১৭ অক্টোবর ২০১৭
দুপুর ১২:১২, মঙ্গলবার

সহায়ক সরকারে নির্বাচন

সহায়ক সরকারে নির্বাচন 

335

ঢাকা : দশম জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়ে ‘সহায়ক সরকার’-এর অধীনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তাব দিয়েছে বিএনপি। একই সঙ্গে নির্বাচনকালে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সেনা মোতায়েন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকারের কার্যকর সংলাপ অনুষ্ঠানে ইসিকে উদ্যোগ গ্রহণ, ২০০৮ সালের আগের নির্বাচনী আসনের সীমানা পুনর্বহাল, ইভিএম-ডিভিএম পদ্ধতি চালু না করা, ১/১১ থেকে শুরু করে বর্তমান সরকার কর্তৃক দলের চেয়ারপারসনসহ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহারসহ ২০ দফা সুপারিশ করেছে দলটি। গতকাল রবিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে অনুষ্ঠিত সংলাপে অংশ নিয়ে এসব প্রস্তাব লিখিতভাবে তুলে ধরে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনকারী দলটি। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে ১৬ সদস্যের প্রতিনিধি দল সংলাপে অংশ নেয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদার সভাপতিত্বে অন্য নির্বাচন কমিশনার ও ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিবসহ সংশ্লিষ্টরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংলাপের শুরুতে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় থাকাকালীন বিএনপির উন্নয়ন কাজের প্রশংসা করেন। লিখিত বক্তব্যে সিইসি বলেন, জিয়াউর রহমানের সময় এ দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি প্রায় নয় বছর আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়েছে। ১৯৯১ সালে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। এর পর ২০০১ সালে তার নেতৃত্বে আবার সরকার গঠিত হয়। সিইসি বলেন, আজকের সংলাপে আসা অনেকে মন্ত্রী ছিলেন। তিনি তাদের অধীনে চাকরি করেছেন। তিনি বলেন, বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে প্রকৃত নতুন ধারার প্রবর্তন করেছে।

বিএনপি সরকারে থাকার সময় নেওয়া উন্নয়ন কাজের কথা বলতে গিয়ে নূরুল হুদা বলেন, দলটি প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেছে, উš§ুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় করেছে, দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ দিয়েছে। র্যাব, দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, আইন কমিশন, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ বছর করেছে।

বিএনপিকে ‘সফল রাষ্ট্র পরিচালনার সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা’ থাকা একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে বর্ণনা করেন সিইসি। তিনি বলেন, বিএনপির সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের আজকের সংলাপের দিকে জাতি তাকিয়ে রয়েছে। নির্বাচন কমিশন অধীর আগ্রহ ও অত্যন্ত আন্তরিকতা নিয়ে, অতি ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করছে। কমিশন বিএনপির সঙ্গে সফল সংলাপ প্রত্যাশা করে। বিএনপির সঙ্গে সংলাপেই ‘সবচেয়ে বেশি লাভবান’ হওয়া যাবে বলে মন্তব্য করেন সিইসি।

আড়াই ঘণ্টার বেশি সময় বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সংলাপে আমাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনও তাদের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছে। তবে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ আয়োজন ও সহায়ক সরকারের যে দাবির কথা তাদের বলেছি, সে ব্যাপারে কমিশন তাদের ক্ষমতার মধ্য থেকে কিছু করার চেষ্টা করবে বলে আমাদের জানিয়েছেন।

সংলাপে আপনারা সন্তুষ্ট হয়েছেন কিনা, জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, বর্তমান যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারের যে একটা প্রচ- রকমের অগণতান্ত্রিক আচরণ, সেখানে খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার কারণ আছে বলে আমরা মনে করি না। আশার যাত্রাটা শুরু হলো কিনা, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কিছুটা তো বটেই, আমরা কিছুটা আশাবাদী তো বটেই।

মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, বিএনপি বিশ্বাস করতে চায়, নির্বাচন কমিশনের এই সংলাপ বা রোডম্যাপ বা পথনকশা নিছক কালক্ষেপণ বা লোক দেখানো কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে না। এ সংলাপ যেন প্রহসনে পরিণত না হয় তা কমিশনকেই নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ ও সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনের আন্তরিকতা, দক্ষতা ও নির্ভীক পদক্ষেপ সমগ্র জাতি প্রত্যাশা করে। জনগণের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য বিএনপি ইসিকে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করতে চায়।

সংলাপে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি ও নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের ধারণা নিয়েও মির্জা ফখরুল বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রকে সুসংহত করার আদর্শে বিএনপি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের অধীনেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান অকার্যকর ও অপরিপক্ব সংসদ ভেঙে দিতে হবে। এখন থেকেই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির ব্যবস্থা নিতে হবে। সব রাজনৈতিক দলকে সমান সুযোগ ও সভা-সমাবেশ করার জন্য সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।

ইসির মনোভাব সম্পর্কে মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা আমাদের প্রস্তাবসমূহ দিয়েছি। তারা (ইসি) অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে শুনেছেন। তারা বলেছেন, তারা চেষ্টা করবেন ভবিষ্যতে যেন একটা সুন্দর নির্বাচন উপহার দিতে পারেন তার জন্য তাদের ভূমিকা অব্যাহত রাখবেন। তারা (ইসি) এও বলেছেন, আপনাদের (বিএনপি) প্রস্তাবগুলো আমাদের কাছে অত্যন্ত উপযোগী হয়েছে, সুচিন্তিত হয়েছে, আমরা উপকৃত হব। তারা মনে করেছেন, প্রস্তাবসমূহ তাদের ভবিষ্যতের কাজের জন্য সুবিধা হবে।

আড়াই ঘণ্টা সংলাপের উপলব্ধি কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা (ইসি) বলেছেন, তারা অনেকখানি সীমাবদ্ধ আছেন। তবে এ কথা তারা স্বীকার করেছেন, দেশে বর্তমানে সেই অবস্থা নেই যে তাদের দায়িত্ব পুরো পালন করতে পারেন। এটাও বলেছেন, অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, গণতন্ত্রের যে আসল রূপ সেই রূপ বাংলাদেশে নেই।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয় নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য কী ছিল প্রশ্ন করা হলে ফখরুল বলেন, তারা (ইসি) বলেছেন তাদের সীমাবদ্ধতা আছে, তারা চেষ্টা করবেন, নিজেরা বসবেন, বসে দেখবেন কী করতে পারে।

আগে ইসি বলেছিল রাজনৈতিক দলের সংলাপে মধ্যস্থতার ভূমিকায় যাব না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, না আজকে তারা এ কথা বলেননি। তারা বলেছেন যে তারা নিজেরা বসবেন, আলাপ করে দেখবেন। তাদের কী কী সুযোগ আছে সেই সুযোগ তারা ব্যবহার করার চেষ্টা করবেন।

বিএনপির প্রস্তাবসমূহ

সহায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে বর্তমান সংসদে ভেঙে দেওয়া, ১/১১ সরকার কর্তৃক দলের চেয়ারপারসনসহ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সব মামলা প্রত্যাহার, বর্তমান সরকারের আমলে দায়ের করা সব ফরমায়েশি মামলা প্রত্যাহার ও গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি, গুম-খুন-হয়রানি ও ভীতি সঞ্চার বন্ধ, এখন থেকে সব রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশসহ রাজনৈতিক কর্মকা-ের অধিকার নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকারের কার্যকর সংলাপ অনুষ্ঠানে ইসিকে উদ্যোগ গ্রহণ, নির্বাচনের ৭ দিন আগে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রসহ নির্বাচনী আসনে সেনা মোতায়েন, আরপিওতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় প্রতিরক্ষা বাহিনীকে অন্তর্ভুক্তকরণ, আরপিওর নির্বাচনসংশ্লিষ্ট আইন-কানুন-বিধি-বিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধন, ২০০৮ সালের আগে নির্বাচনী আসনের সীমানা পুনর্বহাল, প্রশাসনকে দলীয়মুক্তকরণ ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল, নির্বাচনের ৬ মাস আগে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি বাতিল করে স্থানীয় প্রশাসনের অধীনে ন্যস্ত, নির্বাচনকালে নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সব সিদ্ধান্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা একক কোনো কমিশনার সিদ্ধান্তে নয় কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গ্রহণ, নির্বাচনপূর্ব সময়ের শুরুতে সব মেট্রোপলিটন কমিশনার, ডিসি, এসপি, ইউএনও, ওসি পরিবর্তন করা, রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার প্রদান, প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটার তালিকাভুক্ত করা, ভোটারযোগ্য কারাবন্দিদের ভোটার তালিকাভুক্তি এবং মৃত ব্যক্তিদের ভোটার তালিকা হতে বাদ দেওয়া, ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ ও ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগে স্বচ্ছ পদ্ধতি অনুসরণ, মনোনয়নপত্র দাখিলের ক্ষেত্রে বর্তমান বিধানের সঙ্গে ‘নির্বাচন কমিশন’ এবং ‘অনলাইনে’ দাখিলের বিধান প্রবর্তন, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জামানত হিসেবে ‘নগদ বা ক্যাশ’ অর্থ জমাদানের বিধান বাতিল, ভোটগ্রহণ শেষে সব পোলিং এজেন্টের উপস্থিতিতে ভোট গণনা, প্রিসাইডিং অফিসার কর্তৃক ভোট গণনার স্বাক্ষরিত বিবরণী উপস্থিত প্রত্যেক এজেন্টকে প্রদান না করে ভোটকেন্দ্র ত্যাগ না করা, রিটার্নিং অফিসার ভোটগ্রহণের দিনই কেন্দ্রভিত্তিক প্রাপ্ত ফল একত্রীকরণ করে প্রার্থীদের কিংবা তাদের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে বেসরকারিভাবে ফল ঘোষণা, নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিজয়ী প্রার্থীদের গেজেট প্রকাশ করা। তফসিল ঘোষণার পর সব রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর সভা-সমাবেশ-পথসভার অনুমতি সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কাছে ন্যস্ত করা, ছবিসহ অভিন্ন ভোটার তালিকা ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অথবা তার নির্বাচনী এজেন্টদের সরবরাহ করা, দল বা প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের প্রশিক্ষণের সহায়তা ও নিরাপত্তা প্রদান, দেশীয় পর্যবেক্ষক ও পর্যবেক্ষণ সংস্থার নিবন্ধন ও মনোনয়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা আনা, অধিকসংখ্যক বিদেশি পর্যবেক্ষককে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে উৎসাহিত করা।

বন্ধ ঘোষিত গণমাধ্যম চালু, গণমাধ্যমে সব দল ও প্রার্থীর প্রচারে সমতাভিত্তিক সুযোগ প্রদান, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, আইসিটি অ্যাক্টের বিতর্কিত ৫৭ ধারা বাতিল, নির্বাচনের দিন মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক চালু রাখা, মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইন্টারসেপ্ট করতে পারে এমন সংস্থাগুলো হতে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের অপসারণ করে সেখানে নিরপেক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তাদের পদায়ন, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, নির্বাচনে কালো টাকা ও পেশিশক্তির ব্যবহার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ ইত্যাদি।

বিএনপি প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যরা হলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, জমিরউদ্দিন সরকার, তরিকুল ইসলাম, মাহবুবুর রহমান, রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য এএসএম আবদুল হালিম, ইসমাইল জবিউল্লাহ, আবদুর রশীদ সরকার ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান কেন্দ্র করে গত ৩১ জুলাই সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের মধ্য দিয়ে সংলাপ শুরু হয়। এর পর গত ১৬ ও ১৭ আগস্ট গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পর ২৪ আগস্ট থেকে শুরু হয় নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ। এ পর্যন্ত ৩৩টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন সংলাপ করেছে। আগামী ১৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপের দিন ধার্য রয়েছে। সূত্র : আমাদের সময়

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

৪৫ দিনে দেড়শ’ কোটি টাকার বন উজার 

882

ঢাকা : বাংলাদেশে নতুন করে আসা প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর কারণে এরইমধ্যে বনের দেড়শ’ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। সার্বিকভাবে পরিবেশেরও অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু এই ক্ষতির জন্য মন্ত্রণালয়কেই দায়ী করতে চান পরিবেশবাদীরা।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি মঙ্গলবার এক ব্রিফিংয়ে নতুন করে আসা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর চাপে কক্সবাজার এলাকার পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। কমিটির বৈঠকে জানানো হয়, ‘‘এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের কারণে ১৫০ কোটি ৮৭ লাখ টাকার বনজ সম্পদ ধ্বংস হয়েছে।’’

কমিটির সভাপতি হাছান মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে মানবিক কারণে। তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণও যাচ্ছে। কিন্তু তাঁদের জ্বালানির কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তাঁরা প্রাকৃতিক বন থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করছে। এতে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। টেকনাফ রোডের গাছগুলো উজাড় হয়ে যাচ্ছে। বন অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত শুধু বনের ক্ষতি দেড়শ’ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। পরিবেশের ক্ষতির হিসাব অনেক বেশি।’’

হাছান মাহমুদ আরো বলেন, ‘‘ইতিমধ্যে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে পর্যটন ব্যবসায় ধস নেমেছে। বনের পাশাপাশি পরিবেশের অন্যান্য খাতে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা নিরূপণ করে আগামী বৈঠকে জানানোর জন্য মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে।’’

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কারণে পাহাড়, জলাশয়, সমুদ্রসৈকতসহ পরিবেশের অন্যান্য খাতেরও ক্ষতি হয়েছে। তবে কোন খাতে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা সুনির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি ওই ব্রিফিংয়ে। কমিটি বনের ক্ষতি কমাতে রোহিঙ্গাদের জ্বালানিসাশ্রয়ী চুলা সরবরাহের সুপারিশ ও প্রয়োজনে তাঁদের জন্য বায়োগ্যাস প্লান্ট বসানোর পরামর্শ দিয়েছে।

এ বিষয়ে কমিটির সদস্য টিপু সুলতান সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘এটা সম্ভব হলে বনের ক্ষতি ৫০ শতাংশ কমে আসবে। রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নেওয়ার পর যেসব এলাকা ফাঁকা হচ্ছে, সেখানে নতুন করে বনায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।’’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-র মুখপাত্র ইকবাল হাবিব ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এর জন্য দায়ী সরকার বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। সুনির্দষ্ট পরিকল্পনার অভাবেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শুরুতেই যদি পরিকল্পনা করা হতো তাহলে ক্ষতি অনেক কম হতো।’’ কী ধরণের পরিকল্পনা নেয়া যেতো, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘তাঁদের আশ্রয়ের জন্য যতটা সম্ভব পাহাড় ও বন বাদ দিয়ে সমতল ভূমি বেছে নেয়া যেতো। আবার পাহাড় ও বনভূমি সব জায়গায় নাই। সেইসব জায়গা বেছে নেয়া যেতো। আর জ্বালানীর বিকল্প ব্যবস্থা করা যেতো। শুধু গাছপালা বা পাহাড় কাটা নয়, পয়নিস্কাশন ব্যবস্থা না থাকার কারণেও পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।’’

তবে বন ও পরিবেশ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘রোহিঙ্গাদের কারণে বন ও পরিবেশের কী পরিমান ক্ষতি হয়েছে সে হিসাব সরকারের কাছে এখনো নাই। ক্ষতি অবশ্যই হয়েছে। সংসদীয় কমিটি যদি কোনো ক্ষতির হিসাব পাঠায়, আমরা তা দেখবো।’’

তিনি বলেন, ‘‘সরকারের সিদ্ধান্ত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হবে। সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হচ্ছে। এখানে পদক্ষেপ নেয়ার কী আছে? তবে তাঁদের আশ্রয়ের বিষয়টি সাময়িক। তাঁরা এখানে স্থায়ীভাবে থাকবে না। তাঁরা আসছে, আরো আসবে। ফেরত নেয়ার কথা চলছে। দেখা যাক কী হয়।’’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘যারা সরকারে থাকে না, তাঁরা তো সব জাদুর মতো করে ফেলে। আগাম পরিকল্পনা করা অসম্ভব, কারণ, রোহিঙ্গারা তো আর বলেকয়ে আসেনি। তাঁরা যে যার মতো নদী পাহাড় স্থলপথ দিয়ে এসেছে। এসে যে যার মতো থাকা শুরু করেছে।’’

কক্সাজারের বন বিভাগ জানিয়েছে, সম্প্রতি আসা রোহিঙ্গারা টেকনাফ ও উখিয়া এলাকার প্রায় ৪ হাজার একর বনাঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। এর মধ্যে উখিয়া রেঞ্জের কুতুপালং, থাইংখালী ও আশাপাশের ৩ হাজার, টেকনাফ রেঞ্জের ৪৫০ একর, শিলখালী রেঞ্জের ৩৭৫ একর ও পুটিবুনিয়া রেঞ্জের ৫০ একর পাহাড়ি জায়গা রোহিঙ্গাদের দখলে রয়েছে। এর বাইরেও কিছু এলাকায় তাঁদের বসতি রয়েছে।’’

সরকার কুতুপালংয়ের বালুখালি এলাকায় দুই হাজার একর বন এবং পাহাড় অধিগ্রহণ করেছে সব রোহিঙ্গাকে এক জায়গায় রাখার জন্য। জানা গেছে, আরো এক হাজার একর অধিগ্রহণ করা হবে। এটা করা হয়েছে ২৫ আগস্টের পর থেকে। তবে এর আগে ১৯৭৮ সাল থেকে কয়েক দফায় আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের জন্য  চার হাজার একর বন ও পাহাড় অধিগ্রহণ করা হয়। এসবই বনবিভাগের সংরক্ষিত বন ও পাহাড়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. এএইচএম রায়হান সরকার দীর্ঘ দিন ধরে রোহিঙ্গাদের বসবাস এবং পরিবেশের ওপর এর প্রতিক্রিয়া নিয়ে কাজ করছেন। তিনি গত শনিবার ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘পুরনো এবং নতুন রোহিঙ্গা আশ্রয় কেন্দ্র গড়েই উঠেছে সংরক্ষিত বন ও পাহাড় কেটে। এখানে পরিবেশকে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। এরই মধ্যে কক্সবাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়া শুরু হয়েছে। কক্সবাজার ও বান্দরবানে হাতির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। গাছপালা উজাড় হচ্ছে। বন না থাকায় নানা ধরণের প্রাণি ও পাখি বিলুপ্ত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কার কথা হলো পাহাড় ধস আরো বেড়ে যাবে।’’-ডয়চে ভেলে।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

কক্সবাজারে মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা 

533

কক্সবাজার : পর্যটন জেলা কক্সবাজারে খাদ্যাভাব ও মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা বলছে, স্থানীয় বাসিন্দা ও মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের পর্যাপ্ত খাবারের চাহিদা মেটানো স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষে দুরূহ হয়ে পড়েছে। দেশের অন্যান্য স্থানে রোহিঙ্গাদের ছড়িয়েপড়া ঠেকাতে বাস, ট্রেনসহ সব যানবাহনের টিকিট কাটার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করার কথাও জানানো হয়েছে।

বুধবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। কমিটির সভাপতি টিপু মুন্সীর সভাপতিত্বে বৈঠকে অংশ নেন কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, মো. মোজাম্মেল হোসেন, মো. শামসুল হক টুকু, মো. ফরিদুল হক খান, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, ফখরুল ইমাম ও কামরুন নাহার চৌধুরী।

বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি টিপু মুন্সী এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে জানান, চলমান রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি হবে বলে মনে করছে সংসদীয় কমিটি। মানবিক কারণে তাদের খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে কমিটি মনে করছে, পৃথক জনগোষ্ঠী হিসেবে রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করে যতদিন প্রয়োজন আশ্রয় দেওয়াটাই সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এ কারণে রোহিঙ্গারা যাতে দেশের বিভিম্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য চট্টগ্রামসহ সংশ্নিষ্ট এলাকায় যানবাহনের টিকিট কাটার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও ইতিমধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বৈঠকের কার্যপত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের উপসচিব মো. আবদুল মালেকের সই করা এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মিয়ানমার থেকে প্রতিনিয়ত রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান ও আগে অবস্থানকারী মিলে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয়ের কারণে কক্সবাজারের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। যে কারণে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফসহ আশপাশের এলাকায় খাদ্যাভাব ও মানবিক বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই নাজুক। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় তাদের ওপর পুলিশ, বিজিবিসহ অন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়েছে। স্থানীয় বিভিম্ন দালালচক্র উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাদের আরও নিরাপত্তাহীন করে তুলেছে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের সার্বিক আইন-শৃগ্ধখলা পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক হলেও সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের কারণে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি সার্বিক আইন-শৃগ্ধখলা পরিস্থিতিতে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।

মিয়ানমার থেকে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী ১৯৯১-৯২ সাল থেকে বাংলাদেশে অবস্থান করায় কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বিভিম্ন এলাকার স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে সখ্যের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই বিয়েসহ নানাভাবে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করেছে। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা পুনরায় বাংলাদেশে প্রবেশ করায় আত্মীয় ও দালালের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে বিভিম্ন পন্থায় দেশের নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়ার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। কক্সবাজার, বান্দরবান জেলা ছাড়াও ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম, মানিকগঞ্জ, খাগড়াছড়ি, সুনামগঞ্জ, রাঙামাটি, চাঁদপুর, হবিগঞ্জ, সিএমপি, কুড়িগ্রাম, টাঙ্গাইল, চুয়াডাঙ্গা জেলায় মোট ৫১৫ জন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে বলে সূত্রে জানা যায়। যাদের পরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কক্সবাজার-বান্দরবানসহ মিয়ানমার সীমান্তবর্তী জেলাগুলো থেকে দেশের অভ্যন্তরে ভ্রমণে সবাইকে বাধ্যতামূলক জাতীয় পরিচয়পত্র বা তার ফটোকপি বহন করতে হবে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভিম্ন বাহিনীপ্রধানকে নিয়ে বিশেষ সভায় জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া চট্টগ্রামসহ দেশের অন্য কোনো শহরে প্রবেশ ঠেকাতে যানবাহন বা নৌ রুটের টিকিট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কথা বলা হয়।

মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনীর দমন অভিযানের মুখে গত ২৫ আগস্ট থেকে পাঁচ লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তারা বলছেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মানুষ মারছে। রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ করা হচ্ছে, জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি সেনা অভিযানকে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে বর্ণনা করলেও জাতিসংঘ একে চিহ্নিত করেছে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ হিসেবে। রোহিঙ্গাদের জন্য কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালীতে আশ্রয় শিবির করেছে সরকার। সেখানে তাদের নিবন্ধনও করা হচ্ছে।

বৈঠকে জানানো হয়, রোহিঙ্গাদের প্রতিদিন ১০ হাজার নিবন্ধনের টার্গেট হলেও তা পূরণ করা যাচ্ছে না। এ পর্যন্ত সাত হাজারের মতো নিবন্ধন সম্ভব হচ্ছে। কারণ এ বিষয়ে রোহিঙ্গাদের অনীহা কাজ করছে। কমিটির পক্ষ থেকে নিবন্ধনের জন্য রোহিঙ্গাদের মোটিভেশেনের সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানান কমিটির সভাপতি।

টিপু মুন্সী আরও বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান দ্রুতই হয়ে যাবে বলে মনে করছে না কমিটি। যদিও মিয়ানমারের মন্ত্রী এসে বলেছেন, তারা এর সমাধান করবেন। কিন্তু এর মধ্যে অনেক বাহানা রয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে এই ইস্যুটা শুধু দ্বিপক্ষীয় বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেতে পারে। তখন বিশ্ব মতামতও অন্যরকম হবে। এ জন্য কমিটি বলেছে, এই সমস্যার সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে।

তিনি বলেন, সরকার কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে, তবে সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখতে আইন-শৃগ্ধখলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে। একই সঙ্গে তাদের সঙ্গে যাতে কোনোভাবে ইয়াবা বা অন্য কোনো মাদকদ্রব্য দেশে ঢুকতে না পারে, সেজন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে ‘বিশেষ’ নজরদারি চালানোর জন্য বলা হয়েছে।

এদিকে সংসদ সচিবালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, রোহিঙ্গাদের নিয়ে প্রচারিত বিভিম্ন সচিত্র প্রতিবেদন, নির্যাতনের চিত্র, ভিডিও ক্লিপস, পেপার ক্লিপসসহ তাদের বিষয়ে গৃহীত কার্যক্রম সংরক্ষণ করতে একটি বিশেষ আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

লক্ষ্যপূরণ থেকে অনেক পিছিয়ে ইসি 

5882

ঢাকা : দেশের নাগরিকদের উন্নতমানের জাতীয় পরিচয়পত্র দিতে ৭ বছর আগে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ‘আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং এক্সেস টু সার্ভিস (আইডিইএ)’ শীর্ষক এ প্রকল্প নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের অধীন। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় গত বছরের ৩ অক্টোবর থেকে শুরু হয় স্মার্টকার্ড নামে পরিচিত উন্নতমানের এই জাতীয় পরিচয়পত্র বিতরণ।

চলমান প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ডিসেম্বরে। এ সময়ের মধ্যে ৯ কোটি নাগরিকের হাতে স্মার্টকার্ড তুলে দেওয়ার কথা। অথচ এ পর্যন্ত সোয়া কোটি ভোটারের হাতে স্মার্টকার্ড তুলে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দুই কোটির বেশি ভোটারের হাতে স্মার্টকার্ড তুলে দেওয়া সম্ভব হবে না। তারা বলছেন, দেশের সব ভোটারের হাতে স্মার্টকার্ড তুলে দেওয়ার লক্ষ্যপূরণ থেকে ইসি অনেক পিছিয়ে। তাই নতুন আরেকটি প্রকল্প গ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে এ কাজে সহায়তার জন্য সেনাবাহিনীকেও পাশে চায় ইসি।

জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেন, আমরা বহুমুখী পদক্ষেপ নিচ্ছি; দ্রুত লোকবল প্রস্তুত করছি। পারসোনালাইজেশন মেশিনও কাজ করছে। ডিসেম্বরের মধ্যে নাগরিকদের হাতে কার্ড পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব।

২০১৬ সালের ২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্মার্টকার্ড বিতরণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এর পরদিন অর্থাৎ ৩ অক্টোবর থেকে ঢাকা মহানগরীতে এ কার্ড বিতরণ শুরু হয়। এ পর্যন্ত এ বিতরণকাজ চলেছে দেশের সিটি করপোরেশনগুলোতে এবং বিলুপ্ত একটি ছিটমহলে।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, ৯ কোটির ভেতর ইতোমধ্যে মাত্র এক কোটি ২৪ লাখ ১০ হাজার স্মার্টকার্ড পারসোনালাইজেশন (ব্যাংককার্ডের মধ্যে নাগরিক তথ্য সন্নিবেশকরণ) সম্পাদন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ কোটি ৯ লাখ ৮০ হাজার কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাকি ৭ কোটি ৭৫ লাখ ৯০ হাজার স্মার্টকার্ড তৈরি ও বিতরণ করার কথা রয়েছে।

২০১৫ সালে ফরাসি কোম্পানি অবার্থুর টেকনোলজির সঙ্গে চুক্তি করে ইসি। চুক্তির আওতায় ডিসেম্বরের মধ্যে ৯ কোটি স্মার্টকার্ড ফ্রান্স থেকে তৈরি করে এনে তাদের ব্যবস্থাপনায় ইসি সচিবালয়ের পারস্যু সেন্টারে পারসোনালাইজেশনের পর উপজেলা পর্যায়ে বিতরণ করার কথা ছিল। কয়েক দফা সময় বাড়িয়েও তা করতে না পারায় কোম্পানিটির সঙ্গে চুক্তি বাতিলের পর নিজেদের উদ্যোগে এ কাজটি সম্পাদনের উদ্যোগ নেয় ইসি। গত ২৭ আগস্ট ইসির তত্ত্বাবধায়নে স্মার্টকার্ডের প্রিন্ট শুরু হয়। লক্ষ্য পূরণ করতে হলে আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে অবশিষ্ট ৭ কোটি ৭৫ লাখ ৯০ হাজার কার্ড তৈরি ও বিতরণ করতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে ইসির পক্ষ থেকে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে চিঠি দিয়ে বলা হয়, ৭ কোটি ৭৫ লাখ ৯০ হাজার কার্ড উৎপাদন এবং আইরিস ও আঙ্গুলের ছাপ সংগ্রহ করে নাগরিকদের হাতে কার্ড তুলে দিতে সশস্ত্র বাহিনী থেকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক অফিসারকে আইডিইএ প্রকল্পে জরুরি ভিত্তিতে সংযুক্ত করা দরকার।

এদিকে ডিসেম্বরে আইডিইএ প্রকল্প শেষে প্রায় ১৬শ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘ভোটার তালিকা প্রস্তুত এবং জাতীয় পরিচিতি সেবা প্রদানে টেকসই অবকাঠামো উন্নয়ন’ শীর্ষক এক নতুন প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে ইসি।

ব্যয় কমছে ৫০ কোটি টাকা

স্মার্টকার্ড তৈরিতে ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে এ প্রকল্পে ৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। কার্ডটির দীর্ঘস্থায়িত্বের কথা ভেবে বর্তমানে উন্নতমানের লেমিনেটিং পেপার ব্যবহার হচ্ছে। নতুন প্রস্তাবনায় অপেক্ষাকৃত কম মূল্যের পেপার ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমানে স্মার্টকার্ডের সঙ্গে একটি সুদৃশ্য খাম এবং খামের অভ্যন্তরে কার্ডটি সংরক্ষণ ও ব্যবহারের নির্দেশিকা রয়েছে। আগামীতে এগুলো বাদ দেওয়া হবে। এ ছাড়া প্রতিটি বিতরণকেন্দ্রে ২৫০টি কার্ডের জন্য আলাদা বক্স নম্বর দিয়ে সেগুলো সংরক্ষণ করা হয়। এ জন্য জনবল এবং স্থান বেশি লাগে। আইডিইএ কর্তৃপক্ষের যুক্তিÑ অপরিহার্য নয়, এমন উপাদান স্মার্টকার্ড থেকে বাদ দেওয়া হলে কোনো ক্ষতি নেই। বরং এতে করে সময়, জনবল ও ব্যয় কমবে।

বর্তমানে ১০ কোটি ১৮ লাখের বেশি ভোটার রয়েছে। এর মধ্যে ৯ কোটি নাগরিকের হাতে ডিসেম্বরের মধ্যে স্মার্টকার্ড পৌঁছে দেওয়ার কথা। জানুয়ারিতে যোগ হচ্ছে আরও ২৫ লক্ষাধিক নতুন ভোটার।

উল্লেখ্য, স্মার্টকার্ডের জন্য ২০১১ সালের মে মাসে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে প্রায় ২০ কোটি ডলারের চুক্তি সই করে সরকার। এ সংক্রান্ত প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৩৭৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের সহযোগী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএ) ঋণ ১৩৬৫ কোটি টাকা। দশমিক ৭৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জে পাওয়া এ ঋণ বাংলাদেশকে ৪০ বছরের মধ্যে শোধ করতে হবে। এর মধ্যে প্রথম ১০ বছর কোনো সুদ দিতে হবে না। বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তায় এ প্রকল্পের অধীনে ২০১১ সালের জুলাই থেকে ২০১৬ সালের জুনের মধ্যে ৯ কোটি ভোটারের হাতে স্মার্টকার্ড তুলে দেওয়ার কথা ছিল। পরে প্রকল্পের মেয়াদ দেড় বছর বাড়িয়ে চলতি ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত রয়েছে। স্মার্টকার্ড প্রস্তুত ও বিতরণের লক্ষ্যে ফ্রান্সের অবার্থুর টেকনোলজিসের সঙ্গে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার চুক্তি করে ইসি। ওই চুক্তির অধীনে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ৯ কোটি কার্ড তৈরি ও বিতরণের কথা ছিল; কিন্তু দফায়-দফায় সময় পিছিয়ে সেই কার্ড বিতরণ শুরু হয় ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর। -আমাদের সময়

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

মিয়ানমার আসলে কী চায়? 

997

ঢাকা : মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সম্মত হলেও রাখাইনে সহিংসতা বন্ধ হয়নি। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের খবরে প্রকাশ , এখনো ১০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায়। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, প্রতিরাতেই বাংলাদেশে তারা ঢুকছে।

মিয়ানমারের রাখাইন থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা আগের তুলনায় কিছুটা কমে এলেও বন্ধ হয়নি। প্রতিদিন এখনো গড়ে এক-দেড় হাজার রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। গত এক সপ্তাহে সাত হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। যারা আসছেন, তারা বলছেন, এখনো নির্যাতন চলছে। বাড়ি-ঘরে আগুন দেয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের চলে যাওয়ার জন্য রাখাইনে মাইকিং করা হচ্ছে। কক্সবাজারের সাংবাদিক আব্দুল আজিজ ডয়চে ভেলেকে জানান, গত তিন দিন আমরা সীমান্তের এপার থেকে ওপারের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে আগুন জ্বলতে দেখেছি। এমনকি আজও (মেঙ্গলবার) আগুন জ্বলতে দেখা যায়।

তিনি বলেন, এখন রোহিঙ্গারা শাহপরী দ্বীপসহ আরো কিছু সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করছেন। কৌশল হিসেবে তাঁরা রাতের বেলায় প্রবেশ করেন। আজও ( মঙ্গলবার) কমপক্ষে এক হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রবেশ করেছেন। যাঁরা আসছেন তাঁরা বলছেন যে, রাখাইনে নির্যাতন এখনো চলছে। বাড়ি-ঘরে আগুন দেয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের রাখাইন ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য মাইকিং অব্যাহত আছে।

২৫ অগস্ট থেকে নির্যাতনের মুখে এ পর্যন্ত পাঁচ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন। মিয়ানমারের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল নিউ লাইটকে উদ্ধৃত করে ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, বাংলাদেশে ঢোকার জন্য রাখাইনের পশ্চিমাঞ্চলের দুই গ্রামের মধ্যবর্তী সীমান্তের কাছে ১০ হাজারেও বেশি মানুষ জড়ো হয়েছেন। তাঁরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

তবে মিয়ানমারের ডি-ফ্যাক্টো সরকারের মুখপাত্র গ্লোবাল নিউ লাইট তাদের প্রতিবেদনে দাবি করেছে, কর্তৃপক্ষ পালিয়ে যেতে চাওয়া রোহিঙ্গাদের বারবার আশ্বস্ত করতে চাইছে যে, রাখাইনে তারা এখন নিরাপদ। তা সত্ত্বেও রোহিঙ্গারা নিজেদের ইচ্ছায় বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু  ওয়াশিংটন পোস্ট তাদের নিজস্ব অনুসন্ধানের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, গ্রামবাসী ক্ষুধার যন্ত্রণায় ভুগছে। বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা ক্রমাগত তাঁদের হত্যার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।

নিজেদের গ্রাম থেকে রাখাইন বৌদ্ধঅধ্যুষিত গ্রামগুলো পার হয়ে যেতেও ভয় পাচ্ছে রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গা অ্যাডভোকেসি গ্রুপ আরাকান প্রজেক্টের প্রতিনিধি ক্রিস হ্যারিস এএফপিকে বলেছেন,   গ্রামপ্রধান যদি গ্রাম ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন, সঙ্গে সঙ্গেই সমগ্র গ্রামবাসী সেই সিদ্ধান্ত মেনে গ্রাম শূন্য করে পালিয়ে যায়।

সোমবার ঢাকায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে মন্ত্রী পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার প্রস্তাব দেয় মিয়ানমার। তবে মিয়ানমার বলছে, তারা ২৫ অগাষ্ট থেকেবাংলাদেশে যারা এসেছেতাদের যাচাই-বাছাই করে ফেরত নেবে। কিন্তু এর আগে আরো যে চার লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে, তাদের ব্যাপারে মিয়ানমার নীরব। সূত্র বলছে, এই যাচাই-বাছাইও মিয়ানার এককভাবে করতে চায়। কিন্তু বাংলাদেশ চায় তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতে মিয়ারমার- বাংলাদেশ যৌথভাবে তা করুক। আর মিয়ানমার যদি তাদের দেয়া নাগরিকত্বের কার্ড শুধু বিবেচনা করে, তাহলে সেরকম রোহিঙ্গার সংখ্যা সাত হাজারের বেশি হবে না। একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তার রূপরেখা এখনো চূড়ান্ত নয়। বাংলাদেশ চায় রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়া হোক , রাখাইনে সহিংসতা বন্ধ হোক এবং কোফি আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়িত হোক।

সহিংসতা অব্যাহত রাখা ছাড়াও মিয়ানমার এরইমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, তাদের আইন অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের ফেলে আসা জমি-বড়ি-ঘর রাষ্ট্রীয়ভাবে অধিগ্রহণ করবে। এমনকিরোহিঙ্গাদের মধ্যে যাঁদের ফেরত নেবে, তাঁদের ‘উন্মূক্ত কারাগারে’ রাখা হবে। তাই মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার যে প্রস্তাব দিয়েছে, তাকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও সতর্ক পর্যবেক্ষণে রেখেছে ঢাকা।

নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক মেজর জেনারেল আব্দুর রশিদ (অব.) ডয়চে ভেলেকে বলেন, মিয়ানমারের মন্ত্রী ( টিন্ট সোয়ে) রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। এটাকে সরলভাবে দেখার কোনো সুযোগ নাই। তারা আন্তর্জাতিক চাপের মুখে একটি কৌশল নিয়েছে। তাই রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার যে প্রস্তাব তারা দিয়েছে। এটাকে আমি দেখছি চাপ কমানোর একটি কৌশল হিসেবে।

তিনি বলেন, মিয়ানমারের কথায় আস্থা স্থাপনের এখনো কোনো যুক্তি নাই। কারণ, দেশি এবং বিদেশি সংবাদ মাধ্যম যে খবর দিচ্ছে, তাতে রাখাইনে নির্যাতন ও সহিংসতা বন্ধ হয়নি। সেটা অব্যাহত আছে। এমনকি সোমবার বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে মন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠকের সময়ও সেখানে সহিংসতা হয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়। তাই মিয়ানমার যে মুখের প্রস্তাব দিয়েছে, মনের প্রস্তাব নয়, তা সহজেই বোঝা যায়। কিন্তু চাপ অব্যাহত রাখা গেলে শেষ পর্যন্ত মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাধ্য হবে।

সাবেক সামরিক কর্মকর্তা আব্দুর রশিদ আরো বলেন, মিয়ানমারে সহিংসতা চালাচ্ছে সেনাবাহিনী। কথা বলছে সিভিল প্রশাসন, যারা সেনাবাহিনীর ওপর প্রভাব বিস্তারে সক্ষম নয়। কিন্তু যদি দ্বিপাক্ষিক এবং আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত এবং আরো জোরদার করা যায়, তাহলে সেনাবাহিনীরও অবন্থানের পরিবর্তন হবে বলে আমি মনে করি। কারণ, এই পর্যায়ে চাপের মুখেই মিয়ানমার তার অবস্থান পরিবর্তন করছে। এটাকে কার্যকর পরিবর্তনে রূপ দিতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে চাপে ফেলতে হবে। -ডয়চে ভেলে ।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তায় ৮ সিদ্ধান্ত 

82

ঢাকা : গুরুত্বপূর্ণ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তা জোরদারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ আট সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওই সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, বিচারপতি, নির্বাচন কমিশনারসহ গুরুত্বপূর্ণ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বাসভবনে নিরাপত্তায় নিয়োজিত হাউস গার্ড পুলিশ সদস্যদের থাকার জন্য শেড নির্মাণ করতে হবে। অন্যদিকে নিরাপত্তায় ব্যবহৃত এস্কর্ট গাড়ি (পুলিশ প্রটেকশন গাড়ি) নিজ নিজ মন্ত্রণালয়কে সরবরাহ করতে হবে।

সম্প্রতি এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় ৮ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে- গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা মহানগর পুলিশকে গুরুত্বপূর্ণ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বাসস্থানে হাউস গার্ডের জন্য গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় পুলিশের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে একটি প্রাক্কলন প্রস্তুত করে নিরাপদ আবাসন তৈরির জন্য উদ্যোগ নেবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ একই কার্যক্রম গ্রহণের জন্য তৎপর থাকবে। যেসব বিশিষ্ট ব্যক্তির বাসস্থান নিজস্ব মালিকানাধীন বা ভাড়া করা ভবনে রয়েছে, সেখানে ডিএমপির প্রতিনিধির উপস্থিতিতে হাউস গার্ডের জন্য আবাসন তৈরির ব্যবস্থা নিতে হবে। এ প্রক্রিয়া গতিশীল করতে ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ করে কার্যক্রম বাস্তবায়নে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ উদ্যোগ নেবে।

অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তা জোরদারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগ/সংস্থা তাদের নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের টিওঅ্যান্ডইতে ড্রাইভারসহ গাড়ি অন্তর্ভুক্তকরণের জন্য প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়/অর্থ বিভাগে পাঠাবে। এ ছাড়া চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ডাবল কেবিনের গাড়ি ক্রয় করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগ প্রতিটি প্রস্তাবনা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে (ওএওএম অনুবিভাগের) ফরম ডাউনলোড করে গাড়ি টিওঅ্যান্ডইভুক্তকরণে প্রস্তাবনা জরুরি ভিত্তিতে সব মন্ত্রণালয়/সংস্থা উদ্যোগ নেবে।

জানা গেছে, বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ ও বিশিষ্ট ব্যক্তির বাসভবনে পুলিশ হাউস গার্ড থাকার জন্য উপযোগী শেড নেই। এতে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের ডিউটি করা কষ্টসাধ্য হচ্ছে। সভায় পুলিশের পক্ষ থেকে পুলিশ সদস্যদের থাকার জন্য উপযোগী শেড নির্মাণের পরামর্শ দেওয়া হয়। যেসব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বাসভবনে উপযোগী শেড নেই তার একটি তালিকাও সভায় উপস্থাপন করা হয় পুলিশের পক্ষ থেকে। সম্প্রতি ঢাকার পুলিশ কমিশনার গুরুত্বপূর্ণ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বাসভবন পরিদর্শনে গিয়ে দেখতে পান বেশিরভাগ বাসভবনে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের অনেক কষ্টে থাকতে হচ্ছে। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তায় ব্যবহৃত পুলিশ এস্কর্ট গাড়িরও সংকট রয়েছে পুলিশের। এর পরই পুলিশ কমিশনার এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠান। তার চিঠির আলোকেই কিছু দিন আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। -আমাদের সময়

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

ত্রাণের চালও চুরি 

88

ঢাকা : রক্ষকই ভক্ষক। প্রবাদ বাক্যটি খাদ্য অধিদফতরের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর ক্ষেত্রে একেবারে প্রযোজ্য। কারণ তারা রক্ষক হয়েও সরকারি চাল আত্মসাৎ করেছেন। বস্তাপ্রতি ১০ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত চাল সরিয়েছেন। ত্রাণের চাল থেকে শুরু করে আনসার-ভিডিপির জন্য বরাদ্দ বিপুল পরিমাণ চাল চুরি করেন। এভাবে চুরি করা টন টন চাল বিক্রি করে মোটা অংকের টাকা ভাগবাটোয়ারা করেছেন। গড়েছেন অঢেল সম্পদ। নমুনা হিসেবে রাজধানীর তেজগাঁও গুদামে এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনা একেবারে হাতেনাতে ধরে ফেলেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এ নিয়ে র‌্যাবের তথ্যবহুল প্রতিবেদনে নামধামসহ বিস্ময়কর সব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, তেজগাঁও গুদামের ন্যায় দেশের খাদ্য গুদামগুলোতে একই কারচুপি হচ্ছে। আর বাস্তবে তাই যদি হয় তবে নীরবে এক ভয়াবহ দুর্নীতি ভর করেছে সরকারের খাদ্য বিভাগে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উচিত হবে দ্রুত এ চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া। যদিও ইতিমধ্যে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে র‌্যাবের পক্ষ থেকে দুদকের মহাপরিচালক বরাবর চিঠি দেয়া হয়েছে।

৫ সেপ্টেম্বর র‌্যাবের অভিযানে তেজগাঁও খাদ্য গুদামে হাতেনাতে চাল চুরির ঘটনা ধরা পড়ে। গুদামে কর্মরত সাত কর্মকর্তাকে ‘চাল চোর’ হিসেবে চিহ্নিত করে র‌্যাব। এ ঘটনার পর তেজগাঁও খাদ্য গুদাম থেকে তিন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ঘটনা তদন্তে দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এদিকে হাতেনাতে ধরা পড়া ৭ কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও তেজগাঁও খাদ্য গুদামে সরকারি চাল চুরির সঙ্গে জড়িত আরও অন্তত ১৫ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সন্দেহভাজন এসব চাল চোরদের অবৈধ সম্পদসহ ব্যক্তিগত নানা বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে জোরেশোরে।

চোরের খাতায় যাদের নাম : র‌্যাবের অভিযানে তেজগাঁও সরকারি গুদাম থেকে চাল চুরির ঘটনা ধরা পড়ার পর গুদামের ৭ সরকারি কর্মকর্তার মুখোশ খুলে যায়। তাদের বিরুদ্ধে চাল চুরির অকাট্য প্রমাণ মেলে। চাল চুরির টাকায় এদের অনেকে অঢেল সম্পদ গড়েছেন। কেউ কেউ রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে রাজকীয় জীবনযাপন করেন।

র‌্যাব জানায়, গুদামের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকে নিজেরাই চোর সিন্ডিকেটের সদস্য। যাদের অনেকে বছরের পর বছর একই স্থানে কর্মরত। ৭ থেকে ১০ বছরেও তেজগাঁও গুদাম থেকে অন্যত্র বদলি হননি কয়েকজন কর্মকর্তা। বহু বছর একই স্থানে থাকার কারণে তারা শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। কয়েক কর্মকর্তা আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত।

সূত্র জানায়, চাল চোরদের চিহ্নিত করে র‌্যাবের পক্ষ থেকে একটি প্রতিবেদন দুদকে পাঠানো হয়। ওই তালিকায় দুর্নীতিবাজদের একটি তালিকাও সংযুক্ত করা হয়েছে। এতে এক নম্বরে আছে খাদ্য কর্মকর্তা নান্নু মিয়ার নাম। তিনি উপ-খাদ্য পরিদর্শক। তার পোস্টিং মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় হলেও বিশেষ সংযুক্তি নিয়ে বর্তমানে তিনি তেজগাঁও খাদ্য গুদামে কর্মরত। প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩ নম্বর গুদামের দায়িত্বে নিয়োজিত এ কর্মকর্তা ওজনে কম দেয়ার মাধ্যমে চাল চুরিতে সিদ্ধহস্ত। তবে তিনি একা নন। সরকারি চালের এ চৌর্যবৃত্তিতে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী উপ-খাদ্য পরিদর্শক মর্যাদার আরেক কর্মকর্তা। তার নাম মোহাম্মদ হোসেন মামুন। তিনি ১৩ নম্বর গুদামের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তবে এ দুই কর্মকর্তার উপরে আরও বড় চোর আছেন।

র‌্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়, খাদ্য পরিদর্শক পাপিয়া সুলতানা গুদামের ওজন সেতুর দায়িত্বে নিয়োজিত। তাই তাকে বাদ দিয়ে চুরি সম্ভব নয়। পাপিয়া নিজেও চাল চুরিতে সিদ্ধহস্ত। চোর সিন্ডিকেটের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চাল চুরির অভিনব উপায় বের করেন। গুদামের নির্ধারিত ডিজিটাল ওজন সেতু থাকলেও সেটি বেশিরভাগ সময় বিকল করে রাখেন তিনি। এরপর গুদামের পুরনো এবং বিকল অ্যানালগ ওজন সেতুর মাধ্যমে চাল ওজন করা হয়। বিকল মেশিনে ওজনে কম দিয়ে চাল চুরির অভিনব কৌশল রপ্ত করেছেন এ কর্মকর্তা। এভাবে বিকল মেশিনে চাল ওজন তার আরেকটি কৌশলী ফাঁদ। কারণ পরে ওজনে কম দেয়ার বিষয়টি ধরা পড়লে যাতে সোজাসাপ্টা বলে দিতে পারেন- ‘মেশিন নষ্ট থাকায় তিনি বুঝতে পারেননি।’ প্রতিবেদনে বলা হয়, পাপিয়া সুলতানার পোস্টিং দোহার উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে হলেও তিনি তেজগাঁও খাদ্য গুদাম ছাড়তে রাজি নন। তাই তিনিও সংযুক্তি নিয়ে তেজগাঁওয়ে কর্মরত আছেন। তবে শুধু গুদাম বা ওজন শাখার কর্মকর্তাদের যোগসাজশে চাল চুরি সম্ভব নয়। গুদাম থেকে চাল বের করতে হলে আরও কয়েকটি শাখার সহযোগিতা দরকার হয়। এর মধ্যে ফটক শাখা অন্যতম। তাদের সহায়তা ছাড়া চোরাই চাল গুদাম থেকে বের করা অসম্ভব। র‌্যাবের তথ্যানুসন্ধানে বেরিয়ে আসে- চাল চোর সিন্ডিকেটে নাম লিখিয়েছেন ফটক শাখার দায়িত্বে নিয়োজিত খাদ্য পরিদর্শক ইউনুছ আলী মণ্ডল। তিনি কাগজপত্রে তারিখ পরিবর্তনের মাধ্যমে চোরাকারবারিদের সহায়তা করেন। ৫ সেপ্টেম্বর দুটি চাল ভর্তি ট্রাক বের হয় রাত ৮টায়। কিন্তু চোর সিন্ডিকেটের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইউনুছ আলী তার রেজিস্টারে ট্রাক বের হওয়ার সময় লেখেন বিকাল সাড়ে ৪টা। তেজগাঁও খাদ্য গুদামের প্রধান দারোয়ান মো. হারেজও কম যান না। বাইরের চাল চোরাকারবারিদের সঙ্গে গুদামের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগাযোগ ঘটিয়ে দেয়ার দায়িত্ব তার। অর্থাৎ তিনি চোরাই চালের কাস্টমার জোগানদাতা। নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কিছুদিন আগে তাকে তেজগাঁও থেকে অন্যত্র বদলিও করা হয়। কিন্তু তিনি সেখানে যোগদান না করে বহালতবিয়তে আছেন। ওদিকে চাল চুরির পর লুকিয়ে রাখার কাজটি করেন উপ-খাদ্য পরিদর্শক আবু সাঈদ। তিনি তেজগাঁওয়ের ৪ ও ৩৪ নম্বর গুদামের ইনচার্জ।

র‌্যাব জানায়, কিছুদিন আগে আনসারের জন্য বরাদ্দ চালের একটি বড় অংশ ওজনে কম দেয়ার মাধ্যমে চুরি করা হয়। এ চোরাই চাল রাখা হয় আবু সাঈদের গুদামে। এছাড়া তার অধীনে থাকা দুটি গুদাম পরীক্ষা করে বড় ধরনের অনিয়ম পাওয়া যায়। দেখা যায়, এ দুটি গুদামের নির্ধারিত মজুদের চেয়ে অন্তত ১৫০ টন চাল কম রয়েছে।

সূত্র জানায়, দুদকে পাঠানো তালিকার ৭ নম্বরে থাকা উপ-খাদ্য পরিদর্শক আবদুল কাদের বকসি বিপুল বিত্তবৈভবের সন্ধান পাওয়া গেছে। তিনি ৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে তেজগাঁও খাদ্য গুদামের সবচেয়ে লাভজনক শাখা হিসেবে পরিচিত স্টক শাখায় দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া তিনি যথাক্রমে ১ ও ২ নম্বর গুদামেরও ইনচার্জ। র‌্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবদুল কাদের বক্সি চাল কালোবাজারির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। র‌্যাবের তল্লাশিতে তার অধীনস্থ ১ নম্বর গুদামে ২০ টন চাল কম পাওয়া যায়। অবৈধ উপায়ে তিনি বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন। চাল চুরির অবৈধ টাকায় তিনি রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অভিজাত ফ্ল্যাট কেনেন। রাজকীয় আসবাবে ঠাসা এ ফ্ল্যাটে তিনি বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন। এমনকি গুদামের ভেতরেও গভীর রাত পর্যন্ত তিনি নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।

যেভাবে ধরা পড়ে চুরি : ঢাকা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবু হোসেন বাবলা তার এলাকার দুস্থ, অসহায় ও দুর্যোগ কবলিত পরিবারের জন্য ত্রাণ হিসেবে সরকারি চালের বরাদ্দ চেয়ে কয়েক মাস আগে আধা সরকারি পত্র (ডিও) দেন। ২৫ অক্টোবর তার ডিওর পরিপ্রেক্ষিতে ৩০ টন চাল বরাদ্দ দেয় ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর। বরাদ্দ পাওয়ার পর ৫ সেপ্টেম্বর বরাদ্দকৃত চাল আনতে তেজগাঁও খাদ্য গুদামে যান এমপি বাবলার প্রতিনিধি হায়দার আলী। ৩০ টন চাল আছে বলে তেজগাঁও খাদ্য গুদাম থেকে তাকে দুটি ট্রাক বুঝিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু ট্রাকে চালের বস্তা কম দেখে হায়দার আলীর সন্দেহ হয়। তিনি বুঝতে পারেন নির্ধারিত চালের চেয়ে অনেক কম চাল দিয়ে তাকে ট্রাক বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে। একপর্যায়ে তিনি খাদ্য গুদামের কর্মকর্তাদের কাছে তার সন্দেহের কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘প্রতেক্যটি বস্তায় আপনারা চাল কম দিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে।’ অভিযোগ পেয়ে ট্রাক দুটি খাদ্য গুদামের ওজন সেতুতে তোলা হয়। দেখা যায় দুটি ট্রাকেই কম চাল রয়েছে। ওজনে কারচুপি ধরা পড়ে যাওয়ার পর গুদামের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দ্রুত বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেন। এজন্য তারা একটি ট্রাকে ৭ বস্তা এবং অপর ট্রাকে ৪ বস্তা করে মোট ১১ বস্তা চাল তুলে দেন। ততক্ষণে গুদাম কর্মকর্তাদের যোগসাজশে চাল চুরির ঘটনা গোপনে র‌্যাবের কাছে পৌঁছে যায়।

সূত্র জানায়, গোপন সংবাদ আসার পর তাৎক্ষণিক গুদামের বাইরে অবস্থান নেয় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলমের নেতৃত্বে র‌্যাব-২ এর একটি দল। গুদাম থেকে দুটি ট্রাক বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা আটক করে র‌্যাব। এরপর ট্রাক দুটি গুদামে নিয়ে কাগজপত্র যাচাই করতে শুরু করেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। গুদামের ম্যানেজার হুমায়ুন কবিরকে ডেকে পাঠানো হয়। কিন্তু হুমায়ুন কবির লাপাত্তা। তেজগাঁও খাদ্য গুদামে র‌্যাবের অভিযানের খবর ততক্ষণে ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে রাতেই ঘটনাস্থলে একে একে আসতে শুরু করেন খাদ্য অধিদফতরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে শেষ পর্যন্ত হুমায়ুন কবিরও ঘটনাস্থলে হাজির হন। কিন্তু গভীর রাত হয়ে যাওয়ায় ট্রাক থেকে প্রতিটি বস্তা নামিয়ে ওজন করা সম্ভব হয়নি। রাত সাড়ে ১১টায় জব্দ তালিকা তৈরি করে চালসহ দুটি ট্রাক তেজগাঁও খাদ্য গুদামের ম্যানেজারের জিম্মায় দিয়ে আসে র‌্যাব। পরদিন দুপুর ২টায় খাদ্য অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ট্রাকের চাল নামিয়ে প্রতিটি বস্তা পৃথকভাবে ওজন করা শুরু হয়।

র‌্যাব জানায়, বস্তা খুলে ওজন করা শুরু হলে গুদামের কয়েকজন কর্মকর্তা রীতিমতো কাঁপতে শুরু করেন। কারণ প্রায় প্রতিটি বস্তাতেই চাল কম। কোনো বস্তায় ১২ কেজি কোনো বস্তায় ১৪ কেজি, আবার কোনো বস্তায় চাল আছে মাত্র ২০ কেজি। অথচ প্রতি বস্তায় চাল থাকার কথা ৩০ কেজি করে। মোট বরাদ্দ অনুযায়ী দুই ট্রাকে ৩০ হাজার কেজি চাল থাকার কথা। কিন্তু ত্রাণের জন্য বরাদ্দ ৩০ টন চালের প্রায় অর্ধেকই চুরি করেন গুদাম কর্মকর্তারা। প্রতিটি বস্তা ধরে ওজন করতে গিয়ে দেখা যায়, কারচুপির মাধ্যমে গুদামের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ৯ হাজার ৪৯৫ কেজি চাল চুরি করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক র‌্যাবের একজন কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে বলেন, চাল চুরির এমন ঘটনা হাতেনাতে ধরা পড়ার পর দুটি ট্রাক জব্দ করা হয়। এরপর কর্তব্যরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট গুদামে রক্ষিত বিভিন্ন নথিপত্র পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেন। কয়েকটি কাগজপত্র পরীক্ষা করতে গিয়ে আরও একটি বড়সড় চুরির ঘটনা ধরা পড়ে।

সূত্র জানায়, র‌্যাবের তল্লাশিতে আনসার ও ভিডিপিকে ২৫৮ টন চাল সরবরাহের একটি রেকর্ড পাওয়া যায়। দেখা যায় ৩, ৩৪ ও ৩৯ নম্বর গুদাম ঘর থেকে এ চাল সরবরাহ করা হয়েছে। গুদামের প্রধান ফটকে রক্ষিত গেট পাস রেজিস্টারেও এ চাল বের হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু আনসারকে এত বিশাল চাল সরবরাহের বিষয়টি নিয়ে র‌্যাবের সন্দেহ হয়। ঘটনাস্থল থেকেই ২৫৮ টন চাল প্রাপ্তির বিষয়ে আনসার ও ভিডিপির উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করে র‌্যাব। কিন্তু আনসারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২৫৮ টন নয় তারা মাত্র ৭৫ টন চাল পেয়েছেন। আনসারের জন্য বরাদ্দকৃত চাল সরবরাহে এমন জালিয়াতি ধরা পড়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে র‌্যাব। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, ২৫৮ টন চালের মধ্যে ৭৫ টন দেয়া হলে বাকি ১৮৩ টন চাল কোথায় আছে। কিন্তু এ বিষয়ে উপস্থিত কর্মকর্তাদের কেউই সদুত্তর দিতে পারেননি। পরে জানা যায়, আনসারের জন্য বরাদ্দকৃত চালের মধ্য থেকে ১৮৩ টন চাল ৩৪ নম্বর গুদামে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এমন তথ্য পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ৩৪ নম্বর গোডাউনটি সিলগালা করে দেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে তেজগাঁও খাদ্য গুদামের ম্যানেজার হুমায়ুন কবির এ প্রতিবেদককে বলেন, র‌্যাবের অভিযানের পর মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদফতর থেকে দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে খাদ্য পরিদর্শক পাপিয়া সুলতানা, উপ-খাদ্য পরিদর্শক নান্নু মিয়া ও মোহাম্মদ মামুন হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অন্যদের বিষয়েও তদন্ত চলছে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, র‌্যাব যেসব অভিযোগ এনেছে তার সবগুলো সঠিক নয়। গুদামের ভেতর অনৈতিক কাজ ও বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে উপ-খাদ্য পরিদর্শক আবদুুল কাদের বকসি শুক্রবার রাতে এ প্রতিবেদককে বলেন, এসব অভিযোগ মোটেও সঠিক নয়। তবে গুদামের ক্লাবে জুয়া খেলা হয় এমন কথা তিনি বিভিন্ন সময় শুনেছেন। কিন্তু তিনি কখনও এসব কাজে জড়িত ছিলেন না। -যুগান্তর

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

এইডস ঝুঁকিতে রহিঙ্গারা 

5888

কক্সবাজার : মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা নারীদের মধ্যে ৬ জন এইচআইভি পজিটিভ রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। চিকিৎসকদের ধারণা, আরও অনেকেই হয়তো এই মরণব্যাধী রোগ বহন করছে।

এ বিষয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. শাহীন আবদুর রহমান এ প্রতিবেদককে বলেন, এইচআইভি আক্রান্তদের আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কয়েক দিনেই ছয়জন রোগী পাওয়া গেছে। তার মানে অন্য রোহিঙ্গা নারীদের মধ্যেও আরও রোগী থাকতে পারে।

জানা গেছে, গত ১৬ সেপ্টম্বের উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে দুই নারীর এইচআইভি রোগে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। ২৫ সেপ্টেম্বর একই ক্যাম্পের আরও দুই নারীর এইচআইভি পজিটিভ ধরা পড়ে। পরে শরণার্থী ক্যাম্পের আরও দুজনের এই রোগ ধরা পড়ে। এ ছয়জনের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। অন্য ৫ জনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের মধ্যে এইচআইভি আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করতে কাজ করছে বেসরকারি সংস্থা আশার আলো সোসাইটি ও কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল।

আশার আলো সোসাইটির কাউন্সিলর প্রভাস পাল এ প্রতিবেদককে বলেন, কক্সবাজার সেন্টারে এ পর্যন্ত ছয়জন এইচআইভি পজিটিভ শনাক্ত করা হয়েছে।

গত কয়েকদিন উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার শরণার্থী ক্যাম্পের কয়েকজন রোহিঙ্গা নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা এইচআইভি বিষয়ে কিছুই জানেন না। মিয়ানমারে থাকতে তারা চিকিৎসাসেবা পেতেন না। ফলে তাদের রোগব্যাধী শনাক্ত হতো না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলার উখিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার চাই লাউ প্রু মারমা এ প্রতিবেদককে বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই।

এদিকে অভিযোগ উঠেছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে জোর করে কোনো কোনো নারীকে যৌন ব্যবসায় যুক্ত করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোহিঙ্গা নারীরা যৌন ব্যবসায় জড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি খারাপ হবে।

এ ব্যাপারে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান এ প্রতিবেদককে বলেন, রোহিঙ্গারা যাতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে সে জন্য চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি কার্যক্রম চালাচ্ছে র‌্যাব। -আমাদের সময়

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

সীমান্তে আরও কঠোর মিয়ানমার 

872

ঢাকা : আন্তর্জাতিক চাপকে তোয়াক্কা না করে সীমান্তে আবারও কঠোর অবস্থানে মিয়ানমার। নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার পাশাপাশি কোথাও কোথাও তারে সংযোগ দেওয়া হচ্ছে বিদ্যুৎ।

রাতের আঁধারে সীমান্তজুড়েই পুঁতে রাখা হচ্ছে স্থলমাইন। উদ্দেশ্য, বাংলাদেশ থেকে কোনো রোহিঙ্গা শরণার্থী

যেন মিয়ানমারে পুশইন করতে না পারে। এখনো রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলোয় প্রতিদিনই সকালে-বিকালে দেওয়া হচ্ছে আগুন। কখনো কখনো আগুনের তীব্রতা বাড়াতে হেলিকপ্টার থেকে ফেলা হচ্ছে দাহ্য পদার্থ। গতকাল উখিয়ার পালংখালী, বান্দরবানের ঘুমধুম, জলপাইতলী, তুমব্রুসহ সীমান্তবর্তী কয়েকটি এলাকা সরেজমিন ঘুরে এ চিত্র পাওয়া গেছে। বেলা ১১টায় ঘুমধুমে বিজিবির ৩৪ ব্যাটালিয়ন ক্যাম্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ওই পারে মিয়ানমারের সীমান্তজুড়েই সেনাবাহিনী ও বিজিপি অবস্থান নিয়েছে। সেখানে কোনো কোনো স্থানে কাঁটাতারের বেড়া পুনর্নির্মাণ করছে তারা। একই চিত্র দেখা গেছে জলপাইতলীতেও। সেখানেও নতুন কাঁটাতারের বেড়া লক্ষ্য করা যায়। দুপুর ১২টার দিকে তুমব্রু সীমান্তে দেখা যায়, মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও বিজিপির উপস্থিতিতে সাত-আটজন শ্রমিক সীমান্তে নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করছেন। এ সময় সেনাবাহিনীর সদস্যরা ওই এলাকায় সীমান্তজুড়েই অবস্থান নেয়। বিজিপিকেও শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করতে দেখা যায়। পাশেই পজিশন নিয়ে অবস্থান করছিল মিয়ানমার সেনা সদস্যরা। এপারে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশও (বিজিবি) ছিল সতর্কাবস্থায়। প্রায় দুই ঘণ্টা তুমব্রু সীমান্তে দেখা যায় মিয়ানমার বাহিনীকে।

এদিকে বিকালে পালংখালীর সীমান্তবর্তী কয়েকটি গ্রামে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। তুমব্রু সীমান্তে স্থানীয়রা জানান, চার দিন ধরেই মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপি সীমান্তে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ ও সীমান্ত পিলার বসিয়ে রোহিঙ্গা ও অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানোই তাদের উদ্দেশ্য। মিয়ানমার সীমান্তে এসব কাজে সেনাবাহিনী ও বিজিপিকে দৃশ্যমান দেখা গেছে। নির্মাণসামগ্রী বহনের যানবাহনও দেখা যায়। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা কোনো রোহিঙ্গা যেন দেশটিতে ফিরে যেতে না পারে সেজন্যই সতর্কাবস্থায় তারা। এজন্যই নষ্ট হয়ে যাওয়া কাঁটাতারের বেড়া এবং ভেঙে যাওয়া পিলার পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে।

জানা গেছে, উখিয়া থেকে নাইক্ষ্যংছড়ির চাকঢালা, আশারতলী, বড় ছনখোলা, ফুলতলী, লেবুছড়িসহ সীমান্তজুড়েই পুঁতে রাখা হচ্ছে স্থলমাইন। এরই মধ্যে কয়েকটি স্থানে স্থলমাইন বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন রোহিঙ্গা ও বাঙালি মারা গেছে। সীমান্তের কাঁটাতার ও নো-ম্যান্স-ল্যান্ডের মাঝামাঝি এসব স্থলমাইন পুঁতে রাখা হচ্ছে। যেগুলো বিকল বা বিস্ফোরিত হয়ে যায়, সেগুলোর জায়গায় আবারও নতুন করে মাইন পুঁতে রাখা হচ্ছে। সম্প্রতি তুমব্রু সীমান্তে নো-ম্যান্স-ল্যান্ডের কাছাকাছি এলাকা থেকে কয়েকটি তাজা মাইন তুলে নিয়ে আসে কয়েকজন রোহিঙ্গা কিশোর। তারা জানায়, নো-ম্যান্স-ল্যান্ডের কাছাকাছি একটি পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে একজন রোহিঙ্গা পুরুষ ও একটি গরু মারা যায়। এ নিয়ে রোহিঙ্গা শিবিরে ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করে। একপর্যায়ে কয়েকজন কিশোর রোহিঙ্গা ওই এলাকায় পুঁতে রাখা কয়েকটি স্থলমাইন তুলে নিয়ে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। নাইক্ষ্যংছড়ির বড় ছনখোলায়ও সম্প্রতি হানিফ নামে এক বাঙালি নো-ম্যান্স-ল্যান্ডে থাকা রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দিতে গিয়ে মিয়ানমার বাহিনীর পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে নিহত হন।

বান্দরবানের আশারতলী ক্যাম্পে থাকা শামসুল ইসলাম জানান, ওই এলাকায় সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ায় মাঝেমধ্যেই বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়, যাতে ভয়ে কোনো রোহিঙ্গা তাদের মিয়ানমারে ফেলে আসা বসতবাড়িতে আর ফিরে যেতে না পারে। তিনি জানান, সীমান্তের ওই পারে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা গুটিকয় রোহিঙ্গাও ভয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে পারছে না। এদিকে গতকাল বিকালেও পালংখালীর সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গাপাড়াগুলোয় নতুন করে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। এ সময় হেলিকপ্টার থেকে দাহ্য পদার্থও ফেলা হয়। এপারে বিজিবি ক্যাম্প থেকে তা স্পষ্ট দেখা যায়। এর আগেও ওই পাড়াগুলোয় কয়েক দফা আগুন জ্বলতে দেখা যায়। রোহিঙ্গাশূন্য এসব পাড়ায় দফায় দফায় আগুন দিয়ে আরও ভীতি সঞ্চারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা।

একইভাবে শাহপরীর দ্বীপের বিপরীতে নাইক্ক্যানদিয়া, শিকদারপাড়া, উকিলপাড়াসহ বেশ কয়েকটি গ্রামেও কয়েক দিন ধরে আগুন জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। ওই এলাকার গাছপালা, এমনকি পাহাড়ের একটি অংশও পুড়ে লালচে আকার ধারণ করেছে। সোমবার হোয়াইক্যং এলাকা পরিদর্শনে এসে বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন বলেন, ‘মিয়ানমারের উসকানিতে সাড়া দিলে রোহিঙ্গাদের মানবিক সংকটের বিষয়টি আড়াল হয়ে যেত। মিয়ানমারের হেলিকপ্টার আমাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। একটা দেশ এটা করতে পারে না। আমরা ধৈর্য ধরেছি। তবে আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত আছি। সীমান্ত সুরক্ষার জন্য যা করা প্রয়োজন সব করা হবে। আমরা আক্রান্ত না হলে কোনো অ্যাকশনে যাব না। ’

নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক কাল : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর হত্যা-নির্যাতনের বিষয়ে আগামীকাল বৃহস্পতিবার বৈঠকে বসতে যাচ্ছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে পরিষদের ১৫ সদস্য রাষ্ট্রকে ব্রিফ করবেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। তবে আনুষ্ঠানিক ওই বৈঠকের আগে গতকাল নিরাপত্তা পরিষদের একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে মিয়ানমার পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ব্রিফ করা হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি এসব তথ্য জানিয়েছে। এদিকে নতুন শরণার্থী ৪ লাখ ৮০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, কাজাখস্তান, সেনেগাল ও সুইডেনের অনুরোধে নিরাপত্তা পরিষদের এবারের বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইতিমধ্যেই জাতিসংঘ রাখাইনে চলা সেনা অভিযানকে ‘জাতিগত নিধন’ বলে অভিহিত করেছে। গত সপ্তাহে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ একে ‘গণহত্যা’ বলে আখ্যা দেন। তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেফ তাইয়েপ এরদোগান রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নির্যাতনের কঠোর সমালোচনা করেছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা ইস্যুর স্থায়ী সমাধানে সাধারণ পরিষদে উপস্থাপন করেছেন পাঁচ দফা। এ মাসের শুরুতে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এক বিরল পদক্ষেপ নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। এতে মিয়ানমার পরিস্থিতি মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে বলে উদ্বেগ জানিয়ে দেশটির শান্তি-নিরাপত্তার অবনতি হওয়ার আশঙ্কা জানান।

অভিযানের ছবি ‘লুকিয়েছে’ মিয়ানমার সেনাবাহিনী :  রাখাইন রাজ্যে অভিযানের ছবি ফেসবুক তোলার পর এখন তা মিয়ানমারের সেনাবাহিনী লুকিয়ে ফেলেছে বলে রয়টার্সের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। রাখাইন রাজ্যে চালানো অভিযানে মুসলিম রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে হত্যা এবং বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের সমালোচনায় এখন মুখর। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর এই দমনাভিযান খতিয়ে দেখতে জাতিসংঘের উদ্যোগের মধ্যে গতকাল রয়টার্স এক প্রতিবেদনে ফেসবুক থেকে ছবিগুলো লুকিয়ে ফেলার বিষয়টি ধরা পড়ার কথা জানায়। রয়টার্স বলছে, মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের অফিসিয়াল ফেইসবুক পাতায় ১ অগাস্ট থেকে ২৯ অগাস্ট পর্যন্ত সময়ে পোস্ট করা ছবিগুলো গায়েব করে ফেলা হয়েছে। ওই ফেইসবুক পাতায় ছবিগুলো এখন দেখা না গেলেও নির্দিষ্ট দিনের কিংবা কি ওয়ার্ড সার্চ দিয়ে ছবিগুলো পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

অন্যদিকে, মানবাধিকার সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা নিপীড়নের ঘটনায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ এবং দেশটির সঙ্গে যেসব দেশের সামরিক সম্পর্ক রয়েছে তা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে।

রোহিঙ্গা নির্যাতনের ইস্যুতে মিয়ানমানের নেত্রী অং সান সু চির ভূমিকায় মানবাধিকার গ্রুপগুলো হতাশা জানিয়েছে। সু চিকে সামরিক জান্তা ১৫ বছর ধরে গৃহবন্দী করে রাখার সময় তার মুক্তির জন্য এসব সংগঠন সোচ্চার ছিল। এমন প্রেক্ষাপটে চলতি মাসের শুরুতে নিরাপত্তা পরিষদ এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধ করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। -আমাদের সময়

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

মিয়ানমারের রাখাইনে হিন্দুদের গণকবর 

252

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মিয়ানমারের সেনাবাহিনী বলছে, তারা রাখাইন প্রদেশে একটি গণকবর খুঁজে পেয়েছে, যেখানে শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মৃতদেহ রয়েছে। সেনাবাহিনী বলছে, তাদের ভাষায় রোহিঙ্গা মুসলমান ‘জঙ্গিরা’ এইসব হিন্দুদেরকে হত্যা করেছে।

এলাকাটিতে চলাচল নিয়ন্ত্রিত থাকবার কারণে সেনাবাহিনীর এই অভিযোগ যাচাই করা সম্ভব হয়নি। রাখাইনে গত পঁচিশে অগাস্ট থেকে সহিংসতা শুরু হবার পর এখন পর্যন্ত চার লাখ ত্রিশ হাজারের বেশী রোহিঙ্গা মুসলমান পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওয়েবসাইটে পোস্ট করা এক বিবৃতি থেকে যানা যাচ্ছে, উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন প্রদেশের একটি গ্রাম থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা একটি গণকবর খুঁড়ে মোট আটাশটি মৃতদেহ বের করে এনেছে, এদের সবাই হিন্দু ধর্মাবলম্বী, বেশীরভাগই মহিলা।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার প্রধান ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি বিবিসিকে বলেছেন, নির্মম হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ এবং বাড়িঘর আগুনে জ্বালিয়ে দেয়ার কারণে রোহিঙ্গারা আতঙ্ক আর উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছে। রাখাইনে চলমান সহিংসতাকে ‘জাতিগত নিধন’ বলে বর্ণনা করেছে জাতিসংঘ। যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে মিয়ানমারের সরকার।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

রোহিঙ্গাদের ফেরাতে হবে 

823

ঢাকা : রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার জন্য মিয়ানমারকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মিয়ানমারকে আমরা বলেছি, রোহিঙ্গারা আপনাদের নাগরিক, তাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তাদেরকে নিরাপদ রাখতে হবে। তাদের আশ্রয় দিতে হবে। তাদের ওপর জুলুম-অত্যাচার চলবে না। তিনি বলেন, মানবিক কারণে নির্যাতিতদের আশ্রয় দেয়া হয়েছে। দেশের ১৬ কোটি মানুষ খাবার পাচ্ছে। প্রয়োজনে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে এই খাবার ভাগাভাগি করে খাব।  গতকাল নিউ ইয়র্কের মেরিয়ট মার্কুইস হোটেল বলরুমে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ আয়োজিত অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিটি সূচকে বাংলাদেশ আশাপ্রদ অবস্থান বজায় রেখেছে এবং দেশটি এখন বিশ্বে একটা মর্যাদার আসনে রয়েছে। এই বিষয়টি বিদেশে তুলে ধরা প্রয়োজন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী একই সঙ্গে দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতি আগামী সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়ার জন্য জনগণকে উৎসাহিত করারও আহ্বান জানান।  তিনি বলেন, আপনারা দেশে যান এবং আমাদের উন্নয়নের কথা প্রচার করুন। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়ার জন্য জনগণকে বুঝাতে আমাদের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কথা ব্যাপকভাবে প্রচার করতে আপনাদেরকে তাদের কাছে যেতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরা সর্বদা সকল সংকটে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে তাদের অবদান অব্যাহত রেখেছে।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ও আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন- আওয়ামী লীগ যুক্তরাষ্ট্র শাখার সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান। আওয়ামী লীগ যুক্তরাষ্ট্র শাখার যুগ্ম সম্পাদক নিজাম চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক চন্দন দত্ত ও আবদুর রহিম বাদশা, নিউ ইয়র্ক শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জাকারিয়া চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন, স্টেট আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন আজমল, মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী মমতাজ শাহনাজ, সদস্য রেজাউল করিম চৌধুরী এবং সহযোগী সংগঠনের সভাপতিগণ বক্তব্য রাখেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি, আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ ও কেন্দ্রীয় নেতা এসএম কামাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন।

গত ৮ বছরে দেশের আর্থ-সামাজিক সাফল্যের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ সময়ে দেশের যে অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে তা নজিরবিহীন। তিনি বলেন, যেহেতু দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করার একমাত্র হাতিয়ার হচ্ছে শিক্ষা, সেজন্য তার সরকার শিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।

‘ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তবতা’ এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বছরের শেষদিকে মহাকাশে নিজেদের স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হবে। তিনি বলেন, নগর ভিত্তিক উন্নয়নের পরিবর্তে তাঁর সরকার গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং এই লক্ষ্য অর্জনের অংশ হিসেবে ২০২১ সালের মধ্যে প্রত্যেক বাড়ি বিদ্যুতের আওতায় আনা হবে। শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিএনপি আবার ক্ষমতায় আসলে বাংলাদেশ সীমাহীন দুর্নীতি ও দুঃশাসনের মধ্যে নিমজ্জিত হবে’। অনেক রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণের মুক্তি ও অধিকার আদায়ের জন্য জাতির পিতা তাঁর সারাটি জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। একমাত্র বাংলাদেশের জনগণের জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন করার জন্য বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের সকল সুখ ও আকাঙ্ক্ষাকে বিসর্জন দিয়েছেন।

স্বাধীনতার পর দেশ যখন সম্পূর্ণ ধ্বংসযজ্ঞ গুদামে খাদ্য সংকট, যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল ও সরকারি কোষাগার প্রায় শূন্য, তখন বঙ্গবন্ধু দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনের দায়িত্ব নেন। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ৯ মাসের মধ্যে একটি সাবেক প্রদেশ মর্যাদার দেশকে সার্বভৌম দেশ হিসেবে পরিণত করার জন্য সংবিধান ও বেশির ভাগ অবকাঠামো নির্মাণসহ প্রয়োজনী সকল আইন ও নীতি নির্ধারণ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু স্বল্প সময়ের মধ্যে যে ব্যাপক কাজ করেছেন, তা কোন রাজনৈতিক নেতার পক্ষে সম্ভব ছিল না। প্রশাসনিক দক্ষতা, দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের চেতনায় বঙ্গবন্ধু তাঁর দায়িত্ব পালন করে জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হতে ওআইসি’র প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান: মিয়ানমারে দুর্দশাগ্রস্ত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হতে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি)’র প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ফোরামের যেকোনো উদ্যোগে যোগ দিতে বাংলাদেশ প্রস্তুত রয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনের ফাঁকে গতকাল (যুক্তরাষ্ট্র সময় মঙ্গলবার) দিনের শেষদিকে এখানে ইউএনজিএ সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা বিষয়ে ওআইসি’র কন্ট্রাক্ট গ্রুপকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সংকট সমাধানে আপনাদের ঐক্য প্রদর্শন করুন। তিনি বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সামরিক অভিযানে মুসলিম ভাই ও বোনেরা জাতিগত নির্মূলের মুখোমুখি হওয়ায় রোহিঙ্গাদের সর্বকালের সবচেয়ে বৃহত্তম দেশত্যাগের ঘটনা ঘটেছে।

প্রধানমন্ত্রী ওআইসি নেতাদের অবহিত করেন যে, গত ২৫শে আগস্টের পর থেকে স্থল ও নদীপথে সীমান্ত অতিক্রম করে ৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে, এদের ৬০ শতাংশই শিশু। এটি একটি অসহনীয় মানবিক বিপর্যয়। আমি নিজে তাদের অবস্থা পরিদর্শন করেছি এবং আমি তাদের বিশেষ করে নারী ও শিশুর ভয়ঙ্কর দুঃখ-দুর্দশার ঘটনার বর্ণনা শুনেছি। আমি আপনাদের সবাইকে বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি এবং এখানে এসে মিয়ানমারের বর্বরতার ব্যাপারে তাদের কাছ থেকে শুনুন। তিনি বলেন, মিয়ানমার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলে প্রচারণা চালাচ্ছে, অবশ্যই তা বন্ধ করতে হবে এবং দেশটিকে অবশ্যই রোহিঙ্গাদেরকে তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করতে হবে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে ফেরত পাঠানো পর্যন্ত ভ্রাতৃপ্রতীম মুসলিম দেশগুলো থেকে বাংলাদেশকে মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। অন্যান্যের মধ্যে ওআইসি মহাসচিব ড. ইউসেফ আল ওথাইমেন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এ সময় বলেন, ‘রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সকল ধরনের নির্মমতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে অবশ্যই তাদের স্বদেশে ফেরত নিতে হবে। তিনি নিরপরাধ নাগরিক বিশেষ করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের সুরক্ষা দিতে মিয়ানমারের ভেতরে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ তৈরির প্রস্তাব দেন এবং ‘অনতিবিলম্বে নিঃশর্তভাবে এবং সম্পূর্ণরূপে’ কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গারা ‘বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী’ মিয়ানমারের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, সমস্ত ঐতিহাসিক দলিল প্রমাণ করে যে রোহিঙ্গারা কয়েক শতাব্দী ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বসবাস করে আসছে।

মিয়ানমার পরিকল্পনা মাফিক সংগঠিত ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের তাদের পৈতৃক নিবাস থেকে জোরপূর্বক বহিষ্কার করছে এবং নিকট অতীতে তারা দেশের স্বীকৃত সংখ্যালঘু গ্রুপের তালিকা থেকে প্রথম রোহিঙ্গাদের বাদ দেয়। তিনি বলেন, ১৯৮২ সালে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হয় এবং পরে তাদের নিজ দেশে ইন্টারনালি ডিসপ্লেস পার্সন’স (আইডিপি) ক্যাম্পে পাঠানো হয়। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ ‘জাতিগত নিধনের’ অবসান দেখতে চায়। ‘মুসলিম ভাই-বোনদের দুর্দশার অবসান হওয়া দরকার। এই সংকটের মূলে মিয়ানমার এবং মিয়ানমারেই এর সমাধান পাওয়া যাবে। -মানবজমিন

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

আরাকানের পথে পথে লাশ 

852

ঢাকা : হেলিকপ্টার থেকে বোমা ছোড়া হচ্ছে। গুলিও চলছে। বিপদ দেখে বুচিডংয়ের মনুপাড়ার রোহিঙ্গারা এক উঠানে জড়ো হয়ে পালানোর উপায় খুঁজছিল। হঠাৎ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গুলি। এ সময় অনেকে দৌড়ে পালিয়ে গেলেও বাকিদের ঘিরে ফেলে ২৫-৩০ জন আর্মি। তাদের মধ্যে মেয়েদের উঠান থেকে ধরে আশপাশের বিভিন্ন ঘরে নিয়ে যায় আর্মিরা। অনেক রোহিঙ্গাকে সেখানে হত্যাও করে। ‘

গতকাল সোমবার দুপুর ১টার দিকে উখিয়ার ট্যাংখালী এলাকায় এমন তথ্য দিচ্ছিলেন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নূরুল আমিন নামে এক রোহিঙ্গা যুবক। গত রবিবার রাতেই বাবা নূর আলী (৬৫) ও মা আনছার বেগমসহ নূরুল আমিনের পরিবারের ১০ জন শাহপরীর দ্বীপ সীমান্ত হয়ে তারা কুতুপালংয়ে আসেন।

নূরুল আমিন বলেন, ‘ব্যা জং নামে এক সেনা সদস্যের সন্তানকে বাসায় গিয়ে পড়াতেন মনুপাড়ার স্কুলশিক্ষক মো. সেলিম (৪০)। ওই শিক্ষককে ব্যা জং ওই প্রায় ৩০০ জনের মধ্যে নিজেই হত্যা করেছে।

গতকাল দুপুরে ট্যাংখালী থেকে ছোট বোনকে নিয়ে নয়াপাড়ার ক্যাম্প এলাকায় আসার সময় অটোরিকশা যাত্রী নূরুল আমিন সে দেশের সেনাবাহিনীর গণহত্যা, নির্যাতন-নিপীড়নের এসব কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘দৌড়ে পাশের একটি বাড়ির পেছনের ঝোপে লুকিয়ে থাকি। ওখান থেকে আমরা গণহত্যার ঘটনাটি দেখেছি। সন্ধ্যার দিকে সেনাবাহিনী চলে যাওয়ার পর আমার আব্বু বলেন, ওরা (আমার আত্মীয়স্বজন) এখানে আছে কি না চল দেখে আসি, সেখানে গিয়ে দেখি কেউ বেঁচে নেই। জাহেদ হোসেন (৫৫), তার ছেলে নূরুল ইসলাম (১৭) ও মো. সালাম (২০)। মৌলভি আবদুল খালেক (৮৫) ও তার ছেলে মো. সাদেকসহ আমাদের ১০ জন আত্মীয়কে গুলি করার পর জবাই করেছে। ১২ দিন বুচিডং ও মংডু জেলার কুন্দুপাড়া খাল, কুরমি খাল, নাফ নদী, কালা পাহাড়সহ (হাজার ফুট উচ্চ) তিনটি পাহাড় বেয়ে এ দেশে আসি। ’ দেরিতে আসা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মনে করেছিলাম কিছুদিন গেলে পরিস্থিতি শান্ত হবে। কয়েক দিন ধরে বাংলাদেশে আসার পথে বিভিন্ন স্থানে লাশ দেখেছি। অনেক এলাকায় লাশ পচে গন্ধ বের হচ্ছে। আমরা সোজা রাস্তা দিয়ে আসতে পারিনি। নালা, খাল, বিল, নদী ও পাহাড় বেয়ে আসার কারণে দেরি হয়েছে। ’

গতকাল বিকেল ৪টার দিকে টেকনাফ বাজারে একটি পেট্রল পাম্পের সামনে রাখাইনের মংডু থেকে আসা কয়েকজন রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা হয়েছে। রোহিঙ্গা নারী আমেনা বেগম বলেন, তার স্বামী (সাব্বির আহমদ) প্রাণভয়ে ওই দিক থেকে আসেননি। সেনাবাহিনী যুবকদের দেখলে গুলি করছে। তাই ওখানে পালিয়ে আছে। নজির আহমদের স্ত্রী ছমিয়া (২৫), হারুনুর রশিদের স্ত্রী ছামিয়াও একই কারণে স্বামীকে রেখে সন্তানদের নিয়ে এসেছেন বলে জানান।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পথে পথে এখন লাশ আর লাশ। কারো গলা কাটা, কারো হাত কাটা, কারো পা কাটা। বীভৎস লাশের স্তূপ পড়ে রয়েছে পথে-ঘাটে, নদী-নালায়, ধানক্ষেতে। তমবাজারের নাইসংপ্রাং গ্রাম থেকে দীর্ঘ ১২ দিন দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে পরিবারের ১৪ সদস্য নিয়ে গতকাল সকালে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা নাগরিক সত্তরোর্ধ মোহাম্মদ জাকারিয়া ও তার ছেলে মো. ওমর ফারুক এ তথ্য দেন। তাদের সঙ্গে কথা হয় উখিয়ার বালুখালী (নতুন) রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী আশ্রয়শিবিরে। গতকাল সকালে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উনচিপ্রাং পয়েন্ট দিয়ে তারা বাংলাদেশে আসেন। তারা জানান, মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও রাখাইন সন্ত্রাসীদের বর্বরতা ২৫ আগস্ট থেকে থেকে শুরু হলেও তা ছিল আনুষ্ঠানিকতা বা ঘোষণা দিয়ে। এরও আগে (প্রায় এক মাস আগে) থেকে সেনারা রাখাইন রাজ্যের তমবাজারের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত নাইসংপ্রাং গ্রামটি ঘিরে ফেলে। ওই সময় হত্যাযজ্ঞ শুরু না করলেও এলাকা ছেড়ে চলে যেতে নানাভাবে হুমকি ও মারধর করা হয়েছে তাদের।

বৃদ্ধ জাকারিয়া এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘সেনাবাহিনী ও রাখাইন সন্ত্রাসীরা আমার দুই ভাইকে গুলি ও জবাইয়ে হত্যার পর লাশ ধানক্ষেতে ফেলে দেয়। তাই আর আর দিনেরবেলায় সেনাবাহিনী ও রাখাইন সন্ত্রাসীদের চোখ এড়াতে পাহাড়েই অবস্থান করতে থাকি। প্রতিদিন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার পর দুর্গম পাহাড়ি পথ দিয়ে বাংলাদেশের পথে রওনা করতে থাকি। এভাবে কয়েক দিন হেঁটে আসার সময় পুত্রবধূর ভাই অনাহারে এবং আরেক সদস্য অসুস্থ হয়ে মারা পড়ে। ’

জাকারিয়া নিজেদের ভাষায় জানান, তমবাজারের নাইসংপ্রাং গ্রাম থেকে সড়ক বা নদীপথ দিয়ে বাংলাদেশে আসতে মাত্র দুই দিন সময় লাগে। কিন্তু সড়কপথে মিয়ানমার সেনা এবং রাখাইন সন্ত্রাসীরা অবস্থান করায় কৌশল পাল্টে দুর্গম পাহাড়ি পথ দিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিই জান খোয়ানোর ভয়ে। সেখানেও দুই ভাইকে রক্ষা করতে পারেননি। আবার পরিবারের আরো দুই সদস্যের একজন অনাহারে ও অন্যজন অসুস্থ হয়ে মারা যায়। ওমর ফারুক বলেন, ‘মগ সেনা ও সন্ত্রাসীরা আমাদের দুই চাচাকেও গুলিতে এবং কুপিয়ে হত্যা করে লাশ ধানক্ষেতে ফেলে দেয়। হয়তো গ্রামের নিখোঁজ থাকা অনেক নারী-পুরুষকেও একই অবস্থা করেছে তারা। ’

বাবা জাকারিয়া ও ছেলে ওমর ফারুকের আক্ষেপ, দীর্ঘ ১২ দিন দুর্গম পাহাড়ি পথ হেঁটে বাংলাদেশে আসতে পারলেও এখনো মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই হয়নি। একপর্যায়ে বৃদ্ধ জাকারিয়া চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলে ওঠেন—‘ওহ আল্লাহ, তোঁয়ার জমিনত আঁরে ইন কী দেহাইলা। ইন দেহাইবার আগে আরে মারি ক্যা ন ফেলঅ। ’ অর্থাত্ হে আল্লাহ, তোমার দুনিয়ায় এসব কী দেখলাম। এসব দেখার আগে আমাকে কেন মারলা না।

গতকাল দুপুর ১২টার দিকে উখিয়ার কুতুপালং থেকে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকা কক্সবাজারের টেকনাফ যাওয়ার পথে পথে দেখা যায় রোহিঙ্গাদের ভিড়। ওই দূরত্বের প্রায় ৫০ কিলোমিটার মূল সড়কের মোড়ে মোড়ে লাখো রোহিঙ্গাকে দেখা গেছে। ক্ষুধায় দিশাহারা এসব মানুষ ত্রাণ দেখলে সেখানে দৌড়ে আসছে। রাখাইনে এখনো রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা বন্ধ হয়নি তা আরো বেড়ে যাচ্ছে বলে সেখান থেকে আসা রোহিঙ্গারা জানায়। -কালের কণ্ঠ

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

‘পদত্যাগেই সু চির মঙ্গল’ 

5555

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনীর চলমান গণহত্যা দেখেও মুখে কুলুব এটে রাখার চেয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সু চির এখন পদত্যাগ করাই মঙ্গল বলে মনে করেন সু চির জীবনীগ্রন্থ লেখক পিটার পপহ্যাম।

তিনি বলেন, একটি অগণতান্ত্রিক সংবিধানের সঙ্গে আপসে যাওয়া সু চির জন্য একটি বড় ভুল। তিনি নিজেও এই সংবিধানকে পছন্দ করেন না। আজকের দিনে এটা সত্য যে, সু চি দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর বেসামরিক নাগরিক। কিন্তু তার পরও তিনি দেশের সরকারের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা তো দূরের, রোহিঙ্গা সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন না।

লেখক পিটার পপহ্যাম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সু চির দুর্বলতার পেছনে একাধিক ব্যাখ্যা থাকতে পারে। যার একটি অপরটির স্ববিরোধী। একটিতে বলা হচ্ছে, বৌদ্ধদের সঙ্গে তার মিল, তিনিও বৌদ্ধ। আর সে কারণে তার মধ্যেও ইসলাম সম্পর্কে বিদ্বেষ রয়েছে।

পপহ্যাম বলেন, সেনাবাহিনীকে চ্যালেঞ্জ জানানো দূরের, তিনি নিজেই এখন তাদের হাতের পুতুল। সেনাবাহিনীর বিধ্বংসী কাজের তিনিই প্রধান প্রশংসাকারী। সিনিয়র জেনারেল মিন অং হদ্মাইং রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বর্বরতা চালাচ্ছেন, আর তারই স্তুতি গেয়ে যাচ্ছেন সু চি।

পপহ্যাম মনে করেন, মিয়ানমারের কার্যত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে এবং বিশ্বে পরিচিত মিয়ানমারের একমাত্র মুখ হিসেবে তার দুর্বলতার একটা ব্যাখ্যা দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। খুবই দুঃখের বিষয়, সু চি গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল লড়াই করে এলেও রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর বর্বরতাকেই সমর্থন দিচ্ছেন সু চি।

সু চি বলছেন, রাখাইনে রোহিঙ্গারাই ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে। এসব কথায় বিশ্বে নিন্দার ঝড় উঠলেও তিনি নীরব। কেন এমন দুর্বল সু চি? এ প্রসঙ্গে পিটার বলেন, ২০১১ সালে তিনি বলেছিলেন, আগের জান্তা সরকারের সঙ্গে নির্বাচনে যেতে তিনি অস্বীকার করেছেন মূলত তাদের তৈরি সংবিধানের কারণেই। কারণ, ওই সংবিধান কেবল সেনাবাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্যকেই নিশ্চয়তা দিয়েছিল। তারা চাইলে যে কোনো সময় লাথি মেরে ফেলে দিতে পারত যে কোনো নির্বাচিত সরকারকে। কিন্তু এর পাঁচ মাস পরেই সুর পাল্টে ফেলেন। এর পেছনেও ছিল যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, বিশেষ করে ওবামার পক্ষ থেকে।

ওবামার তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ওই চাপ অব্যাহত রেখেছিলেন সু চির ওপর। শেষ পর্যন্ত তিনিও রাজি হলেন সেনাবাহিনীর খসড়া সংবিধানের অধীনে নির্বাচনে যেতে।

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

বাংলাদেশ-মিয়ানমার যুদ্ধে জড়াবে কি? 

999

ঢাকা : রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার কর্তৃক বারবার বাংলাদেশের আকাশসীমা লংঘনের জের ধরে দুই দেশ যুদ্ধে জড়াতে পারে কিনা -সেই প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম নিউজ উইক।

যুক্তরাষ্ট্রের এ সংবাদ সমায়িকীতে মিয়ানমার কর্তৃক কয়েক দফায় বাংলাদেশের আকাশসীমা লংঘন ও তার প্রতিবাদের বিষয় উল্লেখ করে এ প্রশ্ন তুলে ধরা হয়েছে।

মিয়ানমারের উসকানিমূলক এ ধরনের কাজের জন্য ‘অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি’ দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছে বাংলাদেশ। এ নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে; রোহিঙ্গা সংকটের জেরে যা এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়েছে।

রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে গত ২৫ আগস্ট রাখাইনে সেনাবাহিনীর অভিযান শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এই অভিযানে ‘জাতিগত নিধনের পাঠ্য বইয়ের’ উদাহরণ হয়ে থাকবে বলে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘ।

বাংলাদেশ বলছে, গত ১০, ১২ এবং ১৪ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের ড্রোন এবং হেলিকপ্টার তিন দফায় বাংলাদেশের আকাশসীমা লংঘন করেছে। এ অভিযোগে ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের দূতাবাসের শীর্ষ এক কর্মকর্তাকে তলব করে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।

শুক্রবার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলছে, বার বার এ ধরনের উসকানিমূলক কাজের জন্য গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকা। একইসঙ্গে এ ধরনের সার্বভৌমত্বের লংঘন যাতে আর না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে মিয়ানমারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

মিয়ানমারের সরকারের মুখপাত্র জ্য তে বলেছেন, বাংলাদেশের অভিযোগের ব্যাপারে তার কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে এর আগে বাংলাদেশের এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে মিয়ানমার।

জ্য তে বলেন, বাংলাদেশ যে তথ্য দিয়েছে- তা পরীক্ষা করে দেখবে মিয়ানমার। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনি বলেন, আমাদের দুই দেশ শরণার্থী সংকট মোকাবেলা করছে। ভালো বোঝাপড়ার মাধ্যমে আমাদের সমন্বয় প্রয়োজন।

গত ২৫ আগস্ট রাখাইনে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর এখন পর্যন্ত প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। রাখাইনে পুলিশের ৩০টি তল্লাশি চৌকি ও একটি সেনাক্যাম্পে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলায় ১২ পুলিশ নিহত হওয়ার পর ওই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।

দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী ও রাখাইনের বৌদ্ধ ভিক্ষুরা রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার জবাবে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ শুরু করে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষক ও রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছে, রোহিঙ্গা মুসলিমদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতেই সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের অভিযান চালাচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনী ও বৌদ্ধ ভিক্ষুরা।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে যোগ দিতে শনিবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা ত্যাগ করেছেন। প্রত্যেক রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে ও ‘জাতিগত নিধন’ বন্ধ করতে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগে জাতিসংঘের এই অধিবেশনের আহ্বান জানাবেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

রাখাইনে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুটেরাস ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। জাতিসংঘ মহাসচিব বলছেন, রাখাইনে জাতিগত নিধন চালাচ্ছে মিয়ানমার।

তবে মিয়ানমার এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলছে, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (এআরএসএ) বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ক্লিয়ারেন্স অপারেশন পরিচালনা করছে আইনশৃংখলা বাহিনী। গত ২৫ আগস্ট পুলিশি তল্লাশি চৌকি ও সেনা ক্যাম্পে হামলার দায় স্বীকার করেছে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের এই সংগঠন। গত বছরের অক্টোবরে রাখাইনে একই ধরনের হামলার অভিযোগ ছিল সংগঠনটির বিরুদ্ধে।

তবে এআরএসএ বলছে, তারা রোহিঙ্গাদের অধিকারের জন্য লড়াই করছেন। একইসঙ্গে বিদেশি জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তাদের কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছেন।

মিয়ানমারের সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লেইং বলেছেন, ২৫ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত ৯৩ বার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিদ্রোহীরা তাদের ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা করেছে।

এদিকে বেসামরিক ব্যক্তিদের সুরক্ষায় মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। উপমার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্যাট্রিক মারফি আগামী সপ্তাহে মিয়ানমার সফরে আসার কথা রয়েছে। তবে চীন মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংসতার ঘটনাকে সন্ত্রাসবাদ দমনে দেশটির অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপে সমর্থন জানিয়েছে। একইসঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদেও মিয়ানমারের পক্ষে সাফাই গেয়েছে চীন। -যুগান্তর

Share This:

এই পেইজের আরও খবর

এখনও আগুন জ্বলছে রাখাইন রাজ্যে 

4578

ঢাকা : মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যে এখনও আগুন জ্বলছে। শুক্রবারও রোহিঙ্গাদের গ্রামে আগুন দিয়েছে দেশটির সেনা সদস্যরা। কমপক্ষে দুটি গ্রাম থেকে আগুনের লেলিহান শিখা এবং  ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে এদিন কক্সবাজারের টেকনাফে ঢল নেমেছিল নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের। নাফ নদী পাড়ি দিয়ে শাহপরীর দ্বীপসহ পাঁচটি সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রায় সারা দিনই দলে দলে বাংলাদেশে ঢুকেছেন তারা।

এদিকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ঘরবাড়িতে আগুন দিয়ে গ্রামের পর গ্রাম বিরানভূমিতে পরিণত করেছে বলে ‘অকাট্য প্রমাণ’ পেয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। একে ‘স্কর্চড আর্থ’ (পোড়ামাটি) কৌশল বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি। স্যাটেলাইট ছবির ভিত্তিতে অ্যামনেস্টি বলছে, মিয়ানমারে নিরাপত্তা বাহিনী জাতিগত নিধন চালাচ্ছে- যা মানবতাবিরোধী অপরাধ।

শুক্রবার ব্যাংককে এক অনুষ্ঠানে অ্যামনেস্টি এসব মন্তব্য করেছে বলে জানায় এএফপি। লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থাটি জানায়, নতুন করে তারা যেসব স্যাটেলাইট ছবি পেয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে রাখাইনের অন্তত ২৬টি গ্রামে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। যেসব স্থানে এক সময় ঘরবাড়ি ছিল সেগুলোতে ধূসর ভস্ম দেখা যাচ্ছে।

অ্যামনেস্টি বলেছে, স্যাটেলাইটে ফায়ার সেন্সর বসিয়ে তারা দেখতে পেয়েছে ২৫ আগস্ট থেকে উত্তর রাখাইনে ৮০ বার বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড দেখা গেছে। সেদিন থেকেই সেনাবাহিনীর ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন্স’ শুরু হয়।

অ্যামনেস্টির গবেষক ওলফ ব্লোমভিস্ট বলেন, ‘রাখাইন জ্বলছে। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী জাতিগত নির্মূল অভিযান চালাচ্ছে।’

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে অ্যামনেস্টি জানায়, নিরাপত্তা বাহিনী ও উগ্র জনতা পেট্রল কিংবা কাঁধেচালিত রকেট লঞ্চার ব্যবহার করে বাড়িতে আগুন দেয়। এরপর তারা পালিয়ে যায়। অনেক এলাকায় রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি অন্য ধর্মের লোকেরা বাস করলেও বেছে বেছে শুধু রোহিঙ্গাদের বাড়িতেই আগুন দেয়া হয়েছে।

ব্লোমভিস্ট বলেন, ‘যে কোনো মূল্যে রোহিঙ্গাদের তাদের দেশ থেকে উচ্ছেদ করার মতলব থেকেই নিরাপত্তা বাহিনী এসব করছে বলে উপসংহারে পৌঁছানো কঠিন নয়।’

স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবিগুলো প্রকাশ করে অ্যামনেস্টির পক্ষ থেকে বলা হয়, গত তিন সপ্তাহ ধরে সেখানে ‘খুবই পরিকল্পিতভাবে একটি নির্দিষ্ট ছকে গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দেয়ার’ ছবি এখানে ওঠে এসেছে। অ্যামনেস্টির ক্রাইসিস রেসপন্স ডিরেক্টর তিরানা হাসান বলেন, ‘মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে দেশ থেকে বিতাড়নের লক্ষ্য নিয়েই যে গ্রামগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে- এগুলো তার অকাট্য প্রমাণ। এটা জাতিগত নির্মূল অভিযান, এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।’

রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে হামলার বর্ণনায় অ্যামনেস্টির পক্ষ থেকে বলা হয়, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এক-একটি গ্রাম প্রথমে ঘিরে ফেলছে, পলায়নরত গ্রামবাসীর ওপর নির্বিচারে গুলি ছুড়ছে এবং তাদের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। এটা নিশ্চিতভাবেই ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’। ২৫ আগস্ট রাতে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) রাখাইন রাজ্যে এক সঙ্গে ৩০টি পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনা ক্যাম্পে হামলা চালায় বলে দাবি মিয়ানমার সরকারের। কথিত হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ বেশ কয়েকজন নিহত হওয়ার পর থেকে রাখাইনে সেনা অভিযান চলছে। সেনাবাহিনী কিভাবে গ্রামে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মানুষ মারছে, ঘরের ভেতরে আটকে রেখে কিভাবে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, লুটপাট চালিয়ে কিভাবে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে, সেই বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কথায়। মিয়ানমার সরকার দাবি করেছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহানুভূতি পাওয়ার জন্য রোহিঙ্গারা নিজেরাই নিজেদের বাড়িতে আগুন দেয়। তবে মানবাধিকার সংগঠন ও প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকরা এ দাবি নাকচ করে দিয়েছেন।

পোড়ামাটি নীতি বা ‘স্কর্চড আর্থ’ কি :  মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দেশটির মুসলিম অধ্যুষিত রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের নির্মূলের জন্য ‘স্কর্চড আর্থ’ কৌশল অবলম্বন করছে। এ কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলো একের পর এক জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং যারা পালাতে চাইছে তাদের গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। সামরিক পরিভাষায়, স্কর্চড আর্থ নীতি হচ্ছে একটি সামরিক কৌশল।

সহজ বাংলায় এটাকে পোড়ামাটি কৌশল বলা হয়। এ কৌশল অনুসারে সেনারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে এগিয়ে যাওয়ার সময় ‘শত্রু’ সেনাদের হত্যার পাশাপাশি সবকিছু পুড়িয়ে দেয়। ‘শত্রু’র পক্ষে ব্যবহার করা সম্ভব এমন স্থাপনা ও অবকাঠামো জ্বালিয়ে দেয়া হয়। যেমন- খাদ্যের উৎস, পানির সরবরাহ, পরিবহন, যোগাযোগ, শিল্প-কারখানা ইত্যাদি।
এই কৌশল সেনাবাহিনী ‘শত্রু’ ভূমিতে অথবা নিজেদের নিয়ন্ত্রিত ভূ-খণ্ডেও ব্যবহার করতে পারে। ‘শত্রু’র সম্পদ ধ্বংস করার কৌশলের চেয়ে স্কর্চড আর্থ ভিন্ন।

অতীতে রাশিয়ার সেনাবাহিনী এ কৌশল ব্যবহার করেছে বেশ কয়েকবার। মার্কিন গৃহযুদ্ধেও কৌশলটি ব্যবহৃত রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সেনাবাহিনী সোভিয়েত অভিযানে এবং জাপান তার প্রতিবেশী চীনে এ কৌশল ব্যবহার করেছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে এ কৌশল ব্যবহার করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। গত কয়েক দশকের মধ্যে শ্রীলংকা, লিবিয়া ও সিরিয়ার গৃহযুদ্ধেও কৌশলটি ব্যবহার করা হয়েছে।

এখনও জ্বলছে রাখাইন : রাখাইনে এখনও আগুন জ্বলছে। বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে শুক্রবার রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামে আগুনের শিখা দেখা যায়। বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়েছে, রাখাইনের তামব্রু গ্রাম থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া কয়েকজন বাসিন্দা বলেছেন, কয়েক দিন আগে তারা এদেশে পালিয়ে এসেছেন এবং যেসব ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে সেগুলো তাদের।

এই গ্রামে ৬০০০ রোহিঙ্গা মুসলিমের বাস ছিল। গত তিন সপ্তাহে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। অনেক শরণার্থী বলেছেন, মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধরা তাদের ঘরবাড়িতে আগুন লাগিয়ে বলে- ‘হয় চলে যা না হয় মর।’ এদিকে টেকনাফ প্রতিনিধি নুরুল করিম রাসেল জানান, রাখাইন অঞ্চলে প্রতিদিন কোনো না কোনো রোহিঙ্গা গ্রামে আগুন দিচ্ছে সেনাবাহিনী ও বিজিপি। শুক্রবার শায়রাপাড়া ও রাইম্যাবিল নামে দুটি গ্রামে আগুন দেয় তারা। ফলে সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গাদের আসা থামছে না।

শুক্রবার টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, নয়াপাড়া, নাইট্যংপাড়া, হোয়াইক্যং ও হ্নীলা সীমান্ত দিয়ে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে দলে দলে রোহিঙ্গাদের প্রবেশ ঘটে। এদিন রাখাইনের নোয়াপাড়া, শায়রাপাড়া, ধামনখালী, শোয়াপ্রাং প্রভৃতি এলাকা থেকে রোহিঙ্গারা আসে।
বিধ্বস্ত রাখাইনে এখন কারা আছেন : সামরিক অভিযানের মুখে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যে ভয়াবহ মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে তাতে এরই মধ্যে প্রায় চার লাখ শরণার্থী প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এএফপি জানায়, লাখো রোহিঙ্গা মুসলিমদের পাশাপাশি রাখাইনের প্রায় ৩০ হাজার হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীও গৃহহীন হয়েছে। তারা বলছে, রাখাইনের উত্তর দিকের যে এলাকা থেকে উত্তেজনার শুরু, প্রথম থেকেই তা ঘিরে রেখেছে সরকারি বাহিনী।

অন্যদিকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছে, সেনাবাহিনী ও সংঘবদ্ধ বৌদ্ধরা গ্রামের পর গ্রামে গণহত্যা চালিয়ে সেগুলো মুসলিমশূন্য করার পাশাপাশি গ্রামগুলোকে মাটির সঙ্গে মিশিয়েও দিচ্ছে। কঠোর সেনা অভিযানের মধ্যে লাখো রোহিঙ্গা দেশ থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। তাহলে সহিংসতা বিধ্বস্ত রাখাইনে এখন থাকছে কারা? ২০১৫ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, রাখাইনে বাস করা ৩০ লাখ মানুষের মধ্যে ১১ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম। তার মধ্যে সবচেয়ে উত্তরের জেলা মংডুতেই এক-তৃতীয়াংশের বাস বলে মিয়ানমার সরকার জানিয়েছে। গত তিন সপ্তাহে ওই মংডু জেলারই অন্তত ৪০ শতাংশ গ্রাম জনশূন্য হয়ে পড়েছে বলে সরকারের এক মুখপাত্র জানান।

গত কয়েক দিনে বাংলাদেশে যত শরণার্থী এসেছে তা মিয়ানমারে থাকা রোহিঙ্গাদের প্রায় অর্ধেক বলে ধারণা করা হচ্ছে। মিয়ানমারের তথ্যবিষয়ক কমিটি বলছে, ৫৯টি গ্রামের প্রায় ৭ হাজার বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, যেগুলোর বেশিরভাগই ‘বাঙালিদের’। রোহিঙ্গাদের এই নামেই ডাকে মিয়ানমার কর্তৃৃপক্ষ। বছরের পর বছর বৌদ্ধ অধ্যুষিত দেশটিতে বসবাস করে এলেও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতেও অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে তারা। -যুগান্তর

Share This:

এই পেইজের আরও খবর