২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
সকাল ৭:১০, রবিবার

চীনা সরকারের নীতি পাল্টাতে হবে

চীনা সরকারের নীতি পাল্টাতে হবে 

05

মন রসো, ঢাকা, ৫ অক্টোবর : চীনা সরকার দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জিনজিয়াং প্রদেশে ২২টি মুসলিম নাম ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। সেখানে বসবাসরত উইঘুর মুসলমানদেরকে হুমকি দেয়া হয়েছে, নিষিদ্ধ এসব নাম ব্যবহারকারী শিশুদের স্কুলে ঢুকতে দেয়া হবে না। ধর্মীয় বিভিন্ন অধিকার থেকে উইঘুর মুসলমানদের বঞ্চিত করতে চীন সরকার যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করে আসছে এটি তার সর্বশেষ। সূত্র অন ইসলাম ও অন্যান্য বার্তা সংস্থা।

যে ২২টি ইসলামিক নাম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে তার মধ্যে ১৫টি ছেলেদের এবং সাতটি মেয়েদের। এক সরকারি ফরমানে বলা হয়েছে, ছেলেদের ‘হুসাইন, আরাফাত, মুজাহিদ, মুজাহিদুল্লাহ, আসাদুল্লাহ, আবদুল আজিজ, সাইফুল্লাহ, গুলদুল্লাহ, সাইফুদ্দিন, জিকরুল্লাহ, নাসরুল্লাহ শামসুদ্দিন পাকিরউদ্দিন’ নাম রাখা যাবে না। অন্য দিকে মেয়েদের ‘আমিনা, মুসলিমা, মুখলিসা, মুনিসা, আয়িশা, ফাতিমা ও খাদীজা’ নাম রাখা যাবে না।

প্রদেশের হোতান এলাকায় তুরাখান নামে একজন মহিলা জানান, আমার মেয়ের নাম ‘মুসলিমা’। সম্প্রতি গ্রামপুলিশ আমাদের বাড়িতে এসে জানায়, আমার মেয়ের এ নাম অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে এবং তা যত তাড়াতাড়ি করা সম্ভব ততই ভালো। এর কারণ হিসেবে পুলিশ আমাদের জানায়, সরকারিভাবে ‘মুসলিমা’ নামটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আমরা আমাদের মেয়ের নাম পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছি। তিনি আরো বলেন, পুলিশ আমাদের বলেছে, স্থানীয় শহর ও গ্রাম প্রশাসন নামের ব্যাপারে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কাজেই এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।

২২টি নাম ব্যবহারের উপর এ নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি চীনা কমিউনিস্ট পার্টির স্থানীয় শহর শাখার রাজনৈতিক ও আইন প্রয়োগকারী বিভাগের প্রধান স্থানীয় মুসলমান ও ইমামদের অবহিত করেছে। গ্রামপুলিশ সদস্যরা জানায়, পার্টির গ্রাম কমিটি ও পুলিশ বিষয়টি স্থানীয় ইমামদের জানিয়ে দিয়েছে। কাজেই হোতান এলাকার সব মুসলমান এবং ইমামরা জানেন, সরকারিভাবে কোন্ নামটি বৈধ আর কোন্টি অবৈধ। উল্লেখিত ২২টি নামের কোনো শিশুকেই আর স্থানীয় কিন্ডারগার্টেন ও এলিমেন্টারি স্কুলে ঢুকতে দেয়া হবে না বলে জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার নিন্দা: জিনজিয়াংয়ে মুসলিম নাম ব্যবহারে সরকারি নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানিয়েছেন উইঘুর নেতারা। তারা এটাকে একটি ‘বোকামিপূর্ণ সিদ্ধান্ত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক উইঘুর আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইলসাত হোসেন বলেছেন, ‘মুসলিম শিশুদের ধর্মীয় বা জাতিগত নাম রাখা একটি মৌলিক মানবিক অধিকার। চীনের সংবিধান কিংবা আঞ্চলিক জাতিগত স্বায়ত্তশাসন আইনেও নাম রাখার উপর এ রকম নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ নেই।’ তিনি আরো বলেন, ১৯৪৯ সালে চীনা বিপ্লবের পর থেকে চীনপন্থী ও কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থক বেশ কিছু প্রভাবশালী উইঘুর মুসলিম নেতার সাইফুদ্দিন আজিজি, ইসমাইল আহমদ, নূর বাকরি ইত্যাদি নাম ছিল। তার মতে,‘উইঘুর ঐতিহ্যবাহী নামগুলোর মধ্যে ৮০ শতাংশই ইসলামী, যেগুলো পবিত্র কুরআন ও অন্য ইসলামী সূত্র থেকে এসেছে। চীনের ইতিহাসে মাঞ্চু রাজবংশ ও জাতীয়তাবাদী সরকারসহ এমন কোনো কর্তৃপক্ষ বা সরকার আসেনি, যারা উইঘুর নামগুলো কখনো নিষিদ্ধ করেছিল।’

গত রমযান (১৪৩৬ হিজরী) মাসে জিনজিয়াং প্রদেশের পশ্চিম এলাকার কর্তৃপক্ষ পার্টির মুসলিম সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা, ছাত্র ও শিক্ষকদের রোযা রাখার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল।
এর আগের বছর (অর্থাৎ ১৪৩৫ হিজরী) পবিত্র রমাদ্বান শরীফের রোযা নিষিদ্ধকে কেন্দ্র করে চীনা মুশরিক ও নাস্তিক সরকারের পেটোয়া পুলিশের সাথে মুসলমানদের সংঘর্ষে ৫৬ জন মুসলমানকে শহীদ হয় ও ৩৮০ জনকে আটক করা হয়।

এ বিষয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার অভিমত, উইঘুর ও অন্যান্য মুসলিম সংখ্যালঘু গ্রুপগুলোর উপর নাস্তিক্যবাদী মুশরিক চীনা সরকারের নানা বিধি-নিষেধ আরোপ করাই এ উত্তেজনার কারণ।

তারফান সিটির বাণিজ্যবিষয়ক ব্যুরো, রাষ্ট্রায়ত্ত বোজৌ রেডিও এবং টিভি ইউনিভার্সিটি তাদের ওয়েবসাইটে জানানো হয়, ‘সরকারি (মুসলিম) কর্মচারী ও ছাত্ররা রোযা এবং অন্যান্য ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবে না। এছাড়াও পার্টি সদস্য, শিক্ষক এবং তরুণদের পবিত্র রমাদ্বান শরীফে রোযা রাখতে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।’

এ বিষয়ে প্রবাসী ওয়ার্ল্ড উইঘুর কংগ্রেসের মুখপাত্র দিলজাত রাজিত স্থানীয় সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, ‘কর্তৃপক্ষ বিনামূল্যে খাবার গ্রহণ করতে মুসলমানদের বাধ্য করেছে এবং তারা রমাদ্বান শরীফ উনার রোযা পালন করছে কিনা তা তদন্ত করতে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালায়।’

এ ধরনের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে আরো সংঘাতের সৃষ্টি হবে সন্দেহ নেই। উইঘুর মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং পবিত্র রমাদ্বান মাসে নির্যাতন বন্ধ করতে যালিম নাস্তিক মুশরিক চীনা কর্তৃপক্ষের প্রতি দিলজাত রাজিত আহ্বান জানিয়েছে। [সূত্র: এএফপি]

২০১৪ সালের ডিসেম্বরে জিনজিয়াংয়ের রাজধানী উরুমচিতে মেয়েদের প্রকাশে হিজাব পরা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ‘ধর্মীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে’ চীন সরকারের কথিত অভিযান শুরুর পর থেকে মুসলিম অধ্যুষিত জিনজিয়াং প্রদেশে চীনা সরকার নানা ধরনের বিধিনিষেধ ও আইন প্রয়োগ শুরু করে। তারই ধারাবাহিকতায় শিশুদের মুসলিম নাম রাখার উপর এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ২০১৪ সালের শুরুর দিকে জিনজিয়াংয়ের সরকারি ভবনে ধর্মীয় কর্মকা- এবং ধর্মীয় উগ্রপন্থার পরিচয় বহন করে এমন কাপড় ও লোগো ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। গত মে (২০১৫) মাসে জিনজিয়াংয়ের বিভিন্ন গ্রামে মুসলিম দোকান ও রেস্টুরেন্টগুলোতে দিনের বেলাতেই সিগারেট ও মদ বিক্রির নির্দেশ দিয়ে বলা হয়, এগুলো বিক্রি না করলে দোকান বন্ধ করে দেয়া হবে।

কলেজ ছাত্রদের অবশ্যই সাপ্তাহিক রাজনৈতিক শিক্ষাক্লাসে যোগ দিতে হবে এবং সশস্ত্র পুলিশ কর্মকর্তারা কর্তৃপক্ষের অনুমোদনবিহীন মাদরাসাগুলোতে যখন ইচ্ছা হানা দিতে পারবে। সবচেয়ে বেশি উসকানিমূলক পদক্ষেপ হচ্ছে, মহিলাদের হিজাব ব্যবহার করা ও পুরুষদের দাড়ি রাখার বিরুদ্ধে প্রচারাভিযান। যেসব ট্যাক্সিচালক বোরকা পরা মহিলাদের গাড়িতে নেবে, তাদের মোটা অংকের জরিমানা করা, মস্তকাবরণ সরাতে অনিচ্ছুক মহিলাদের চিকিৎসা সেবা দিতে ডাক্তারদের বারণ করা। বোরকা পরা মেয়েদের প্রশাসনকর্তৃক বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা। চীনা সরকারের আরেকটি খারাপ নীতি হচ্ছে- ১৮ বছরের নিচের কোনো ছেলে মসজিদে যেতে পারবে না। সম্মিলিতভাবে পবিত্র কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ অধ্যয়নে সরকারি নিষেধাজ্ঞা এবং ধর্মীয় স্থাপনাগুলো সার্বক্ষণিক থাকে তাদের গোয়েন্দা নজরদারিতে। নামায পড়ার কারণে চাকরি চলে গেছে, এরকম ভুরিভুরি নজির আছে জিনজিয়াংয়ের উইঘুর জনপদে। চাকরির ক্ষেত্রেও উইঘুর মুসলমানরা চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। যা সাম্প্রতিক সময়ে পরিচালিত একটি জরিপ থেকে বোঝা যায়।

ধর্মীয় ক্ষেত্রে উইঘুর মুসলিমদের প্রতি যালিম চীনা সরকারের নীতির কঠোর সমালোচনা করে মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ২০০৯ সালের দাঙ্গার পর চীনা সরকারের সমালোচনা করে শান্তিপূর্ণভাবে মতামত প্রকাশের দায়ে চীন সরকার গোপনে বেশ কয়েকজন উইঘুর মুসলিম বুদ্ধিজীবীর বিচার করেছে। তারা আরো বলেছে, ধর্ম নিয়ন্ত্রণ এবং সংখ্যালঘুদের ভাষাশিক্ষা নিষিদ্ধ করার চীনা নীতি জিনজিয়াংয়ে অস্থিতিশীলতার অন্যতম কারণ। মুসলমানরা অভিযোগ করছেন, তাদের স্বকীয়তা ও সংস্কৃতি মুছে ফেলার লক্ষ্যে তাদের নিজস্ব ভূভাগে সন্ত্রাসী হান সম্প্রদায়কে দিয়ে বসতি গড়ে তোলা হচ্ছে। ভূতত্ত্ববিদ আর সংশ্লিষ্টরা বলেছে, চীনা কর্তৃপক্ষের গৃহীত পদক্ষেপের ফলে ১৯৪০ দশকে জিনজিয়াংয়ের ৫ শতাংশ হান সম্প্রদায় বর্তমানে ৪০ শতাংশে পরিণত হয়েছে এবং সেখানে নিয়মিত মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা হয়ে আসছে।

চীনে দু’রকম মুসলমান আছে। ‘হুই’ ও ‘উইঘুর’। হুই ও উইঘুর মুসলমানদের উদ্ভব বিভক্ত এক নয়। যাদের বলা হয় হুই মুসলমান, তাদের পূর্বপুরুষদের পারস্য, সিরিয়া, ইরাক, আনাতোলিয়া প্রভৃতি জায়গা থেকে ধরে এনেছিলো চীনে কাজ করার জন্য। চীনে এরা বিয়ে করে হান কন্যা। এর ফলে উদ্ভব হয় হুইদের। এরা দেখতে প্রায় হানদেরই মতো। কিন্তু হানদের সাথে এক হয়ে যাননি। বজায় থেকেছে সামাজিক স্বাতন্ত্র্য। মূলত ইসলাম ধর্মের প্রভাবে। হুইরা খুবই নিষ্ঠাবান মুসলমান। তারা আরবিতে পবিত্র কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করেন। ছেলে-মেয়েদের নাম রাখেন প্রধানত আরবীতে। হুইরা বাইরে হানদের মতো ম্যান্ডারিন ভাষায় কথা বললেও বাড়িতে যে ভাষায় কথা বলেন, তাতে থাকতে দেখা যায় অনেক আরবী শব্দ। হুই ছেলে-মেয়েরা প্রথমে পড়াশোনা শুরু করে মসজিদের স্কুলে (মক্তবে)।

সেখানে তারা পবিত্র কুরআন শরীফ পড়তে শেখে আরবী ভাষায়। হুই ছেলেরা আয় করতে আরম্ভ করলে তার একটা অংশ রেখে দেয় তাদের সমাজে অভাবী মানুষকে প্রয়োজনে সাহায্য করার জন্য। হুই মুসলিমরা সারা চীনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। তবে তারা বিশেষভাবে বাস করেন উত্তর চীনের কান্সু প্রদেশে। কান্সুকেই তারা প্রধানত নিজেদের দেশ বলে মনে করেন।

উইঘুরদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস:
উইঘুর হচ্ছে তুর্কি বংশোদ্ভূত মুসলমানদের একটি জাতি-গোষ্ঠী। পূর্ব ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এদের বসবাস। উইঘুর মুসলমানদের মোট সংখ্যা প্রায় এক কোটি ১৩ লাখ ৭০ হাজার। এর মধ্যে চীনের জিনজিয়াং প্রদেশেই বাস করে ৮৫ লাখের মতো। হুনানসহ অন্যান্য চীনা প্রদেশ ও রাজধানী বেইজিংসহ বিভিন্ন নগরীতেও অল্পসংখ্যক উইঘুর বাস করে। এছাড়া কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, তুরস্ক, রাশিয়া, তাজিকিস্তান, পাকিস্তান ও মঙ্গোলিয়াতে উইঘুরদের বসবাস রয়েছে। এরা সুন্নী মুসলমান এবং এরা সুফীতত্ত্ব বা ইলমে তাসাউফ চর্চা করেন।

উইঘুর শব্দের অর্থ হচ্ছে ৯টি গোত্রের সমষ্টি বা সমন্বয়। তুর্কি ভাষায় এজন্য উইঘুর শব্দকে বলা হয় টকুজ-ওগুজ। টকুজ অর্থ নয় (৯) এবং গুর অর্থ উপজাতি। ওগুজ থেকে গুর শব্দটি এসেছে। প্রাচীন আমলে আলতাই পর্বতমালার পাদদেশে তুর্কিভাষী বিভিন্ন গোত্র বা উপজাতি বাস করতো। এদের মধ্যে ৯টি উপজাতিকে নিয়ে উইঘুর সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়। উইঘুরদের কখনো কখনো ‘গাউচি’ এবং পরে ‘তিয়েলে’ জনগোষ্ঠী হিসেবেও ডাকা হতো। তুর্কি শব্দ ‘তিয়েলে’ বা ‘তেলে’-এর অর্থ হচ্ছে ৯টি পরিবার। বৈকাল হ্রদের আশপাশের এলাকায় বসবাসকারী সিয়র তারদুস, বাসমিল, ওগুজ, খাজার, আলানস, কিরগিজসহ মোট ৯টি গোষ্ঠীর সমন্বয়ে উইঘুর নামের জনগোষ্ঠী বা জাতি গড়ে উঠে।

Share This:

পাঠকের মতামতঃ

comments

এই পেইজের আরও খবর