২৪ অক্টোবর ২০১৭
রাত ২:৫৩, মঙ্গলবার

অনিশ্চয়তা বাড়ছেই হজ যাত্রীদের

অনিশ্চয়তা বাড়ছেই হজ যাত্রীদের 

1502218040

ঢাকা : হজ যাত্রীদের ঊদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তা বেড়েই চলেছে। ই-ভিসা জটিলতা, ফ্লাইট বিপর্যয়, ধর্ম মন্ত্রনালয়ের উদাসীনতা, মধ্যস্বত্বেভাগীর প্রতারণা এবং এক শ্রেণীর মুনাফালোভী হজ এজেন্টদের পাকচক্রে পড়ে হজ যাত্রীরা দু:সহ সময় পার করছেন। এই সংকট এবং ভোগান্তির জন্য হজ এজেন্সি এবং ধর্ম মন্ত্রণালয় পরস্পরকে দোষারোপ করছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, হজের মতো ধর্মীয় পবিত্রতা নিয়ে রাঘব-বোয়ালদের ব্যবসা বাণিজ্য চলছে বেপরোয়া। হজ নিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। তাদের অনুগত হজ এজেন্টদের কাছে নিবন্ধিত হজ যাত্রীরা আছেন কিছুটা স্বস্তিতে। অন্য হজ যাত্রীদের অবস্থা করুণ। এখনো ৪৮ হাজার হজ যাত্রীর ভিসা হয়নি। আর ৯ দিন পর সৌদি সরকার ভিসা দিবে না। গতকাল পর্যন্ত ধর্ম মন্ত্রণালয়ে ২৮টি এজেন্সি ৫ হাজার ১১৭ জন হজযাত্রীর ভিসার আবেদনই জমা দেয়নি । হজের শেষ ফ্লাইট যাবে ২৬ আগস্ট। প্রায় প্রতিদিনই যাত্রীর অভাবে বাতিল হচ্ছে শিডিঊল ফ্লাইট। ই-ভিসা জটিলতার কারণে টিকিট কনফার্ম থাকার পরও যাত্রীরা বিমানে উঠতে পারছেন না। ই-ভিসার প্রিন্ট নিতে গিয়ে সার্ভার ও যান্ত্রিক ত্রুটিতে আটকা পড়ছেন যাত্রীরা। ইতোমধ্যে বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, দ্রুত জটিলতা নিরসন না হলে কমপক্ষে ৪০ হাজার যাত্রীর হজ করা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেবে। আর হজ এজেন্টদের সংগঠন হাব নেতারা কেউ কেউ বলছেন, ১০ হাজার হজযাত্রীর হজযাত্রা অনিশ্চিত হতে পারে।

বাংলাদেশ থেকে আগামী ১৭ দিনে ৮৪ হাজার হজযাত্রীকে পরিবহন করতে হবে বিমান ও সাউদিয়াকে। মাত্র ৯ দিনে এই সব যাত্রীর ই-ভিসা ও আনুষঙ্গিক কাজ সম্পন্ন করা কতটা সম্ভব হবে তা বলা যাচ্ছে না। মাসের শেষে যদি সত্যিসত্যিই যাদের হজ করতে যাওয়ার কথা তারা সবাই না যেতে পারেন তাহলে বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

ধর্ম মন্ত্রণালয় বলছে, সৌদি আরব ই-ভিসা ব্যবস্থা চালু করায় এ সমস্যা তৈরি হয়েছে। এজেন্সিগুলো সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সংকট তৈরি করছে। ছয় শতাধিক হজ এজেন্সির মধ্যে মাত্র শ’খানেক এজেন্সিকে বাংলাদেশ বিমান টিকিট দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৩০টি এজেন্সির সিন্ডিকেট সবচেয়ে বেশি টিকিট পেয়েছে। যারা পরে অতিরিক্ত দামে ছোট এজেন্সিগুলোর কাছে সেগুলো বিক্রি করছে। টিকিট নিয়ে এজেন্সিগুলোর মধ্যে দরকষাকষির কারণেও অনেক যাত্রী বিমানের টিকিট পাচ্ছেন না। আশকোনা হজক্যাম্পে দিনের পর দিন বসে থাকতে হচ্ছে তাদের। আর কোন কোন এজেন্সি অভিযোগ করছে, সিন্ডিকেট করেছে রাঘব বোয়ালরা।

গতকাল পর্যন্ত ৮ হাজারের বেশি হজযাত্রীর যাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বাতিল হওয়া হজ ফ্লাইটগুলোর বিপরীতে জেদ্দা বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে চাওয়া স্লট পাওয়ার বিষয়ে এখনও কোনো সমাধান হয়নি। ফলে ভিসা জটিলতার কারণে এ পর্যন্ত বাতিল ২১টি ফ্লাইটের ৮ হাজারের বেশি হজযাত্রীর ভাগ্য এখনও অনিশ্চিত। সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসছে ক্রমশ। দ্রুত অতিরিক্ত স্লট বরাদ্দ না পেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে হজ অফিসের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, বিমানের স্লট বরাদ্দ পাওয়া গেলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। হজ নিয়ে সুন্দর ব্যবস্থাপনা নেওয়ার পরও যাদের জন্য জটিলতা তৈরি হয়েছে তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফি বাড়ানোর খবর রাখেনি সরকার

সৌদি সরকার নতুন ভিসা কাঠামো কার্যকর করে ২ অক্টোবর (১ মহররম)। নতুন নিয়মাবলিতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, পুনরায় হজে গেলে দুই হাজার রিয়াল ফি দিতে হবে। তবে গত ফেব্রুয়ারি মাসে সরকারের জারি করা বিশাল হজ প্যাকেজের কোথাও এর উল্লেখ ছিল না। এরই পরিণতি ২৫ কোটি টাকা গচ্চা দিতে হচ্ছে ৫ হাজারের বেশি হজ যাত্রীকে। সংশ্লিষ্ট অনেকেই এখন এ জন্য ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ আনছে। হজ এজেন্সি মালিকদের সংগঠন হাবের নেতারা বলছেন, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের গাফিলতির কারণে আজ এই পরিস্থিতি। অতিরিক্ত ফির কথা হজ প্যাকেজে থাকলে ভোগান্তি হতো না।  ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুল জলিল বলেন, আমরা এ বিষয়ে জানতাম না।

এদিকে সরকারি খরচে যাদের হজে পাঠানো হচ্ছে তাদের অনেককে নিয়ে চরম সমালোচনা চলছে। সরকারী খরচায় হজে যাচ্ছেন মন্ত্রীর আত্মীয়-স্বজনরা । তালিকায় ধর্মমন্ত্রী মতিউর রহমানের নির্বাচনী এলাকা ময়মনসিংহের ৩৫ জন লোক হজ চিকিত্সকদের সহায়তা দলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। যারা চিকিত্সক নন। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের গঠন করা ১৭১ জনের হজ চিকিত্সকদের সহায়তাকারী তালিকায় আছেন গাড়িচালক, নিরাপত্তা প্রহরী, গানম্যান ও মসজিদের ইমাম প্রমুখ। তালিকায় থাকা কারো কারো নামের পাশে আবার পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা নেই। এই টিমে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার ২৫ জন গাড়িচালককে। মন্ত্রীর নিরাপত্তাকর্মী, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, এমনকি টাইপিস্টও আছেন এই মেডিক্যাল সহায়ক দলে। দলে এমন সব কর্মকর্তা-কর্মচারী নেওয়া হচ্ছে, যাদের অনেকেই এই কাজের উপযোগী নন। ওই দলে আরও আছেন নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, অফিস সহায়ক, পাম্প অপারেটর, টাইপিস্টসহ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কৃষিবিদ ও ফার্মাসিস্টরাও যাচ্ছেন এই দলের সদস্য হয়ে। সৌদি আরবে অবস্থানকালে হজযাত্রীদের চিকিত্সা সহায়তা দিতে এই ১৭১ জন যাওয়া-আসার বিমানভাড়া, যাতায়াত ভাতা ও দৈনিক ভাতা ইত্যাদি মিলে জনপ্রতি  পদ অনুযায়ী পাবেন ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা করে। এই অনিয়ম নিয়ে লেখালেখি সমালোচনা হলেও কোন প্রতিকার হয়নি। ইতিমধ্যে এই কথিত সহায়ক টিমের অনেক সদস্য  সৌদি আরব পৌঁছে গেছেন। এই প্রসঙ্গে ধর্মমন্ত্রী মতিউর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ময়মনসিংহ থেকে যারা হজে যাওয়ার জন্য আবেদন করেন তাদের নেয়া হয়েছে। অন্য মন্ত্রণালয় থেকে যাদের সুপারিশ করা হয় তাদেরও নেয়া হয়েছে।

ভিসা জটিলতা : ২৮ হজ এজেন্সিকে মন্ত্রীর আল্টিমেটাম

চলতি বছর সময় মতো ভিসার আবেদন করতে পারেনি এমন ২৮টি হজ এজেন্সিকে ভিসার আবেদন করতে দুই দিনের আল্টিমেটাম বেঁধে দিয়েছেন ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান। তিনি বলেছেন, এ সময়ের মধ্যে ব্যর্থ এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করা হবে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে আশকোনা হজক্যাম্পে হজের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা জানান তিনি। হজ ফ্লাইট বাতিলসহ ভিসা জটিলতার জন্য হজ এজেন্সিগুলোকে দায়ী করেন মন্ত্রী। ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্রে প্রাপ্ত পরিসখ্যান অনুযায়ী মোট ২৮টি এজেন্সি ৫ হাজার ১১৭ জন হজযাত্রীর ভিসার আবেদন জমা দেয়নি। নাম ও হজযাত্রীর কোটা অনুযায়ী প্রাপ্ত তালিকার বিভিন্ন এজেন্সিগুলো হলো রিয়েল ইন্টারন্যাশনাল (১৬৮ জন), বদরপুর ট্রাভেলস্ অ্যান্ড ট্যুরস (২৪১ জন), আজমল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল (১৫৯ জন), ফারুক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরস্ (১৮৭), গোল্ডেন ট্রাভেলস্ অ্যান্ড কার্গো সার্ভিসেস (২৫১ জন), এআরএস ট্রাভেলস্ (১৫৪ জন), ঢাকা হজ কাফেলা অ্যান্ড ট্রাভেলস্ (১৮২ জন), ঢাকা ট্রাভেলস্ অ্যান্ড ট্যুরস্ (১৫৩ জন), গ্লোব ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেল এজেন্সি (১৬৪ জন), হাবিব এয়ার ট্রাভেলস্ অ্যান্ড ট্যুরস ্ (২২০ জন), হা-মিম ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরস (১৫৪ জন), ইহরাম এয়ার ইন্টারন্যাশনাল (১৬৭ জন), কাশেম ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস্ (২০২ জন), এমএএম ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরস (১৫০ জন), এম/এস এম নুর ই মদিনা হাজি ট্রাভেলস্ (২০৮ জন), মাবরুর এয়ার ইন্টারন্যাশনাল (১৬৪ জন), মাহির হজ সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্যুরস্ (১৭২ জন), মক্কা বাবে জান্নাত ট্রাভেলস্ অ্যান্ড ট্যুরস ্ (১৫৮ জন), মেছফালা ট্রাভেলস (২২৫ জন), এমএইচএম ওভারসিজ (১৮০ জন), মদিনা এয়ার ইন্টারন্যাশনাল এভিয়েশন (১৬৬ জন), পেনাং ট্রাভেলস্ অ্যান্ড ট্যুরস্ (১৫১ জন), সিনেটর এয়ার ট্রাভেলস (১৯৪ জন), এম/এস মক্কা অ্যান্ড মদিনা ট্রাভেলস্ (২৬৫ জন), সাকের হজ কাফেলা অ্যান্ড ট্রাভেলস্ (১৫৪ জন), মিম ট্রাভেলস্ ইন্টারন্যাশনাল (১৬৮ জন), তাওসিফ ট্রাভেলস্ অ্যান্ড ট্যুরস্ (১৫৫ জন) ও এম আলী ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেলস (২০৯ জন)। -ইত্তেফাক

Share This:

Comments

comments

এই পেইজের আরও খবর