্গে শেখ মুজিবের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সাবেক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন শেখ মুজিবের বড় ভাইয়ের মতো। নানা বিষয়ে তিনি শেখ মুজিবকে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিতেন। এ দেশের রাজনীতিতে এবং স্বাধীনতার প্রস্তুতিপর্বে মানিক মিয়ার অবদান অনেকটাই অজানা। মানিক মিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর দুই ছেলে মইনুল হোসেন হিরু ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ইত্তেফাক-এর হাল ধরেছিলেন। মইনুল হোসেন প্রথম জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের টিকিটে সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। বাকশালের বিরোধিতা করে তিনি সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন।

আনোয়ার হোসেন ছিলেন অনেকটা বিপরীত মেরুর। তিনি বাকশালের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও ইত্তেফাক ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানকে স্বাগত জানিয়েছিল। ১৬ আগস্ট ইত্তেফাক-এর প্রথম পাতায় ‘ঐতিহাসিক নবযাত্রা’ শিরোনামে একটা সম্পাদকীয় ছাপা হয়। সম্পাদকীয়তে বলা হয়:

‘দেশ ও জাতির এক ঐতিহাসিক প্রয়োজন পূরণে ১৫ আগস্ট শুক্রবার প্রত্যুষে প্রবীণ জননায়ক খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী সরকারের সর্বময় ক্ষমতা গ্রহণ করিয়াছে। পূর্ববর্তী সরকার ক্ষমতাচ্যুত হইয়াছে এবং এক ভাবগম্ভীর অথচ অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ গ্রহণ করিয়াছেন। …বিগত সাড়ে তিন বছরের ঊর্ধ্বকালে দেশবাসী বাস্তব ক্ষেত্রে যাহা লাভ করিয়াছে তাহাকে এক কথায় হতাশা ও বঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের সত্যিকার আশা-আকাঙ্ক্ষা রূপায়​েণ খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে সেই ঐতিহাসিক দায়িত্ব নিতে আগাইয়া আসিতে হইয়াছে। তারও কারণ ছিল। পূর্ববর্তী শাসকচক্র সাংবিধানিক পথে ক্ষমতা হস্তান্তরের সমস্ত পথ রুদ্ধ করিয়া রাখিয়া সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপকে অনিবার্য করিয়া তুলিয়াছিল। কিন্তু ইতিহাসের গতিকে কোনো দিন ক্ষমতালিপ্সার বাঁধ দিয়া ঠেকাইয়া রাখা যায় না। আজকের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে আমাদের দায়িত্ব অনেক। বাংলাদেশের এক মহাক্রান্তিলগ্নে জননায়ক খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনী যে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছে তাহাকে সুসংহত করিতে হইলে জনগণের প্রতি অর্পিত ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে আমাদের সকলকে আজ ঐক্যবদ্ধ হইতে হইবে।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আজ নেই। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে অনেকগুলো বছর পেরিয়ে আওয়ামী লীগ আবারও চালকের আসনে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সরকার চালাচ্ছেন। তাঁর চারপাশে অনেক লোক। এখানে জাসদ-সিপিবি-ইত্তেফাক একাকার। একসময় যাঁরা বঙ্গবন্ধুর প্রচণ্ড বিরোধিতা করতেন বা তঁার পতন দাবি করতেন, এখন তঁারা অনেকেই শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার সদস্য। জীবনানন্দ থেকে কয়েকটা শব্দ ধার করে বলতে চাই—অতীত খুঁড়ে কে হায় বেদনা জাগাতে চায়!

মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক।
mohi2005@gmail.com

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

সেলফি তুলতে হাতিদের স্টিক লাগত না! 

সেলফি তুলতে হাতিদের স্টিক লাগত না!

নিউজ৬৯বিডি ডেস্ক : চ্যানেল আই অনলাইনে একটা লেখার একটা পর্যবেক্ষণ বেশ মনে ধরেছে: হাতি নিয়ে ঢাকার সমালোচক বনাম চোখের পানি ফেলা চরাঞ্চলের মানুষ। মাকসুদ-উন-নবীর ওই লেখা থেকেই জানতে পারলাম, বিখ্যাত লেখক জর্জ অরওয়েল ১৯২৬ সালে মিয়ানমারে (বার্মা) এসেছিলেন উপবিভাগীয় পুলিশ কর্তা হিসেবে। সেখানে তাঁকে এক অত্যাচারী হাতি মারার দায়িত্ব পালন করতে যেতে হয়। তিনি রাইফেল নিয়ে গিয়ে দেখেন হাতি শান্তভাবে ধান খাচ্ছে।

তিনি গুলি করতে চাননি। গ্রামবাসী তাঁকে প্ররোচিত করে, তিনি গুলি করেন। হাতির শরীর থেকে ভেলভেটের মতো রক্ত বেরিয়ে আসে। এই নিয়ে তিনি স্মৃতিকথা লেখেন, শুটিং অ্যান এলিফ্যান্ট। এটা এখনো পড়ানো হয়। মাকসুদ-উন-নবী বলছেন, তাহলে ভারত থেকে আসা হাতিটি নিয়ে এক মাস-দুই মাস যদি আলোচনা হয়, তাতে এত সমালোচনার কী আছে।

গত শুক্রবার অরণ্যে রোদনে লিখেছিলাম, মানুষ আবার কাঁদতে শিখুক। যশোরের কেশবপুরে একটা সেপটিক ট্যাংকে একজন সহকারী মিস্ত্রি ঢুকে পড়ে আর ওঠেননি, তখন প্রধান মিস্ত্রি ঢোকেন, তিনিও উঠছেন না দেখে ঢুকে পড়েন শ্রমিক, তাঁরা উঠছেন
না দেখে ঢুকে পড়েন দুই পিতা আর পুত্র। এঁরা কেউ আর ওঠেননি। কিন্তু তারপরেও যে এই পাঁচটি লাশ বের করা হয়েছে, সেটাও করেছে গ্রামবাসীই, ভেতরে ঢুকেই।

এই মানুষই একজনের বিপদে আরেকজন এগিয়ে যায়, রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে বিপন্ন মানুষকে উদ্ধার করতে এগিয়ে যায়, ফুটবল পানিতে পড়ে গেলে তা আনতে নেমে পড়া কিশোরদের বাঁচিয়ে নিজের প্রাণ বিসর্জন দেয়। এই মানুষই হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় বন্ধুর জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে। এই মানুষই একটা বিপন্ন হাতিকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসে, আর সেই হাতিটা মারা গেলে কাঁদে।

আমি বলি, মানুষ কাঁদুক। ঝরাপালকের বেদনায় বেদনার্ত হোক, একটা হরিণের মৃত্যুতে কাঁদুক, শালিকের মৃত্যুতে কাঁদুক এবং মানুষের সুখে-দুঃখে সে চোখের জল ফেলুক। মানুষের জীবন যেন তার কাছে সবকিছুর চেয়েই বেশি মূল্যবান বলে মনে হয়!
আমাদের নাগরিক সমালোচকদের চোখে ভারত থেকে আসা হাতিটার অনেক দোষ। একটা বড় দোষ যে সে ভারতের। ফেলানীর মৃত্যুর জন্য ওই হাতিটাই দায়ী। কিংবা রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র বিতর্কে তারও দায় আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, সে মানুষ নয়, সে হাতি।

মৃত মানুষের জন্য পোষা প্রাণীর কাঁদার কাহিনি আমরা শুনেছি। মানুষের মৃত্যুতে প্রাণীরা কাঁদবে, সেটা খুব সচরাচর ঘটে না। কিন্তু মানুষ মানুষ হয়েছে, কারণ তার বোধ আছে, হৃদয় আছে, তার সংবেদন আছে। যে মানুষ একটা প্রাণীর মৃত্যুতে ব্যথা পায়, সে-ই মানুষ, সে-ই মানুষকে মানুষ রাখবে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকাবে, অগ্রহণযোগ্য করে তুলবে চরমপন্থা, প্রত্যাখ্যান করবে জঙ্গিবাদ। আমাদের আজ এই রকম সহৃদয় নরম মনের মানুষই দরকার। গ্রামের চরাঞ্চলের সহজ সাধারণ মায়ায় ভরা অন্তরগুলোকেই আজ আমাদের চাই।

দুই.
আজ আমার গদ্যকার্টুন লেখার দিন। অভ্যাসবশত অরণ্যে রোদন করতে বসেছি। বরং গদ্যকার্টুনে ফেরা যাক।
হাতি নাকি বেশ বুদ্ধিমান প্রাণী। ভাবছি, হাতি যদি মানুষের চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান হতো, তাহলে কী হতো?

হাতির নাম যে হাতি, এটা এসেছে তার হাত আছে বলে, এটা আমরা সবাই জানি। হাতির হাত হলো তার শুঁড়। তো ধরা যাক, হাতি মানুষের চেয়ে বুদ্ধিমান। তাহলে হাতি মানুষের আগে কম্পিউটার বানাত। সেই কম্পিউটার সে চালাত তার হাত দিয়ে। মানে শুঁড় দিয়ে। কি–বোর্ডগুলো কত বড় হতো ভাবুন।

এক হাতে হাতি অবশ্য বেশি তাড়াতাড়ি কম্পিউটার চালাতে পারত না। সম্ভবত বুদ্ধিমান প্রাণীটি তখন চেয়ারে বসে সামনের দুই পা দিয়ে কম্পিউটার চালাত। এবং যেহেতু সে বুদ্ধিমান, সে নিশ্চয়ই কি–বোর্ডে কির সংখ্যা কমিয়ে রাখত। তার এত হ্রস্ব–উকার দীর্ঘ–উকারের দরকার পড়ত না। আর ০ থেকে ৯ পর্যন্ত অঙ্ক না রেখে সে ০ আর ১ এই বাইনারি পদ্ধতিতেই হিসাবপাতি চালিয়ে নিত।

হাতি তার থাকার জন্য বড় বড় বাড়ি বানাত। বড় বড় গাছের গুঁড়ি টানার জন্য তখন হয়তো মানুষকে ব্যবহার করত। হাতির লিফটগুলো কত বড় হতো তাই ভাবছি। একটা লিফটে কতজন হাতি চড়তে পারত?

হাতি বেশি চালাক হলে কি শুধু তৃণভোজীই থাকত, নাকি ননভেজ হয়ে যেত? তাহলে তো হার্ট অ্যাটাকে অনেক হাতি মারা যেত। সে জন্য হাতিদের অনেক কার্ডিয়াক হাসপাতাল বানাতে হতো। তবে যেহেতু হাতি বুদ্ধিমান, সেহেতু সে সম্ভবত আমিষ এড়িয়েই চলত। তবে কলাগাছ কি সে কাঁটাচামচ দিয়ে খেত, নাকি এখন যেভাবে খায় সেভাবেই খেত? কলাগাছ কি সে রান্না করে একটু লবণ ছিটিয়ে নিয়ে খেত? নাকি একেবারে সালাদের মতো কাঁচাই খেত?

বুদ্ধিমান হাতিরা কি জুতা পরত? হাতিদের ফুটবল খেলতে আমরা সার্কাসে দেখেছি। ফুটবল মাঠে কি তারা বুট পরে নামত!
হাতিদের সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় মিস ইউনিভার্স হতো যে হস্তিনীটি, সে কি যথেষ্ট মোটা থাকত? নাকি বেশ রোগা-পটকা হতো? হাতিরা কি ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি ব্যবহার করে শ্বেতহস্তী হতে চাইত?

হাতিদের যুদ্ধক্ষেত্রে কি অশ্ববাহিনী থাকত! নাকি মনুষ্যবাহিনী থাকত!
হাতিদের দেশে দেশে কি সীমানা থাকত? বানের জলে কোনো মানুষ সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশে ভেসে এলে হাতিরা কি তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করত? উদ্ধার করার কাহিনি কি হাতিদের সংবাদপত্রে ছাপা হতো? টেলিভিশনে লাইভ দেখানো হতো? হাতিরা কি মানুষটাকে উদ্ধার করতে গিয়ে মেরে ফেলত। মানুষটা মরে গেলে হাতিরা কি কাঁদত? তখন অন্য হাতিরা কি হস্তী গণমাধ্যমের সমালোচনা করত? বলত, হাতিদের এত সমস্যা থাকতে মানুষকে নিয়ে কেন এত হইচই? আমাদের প্রতিবেশী দেশ সীমান্তে গুলি করে করে এত হাতি মারছে, সেটা নিয়ে তো কাউকে কাঁদতে দেখি না।

সীমান্তে মানব চোরাচালান বন্ধ করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, হাতিদের মন্ত্রী কি সেটা বলতেন?
হাতিদের দাবা খেলার ছকে কি হাতি নামের ঘুঁটি থাকত? সে কি শুধুই কোনাকুনি যেত? নাকি হাতির বদলে সেই ঘুঁটিটার নাম হতো মানুষ? আর তার চালটা হতো ৩-এর মতো প্যাঁচানো! হাতিদের কি ফেসবুক থাকত? মোবাইল ফোন? সেটা কি শুঁড় দিয়ে কানে ধরত?

এই সব প্রশ্নের জবাব আমাদের কাছে নেই। শুধু একটা প্রশ্নের জবাব আছে। হাতিরা সেলফি তুলতে সেলফি স্টিক ব্যবহার করত না! সেলফিটা হাতিরা খুব সহজে খুব ভালোভাবেই তুলতে পারত। আর এলিফ্যান্ট রোডের নাম হতো হিউম্যান রোড!
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

মানুষ আবার কাঁদতে শিখুক 

মানুষ আবার কাঁদতে শিখুক

আনিসুল হক  : ধরা যাক, গতকাল ঢাকার চিড়িয়াখানায় পাঁচটা হরিণ মারা গেছে। তাহলে আজকের খবরের কাগজগুলোতে কী ধরনের খবর আপনারা দেখতে পেতেন?

আচ্ছা, যদি পাঁচটা বাঘ মারা যায় এক দিনে, চিড়িয়াখানায়?
আমি কল্পনা করি, প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় পাঁচটা বাঘের ছবি ছাপা হবে। সারিবদ্ধভাবে পাঁচটা মৃতদেহ পড়ে আছে। এবং সেটা দোষের কিছু নয়। প্রথমত, পৃথিবীতে বাঘ কমে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, চিড়িয়াখানায় বাঘ ভালো থাকবে, সেটাই কাম্য। মারা যাওয়াটা অস্বাভাবিক ঘটনা। কাজেই এটা বড় নিউজ। তৃতীয়ত, বাঘের মৃত্যু একটা অসচরাচর ঘটনা। যা নিত্যদিন ঘটে, তা সংবাদ হয় না।
এবার নিচের খবরটা পড়ুন।

‘যশোরের কেশবপুরে একটি বাড়ির নির্মাণাধীন সেপটিক ট্যাংকে নেমে পাঁচজন মারা গেছেন। গতকাল সোমবার বিকেলে উপজেলার সরসকাটি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

মৃত ব্যক্তিরা হলেন উপজেলার বরণডালি গ্রামের হামিদ আলী (২৫) ও ইকবাল হোসেন (৩৬), মির্জানগর গ্রামের আল আমিন (২০) এবং সরসকাটি গ্রামের আহাদ আলী গাজী (৪৫) ও তাঁর ছেলে শফিকুল ইসলাম (২২)। এর মধ্যে প্রথম তিনজন নির্মাণশ্রমিক। বাকি দুজন নির্মাণাধীন বাড়িটির পাশের বাড়ির বাসিন্দা।

মনিরামপুর ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন অফিসার শরিফুল ইসলাম জানান, সেপটিক ট্যাংকের ভেতর জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাসে ওই পাঁচজন মারা গেছেন।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, সরসকাটি গ্রামে অজিয়ার মোড়লের বাড়ির নির্মাণাধীন ওই সেপটিক ট্যাংকের ছাদের বাঁশ ও তক্তা খুলতে নামেন নির্মাণশ্রমিক হামিদ আলী। নামার পর তিনি ট্যাংক থেকে বের না হলে সেখানে নামেন প্রধান মিস্ত্রি ইকবাল হোসেন। তিনিও না উঠলে তাতে নামেন শ্রমিক আল আমিন। এরপর আল আমিনও ওঠেননি। পরে তাঁদের উদ্ধার করতে ট্যাংকে নামেন প্রতিবেশী আহাদ আলী ও তাঁর ছেলে শফিকুল। একে একে সবাই ট্যাংকের মধ্যে মারা যান।

লাশ উদ্ধার করে যাঁর যাঁর বাড়িতে পাঠানোর পর তিনটি গ্রামে শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয়। আহাদ আলীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর স্ত্রী নির্বিকার বসে আছেন। ছেলে ও স্বামীকে হারিয়ে কান্নার ভাষাও হারিয়ে ফেলেছেন তিনি।

প্রধান মিস্ত্রি ইকবাল হোসেনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর মা রূপবান মাতম করছেন। স্ত্রী রোক্সানা মেয়ে মিম ও লামিয়াকে নিয়ে প্রলাপ বকছেন।’ (প্রথম আলো, ৮ আগস্ট ২০১৬)।

এই খবরটা পড়েও স্তব্ধ হতে হয়। প্রথমে একজন মিস্ত্রি নামলেন ট্যাংকে। তিনি উঠছেন না দেখে নামলেন প্রধান মিস্ত্রি। তাঁকে উঠতে না দেখে নামেন আরেকজন শ্রমিক। তিনজনের কেউই উঠছেন না দেখে নেমে পড়েন আরও দুই পড়শি, তাঁরা আবার পিতা-পুত্র।

এই ঘটনারও সংবাদমূল্য আছে। মানুষ মানুষের বিপদে কীভাবে এখনো এগিয়ে আসে! কীভাবে, কত সামান্য কারণে আমরা হারালাম অমূল্য পাঁচটা প্রাণ!

এবং সেপটিক ট্যাংকে মানুষের মৃত্যু।
এই দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটে। ৯ মে ২০১৬-এর প্রথম আলোতেই আছে, ‘নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার করতে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসে তিন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। অসুস্থ হয়েছেন আরও সাত শ্রমিক। আজ সোমবার দুপুরে সদর উপজেলার ধর্মগঞ্জ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।’

এই খবর ধরে দুটো দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। এক. সেপটিক ট্যাংকে ঢুকলে মানুষ মারা যায়, এই কথা জানার পরেও কেন আমরা সাবধান হই না? সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার করার সময় কেন আমরা নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করি না? সেপটিক ট্যাংকে নামার আগে কী কী নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার, তার বিধিমালা কেন তৈরি করি না?

দুই. মানুষের জীবন কত সস্তা এই দেশে! মানুষ মারা গেলে আর বড় কোনো খবর হয় না। পত্রিকার প্রথম পাতায় সে খবর স্থান পায় না। শীতে শালিক পাখি মারা গেলে খবর হয়। উঁচু বিল্ডিংয়ের সানশেডে বিড়াল আটকা পড়লে খবর হয়। শুধু মানুষের মৃত্যু, গরিব মানুষের মৃত্যু, অখ্যাত নামহীন-গোত্রহীন মানুষের মৃত্যু আর আমাদের চৈতন্যে কোনো রকমের আঁচড় কাটে না।
আমাদের অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। এইটাই আসলে খবর।

আমাদের সেই অনুভূতিগুলোকে ফিরিয়ে আনতে হবে। আমরা যেন একটা শালিকের মৃত্যুতেও ব্যথা পাই। আমরা যেন একটা হরিণের মৃত্যুতেও কাতর হই। আমরা যেন বাঘের মৃত্যুতে প্রতিবাদী হই। আমরা যেন একজন মানুষের মৃত্যুতেও শোকগ্রস্ত হই।
জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, ‘আমি কবি সেই কবি, আকাশে কাতর আঁখি তুলি হেরি ঝরা পালকের ছবি।’ একটা পালক খসে গেলেও কবি দুঃখ পান। আর আমরা মানুষের প্রাণ ঝরে গেলেও আর দুঃখ পাই না।

এই জায়গাটাতেই বোধ হয় আমাদের কাজ করতে হবে। কেশবপুরের মানুষেরা একজনের বিপদে আরেকজন এগিয়ে গেছেন। একজনকে বাঁচাতে এগিয়ে গিয়ে আরেকজন মারা গেছেন। তার মানে বাংলাদেশের মানুষের মধ্য থেকে ভালোবাসা, সহমর্মিতা, একের বিপদে অন্যের এগিয়ে আসার মনোবৃত্তি এখনো রয়ে গেছে। বিশেষ করে গ্রামের মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে গরিব মানুষের মধ্যে এই অমূল্য মানবিকতা আজও বিরাজমান। আমাদের সবার মধ্যে সেই মূল্যবোধটুকু ফিরিয়ে আনতে হবে।

মূল্যবোধ কথাটা আমি ভেবেচিন্তে ব্যবহার করেছি। এর মধ্যে ‘মূল্য’ এই শব্দটা আছে। মানুষের প্রাণ অমূল্য—এই কথাটা আমরা ভুলে গেছি। এই কথাটা আমাদের শিখতে হবে। এই কথাটা রাষ্ট্র ভুলে গেছে। এই কথাটা রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমাদের সংগ্রাম করতে হবে।

মহামতি আলেক্সান্ডার গিয়েছিলেন দার্শনিক ডায়োজেনেসের কাছে। এই দার্শনিক তখন একটা চৌবাচ্চায় গোসল করছিলেন। রোদের মধ্যে পানিতে শরীর ডুবিয়ে আছেন তিনি। মহান আলেক্সান্ডার গেছেন তাঁর সামনে। তাঁর খেয়ালই নেই। আলেক্সান্ডার বললেন, আমি আপনার জন্য কিছু একটা করতে চাই। আমি আপনার জন্য কী করতে পারি?

ডায়োজেনেস উত্তর দিলেন, আপনি আমার রোদ আটকে রেখেছেন। আপনার ছায়া পড়েছে আমার শরীরে। আপনি দয়া করে সরে দাঁড়ান। আপনি রোদ আসতে দিন। আপনি যা আমাকে দিতে পারেন না, তা আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারেন না।
রোদ আমরা কেউ কাউকে দিতে পারি না। কাজেই রোদ থেকে আমরা কেউ কাউকে বঞ্চিতও করতে পারি না। জীবনও আমরা কেউ কাউকে দিতে পারি না। কাজেই জীবনও কেড়ে নেওয়ার কোনো অধিকার আমাদের নেই। কাজের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দিতে না পারার ফলে যদি কারও মৃত্যু হয়, অঙ্গহানি হয়, স্বাস্থ্যহানি হয়, তার দায়িত্ব নিয়োগকর্তার ওপর বর্তায়। ম্যানহোলের ঢাকনা না থাকার ফলে আমাদের শিশুরা ট্যাংকে পড়ে মারা যাচ্ছে। তার দায়িত্ব অবশ্যই কর্তৃপক্ষের। আমরা মানুষের জীবনকে দেখি সংখ্যা হিসাবে। বলি, সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩ জনের মৃত্যু। ৩৩ নিতান্তই একটা সংখ্যা আমাদের কাছে।

কবি নির্মলেন্দু গু্ণ একবার আমেরিকায় একটা কবিসভায় গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। ওই সময় বাংলাদেশে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে লাখো মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। নির্মলেন্দু গুরণ ওই সভায় বাংলাদেশের নিহত মানুষের জন্য শোক প্রকাশ করে তাঁর কথা শুরু করেছিলেন। সভার শেষে একজন আমেরিকান বিট প্রজন্মের কবি তাঁকে বলেছিলেন, তোমাদের দেশে মানুষের মৃত্যু নিয়ে তোমরা শোক করবে কেন? তারপর এক হাতের তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুলি গোল করে আরেক হাতের তর্জনী সেদিকে নির্দেশ করে বলেছিলেন, তোমাদের দেশে মানুষ উৎপাদন করা তো খুব সহজ।

নির্মলেন্দু গুণের স্মৃতিকথার এই প্রসঙ্গটি যতবার আমার মনে হয়, ক্ষোভে-দুঃখে-অপমানে আমার শরীর জ্বলে ওঠে। বাংলাদেশের মানুষও মানুষ।

প্রতিটা মানুষই মানুষ। প্রতিটা মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার সমান। এবং প্রতিটা মানুষের মৃত্যু দুঃখজনক, তার ক্ষতি অপূরণীয়। একটা মানুষের যখন ক্যানসার হয় বা হৃদ্রোগ হয়, তখন তাকে সাহায্য করতে আমরা যখন সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসি, তখন আমরা বুঝি, মানুষের জীবন বাঁচাতে কত আয়োজন দরকার হয়, আর আমাদের কারও কোনো উদ্যোগে যদি একটা পরিবারও তার স্বজনকে ফিরে পায়, আমাদের কী যে ভালো লাগে!

অথচ এই দেশে কী অবলীলায় মানুষের প্রাণ চলে যায়, কেড়েও নেওয়া হয়।
জঙ্গিবাদের উৎসও এই মূল্যবোধের অভাব। আমাদের ধর্মে বলা আছে, যে একজন মানুষকে হত্যা করল, সে যেন সমস্ত মানবজাতিকেই হত্যা করল, এই কথার মর্ম উপলব্ধি করতে পারলে বহু সমস্যার সমাধান হয়! তেমনিভাবে রাষ্ট্রকেও মানবিক হয়ে উঠতে হবে। অনেক সময় আমরা বলি, অপরাধীর আবার মানবাধিকার কী! এই কথাটার মধ্যেই কিন্তু সংবেদনহীনতার বীজাণু নিহিত রয়েছে।

আমাদের সংবেদনশীলতা ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। সেটা ফিরিয়ে আনতে হবে। মানুষ হাসতে পারে, মানুষ কাঁদতে পারে, মানুষের কেবল পাঁচটি ইন্দ্রিয় নেই, আরেকটা ইন্দ্রিয় আছে, তার নাম মানবিকতা, সেটা না থাকলে আমরা যে মানুষ নামের যোগ্য নই, সেই ব্যাপারটা ছোটবেলা থেকেই আমাদের হৃদয়ে স্থায়ীভাবে এঁকে নিতে হবে। মানুষ মানুষের বেদনায় কাঁদতে ভুলে যাচ্ছে, মানুষ আবার কাঁদতে শিখুক।

আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর