১৯ অক্টোবর ২০১৭
সকাল ১১:২৬, বৃহস্পতিবার

নিয়ন্ত্রণের বাইরে চিকুনগুনিয়া

নিয়ন্ত্রণের বাইরে চিকুনগুনিয়া 

222

ঢাকা, ১১ জুলাই : নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে চিকুনগুনিয়া। রাজধানীতে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের অন্য জেলা-উপজেলায় এ রোগে আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। আক্রান্তদের অনেকে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। আবার কেউ কেউ বাড়িতেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। দেশের সর্বত্র এখন চিকুনগুনিয়া আতঙ্ক বিরাজ করছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুতেই রাজধানীতে চিকুনগুনিয়া দেখা দেয়। গত তিন-চার মাসে এটি মহামারী আকার ধারণ করে। শুরুতে চিকুনগুনিয়ার বিস্তার ঠেকাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা সিটি করপোরেশন তেমন গুরুত্ব দেয়নি। এর প্রতিরোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় রাজধানীতে এর ব্যাপকতা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বর্তমানে তা জেলা-উপজেলায়ও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।

রাজধানীর বাইরে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে যেসব রোগীর সন্ধান মিলেছে, তারা ঢাকার মশা দ্বারা আক্রান্ত বলে দাবি করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। চিকুনগুনিয়া লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা নেই বলেও জানানো হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে।

চিকুনগুনিয়া পর্যবেক্ষণে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু করেছে গত ৩ জুলাই। আইইডিসিআরের নিয়ন্ত্রণের কক্ষের গত ৯ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৮ জুলাই পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির ল্যাবরেটরিতে চিকুনগুনিয়া রোগীর সংখ্যা ৫৫৬। ওইদিন ১৬৫ জন লোক হটলাইনে এবং ১৮ জন সরাসরি হাজির হয়ে চিকুনগুনিয়া সম্পর্কে তথ্য জানেন। এর মধ্যে বেশিরভাগ ঢাকার এবং কয়েকজন মাদারীপুরের বাসিন্দা ছিলেন। অর্থাৎ রাজধানীর বাইরের জেলা থেকেও চিকুনগুনিয়ার খোঁজখবর নিচ্ছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার বাইরে মাদারীপুর, সিলেট, ময়মনসিংহ, লালমনিরহাটে চিকুনগুনিয়া রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। এ জন্য প্রতিটি জেলায় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলার জন্য সিভিল সার্জনদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত জুলাই প্রতিষ্ঠানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় প্রতি ১১ জনের মধ্যে একজন (অর্থাৎ ৯ শতাংশ) লোক চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত। মুঠোফোনের মাধ্যমে পরিচালিত এক জরিপ থেকে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। তবে গতকাল প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ওই পরিসংখ্যান সঠিক নয় বলে জানানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, ৯ শতাংশ লোক চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হলে রাজধানীতে চিকুনগুনিয়ার রোগী হতো ১৮ লাখ। রাজধানীতে বর্তমানে প্রায় ২ কোটি লোক বসবাস করে।

আইইডিসিআরের তথ্যমতে, চিকুনগুনিয়ার ভাইরাস টোগা ভাইরাস গোত্রের। এডিস ইজিপ্টি এবং এডিস এলবোপিকটাস মশার মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। এ ধরনের মশা সাধারণত দিনের বেলায় (ভোরবেলা অথবা সন্ধ্যার সময়) কামড়ায়। মশাগুলো সাধারণত পরিষ্কার বদ্ধ পানিতে জন্মে। এ ধরনের পরিবেশে বসবাসকারী মানুষের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেশি।

চিকুনগুনিয়া জ্বরের লক্ষণ হচ্ছে হঠাৎ জ্বর আসা, সঙ্গে গিঁটে গিঁটে প্রচ- ব্যথা, মাথাব্যথা, মাংসপেশিতে ব্যথা, শরীরে ঠা-া অনুভূতি, বমি বমি ভাব অথবা বমি, চামড়ায় লালচে দানা ওঠা। চিকুনগুনিয়া এমনি এমনিই সেরে গেলেও কখনো কখনো গিঁটের ব্যথা কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছরও থাকতে পারে। এই জ্বর ৩ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত হতে পারে। এ রোগ প্রতিরোধে কোনো ভ্যাকসিন নেই।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, চিকুনগুনিয়া একটি মশাবাহিত রোগ। আফ্রিকায় প্রথম এর ভাইরাসের খোঁজ পাওয়া যায়। ঢাকার পর চিকুনগুনিয়া গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে। এটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি আরও বলেন, চিকুনগুনিয়া রোগ প্রতিরোধে কাজ করার কথা স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। স্থানীয় সরকারের আওতাধীন সিটি করপোরেশন থেকে যদি মশা নিধন কর্মসূচি সঠিকভাবে পালন করা হতো, তা হলে মশার বংশবিস্তার হতো না। মশক নিধনের পাশাপাশি জনসেচতনতা বাড়ানো সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব। সিটি করপোরেশন রাস্তা ও বাড়ির আশপাশের মশা মারল এবং আবর্জনা পরিষ্কার করল; কিন্তু জনসচেতনতা সৃষ্টি না করায় বাসার ভেতরে যে মশা রয়েছে সেগুলো থেকে গেল। সচেতনতার অভাবে মশা নিধন কার্যক্রম সঠিকভাবে হলো না। ফলে করপোরেশনকে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচিও পালন করতে হবে।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ড. জাফর উল্লাহ বলেন, ১৯৫০ সালের দিকে চিকুনগুনিয়া আফ্রিকায় দেখা দেয়। ১৯৬৩ সালে ভারতে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এবার ঢাকা আক্রান্ত হলো। সিটি করপোরেশন মশা মারছে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও সজাগ হচ্ছে। চিকুনগুনিয়া নিয়ে চিকিৎসকদের পাঠদান করা হচ্ছে না বিধায় চিকিৎসকরা এর চিকিৎসা দিতে পারছেন না। চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার করতে হবে। চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে মশারির ভেতর রাখতে হবে। তাকে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট খাওয়াতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ এ প্রতিবেদককে বলেন, চিকুনগুনিয়া পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সোমবার বিকালে এই কমিটি প্রথম বৈঠক করে। কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে হাতেগোনা ২-৩ জন রোগীর খবর পাওয়া গেছে। তারা ঢাকায় অবস্থানকালেই মশার কামড় খেয়েছেন। পরে গ্রামে গিয়ে জ্বরে আক্রান্ত হন। ওইসব রোগী ঢাকায় এসে পরীক্ষা করিয়েছেন। তাদের চিকুনগুনিয়া নেগেটিভ (হয়নি) পাওয়া গেছে।

তিনি আরও বলেন, চিকুনগুনিয়া জ্বর যে পরিবেশে ছড়ায়, তার জন্য ঢাকা উপযুক্ত। বৃষ্টি হলে ঢাকার পানি সহজে সরে না। মশার প্রজননক্ষেত্রের জন্য পানি খুবই জরুরি। কিন্তু জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বৃষ্টি হলে সেখানকার পানি আটকে থাকে না। সরে যায়। এ কারণে চিকুনগুনিয়া যে মশার দ্বারা ছড়ায় সেই মশা বংশবিস্তার করতে পারে না। ফলে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে চিকুনগুনিয়া ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা নেই।

চিকুনগুনিয়া পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের সব সরকারি হাসপাতালে হেল্পডেস্ক খোলা হচ্ছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের নির্দেশে। পাশাপাশি চিকুনগুনিয়া আক্রান্ত রোগীদের শরীরের বিভিন্ন অস্থিসন্ধির ব্যথা প্রশমনে প্রতিটি হাসপাতালে প্রয়োজনে জয়েন্টপেইন ক্লিনিক বা আর্থালজিয়া ক্লিনিক খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখান থেকে রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী ফিজিওথেরাপি বা ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেওয়া হবে। দেশের সব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ জেলা ও উপজেলা হাসপাতালেও এই সেবা দেওয়া হবে। রোববার ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশের সব সরকারি হাসপাতালের পরিচালক, বিভাগীয় পরিচালক ও সিভিল সার্জনদের কাছে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এ নির্দেশনা পৌঁছে দেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বিশেষ করে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে এডিস মশার বিস্তার ঘটে। এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু রোগের বিস্তার ঘটে। কিন্তু এবার ডেঙ্গু জ্বরের তেমন বিস্তার না ঘটলেও চিকুনগুনিয়া ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়েছে। চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে এডিস মশা নিধন জরুরি। কিন্তু মশা নিধন করতে পারছে না সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। চিকুনগুনিয়া ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ায় অনেকটা উদ্বিগ্ন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে গত ১ থেকে ৫ জুন মহানগরীর ৪৭টি ওয়ার্ডে একটি জরিপ চালায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। জরিপে রাজধানীর ২৩টি অঞ্চলকে চিকুনগুনিয়ার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর পরই চিকুনগুনিয়ার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস এবং বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে নগরবাসীকে সচেতন করতে ১৭ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করে রাজধানীর ৭১টি মেডিক্যাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীসহ ১২ হাজার কর্মী। ২৫০টি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৯২টি ওয়ার্ডের ৭৫০টি স্থানে একযোগে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। এ বিষয়ে স্থানীয়দের পরামর্শ দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, এডিস মশা ডেঙ্গু আর চিকুনগুনিয়ার বাহক। ডেঙ্গুজ্বরের সঙ্গে চিকুনগুনিয়ার অনেক পার্থক্য রয়েছে। ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্তদের সাধারণত দীর্ঘ সময় শরীর ব্যথা বা অন্য কোনো সমস্যা থাকে না। জ্বর ভালো হয়ে গেলে কয়েকদিন দুর্বলতা বা ক্লান্তি থাকতে পারে। কিন্তু চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তদের জ্বর সেরে গেলেও ব্যথা থাকতে পারে দীর্ঘ সময়। আক্রান্তদের অনেকেই দীর্ঘদিনের জন্য স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারেন। তিনি বলেন, অন্য ভাইরাস জ্বরের মতো চিকুনগুনিয়ার নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। কেউ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হলে রোগীকে বিশ্রামে থাকার পাশাপাশি প্রচুর পানিসহ অন্য তরল খেতে হবে। জ্বর হলে প্যারাসিটামল খেতে হবে। পানি দিয়ে শরীর মুছিয়ে দিতে হবে। আক্রান্ত রোগীকে মশারির ভেতরে রাখতে হবে।

এদিকে চিকুনগুনিয়া পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে পাবলিক হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার (চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণ কক্ষ) খোলা হয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। এ ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা কাজ করার জন্য একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে। সার্বক্ষণিক হটলাইনও চালু করা হয়েছে, যার ফোন নম্বর হচ্ছে ০১৯৩৭-১১০০১১ এবং ০১৯৩৭-০০০০১১। চিকুনগুনিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে লিংক ভিজিট করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে অনুরোধ করা হয়েছে। -আমাদের সময়

Share This:

Comments

comments

এই পেইজের আরও খবর