১৭ অক্টোবর ২০১৭
সকাল ১১:৫৬, মঙ্গলবার

কক্সবাজারে মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা

কক্সবাজারে মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা 

533

কক্সবাজার : পর্যটন জেলা কক্সবাজারে খাদ্যাভাব ও মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা বলছে, স্থানীয় বাসিন্দা ও মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের পর্যাপ্ত খাবারের চাহিদা মেটানো স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষে দুরূহ হয়ে পড়েছে। দেশের অন্যান্য স্থানে রোহিঙ্গাদের ছড়িয়েপড়া ঠেকাতে বাস, ট্রেনসহ সব যানবাহনের টিকিট কাটার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করার কথাও জানানো হয়েছে।

বুধবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। কমিটির সভাপতি টিপু মুন্সীর সভাপতিত্বে বৈঠকে অংশ নেন কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, মো. মোজাম্মেল হোসেন, মো. শামসুল হক টুকু, মো. ফরিদুল হক খান, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, ফখরুল ইমাম ও কামরুন নাহার চৌধুরী।

বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি টিপু মুন্সী এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে জানান, চলমান রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি হবে বলে মনে করছে সংসদীয় কমিটি। মানবিক কারণে তাদের খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে কমিটি মনে করছে, পৃথক জনগোষ্ঠী হিসেবে রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করে যতদিন প্রয়োজন আশ্রয় দেওয়াটাই সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এ কারণে রোহিঙ্গারা যাতে দেশের বিভিম্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য চট্টগ্রামসহ সংশ্নিষ্ট এলাকায় যানবাহনের টিকিট কাটার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও ইতিমধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বৈঠকের কার্যপত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের উপসচিব মো. আবদুল মালেকের সই করা এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মিয়ানমার থেকে প্রতিনিয়ত রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান ও আগে অবস্থানকারী মিলে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয়ের কারণে কক্সবাজারের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। যে কারণে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফসহ আশপাশের এলাকায় খাদ্যাভাব ও মানবিক বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই নাজুক। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় তাদের ওপর পুলিশ, বিজিবিসহ অন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়েছে। স্থানীয় বিভিম্ন দালালচক্র উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাদের আরও নিরাপত্তাহীন করে তুলেছে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের সার্বিক আইন-শৃগ্ধখলা পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক হলেও সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের কারণে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি সার্বিক আইন-শৃগ্ধখলা পরিস্থিতিতে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।

মিয়ানমার থেকে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী ১৯৯১-৯২ সাল থেকে বাংলাদেশে অবস্থান করায় কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বিভিম্ন এলাকার স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে সখ্যের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই বিয়েসহ নানাভাবে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করেছে। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা পুনরায় বাংলাদেশে প্রবেশ করায় আত্মীয় ও দালালের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে বিভিম্ন পন্থায় দেশের নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়ার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। কক্সবাজার, বান্দরবান জেলা ছাড়াও ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম, মানিকগঞ্জ, খাগড়াছড়ি, সুনামগঞ্জ, রাঙামাটি, চাঁদপুর, হবিগঞ্জ, সিএমপি, কুড়িগ্রাম, টাঙ্গাইল, চুয়াডাঙ্গা জেলায় মোট ৫১৫ জন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে বলে সূত্রে জানা যায়। যাদের পরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কক্সবাজার-বান্দরবানসহ মিয়ানমার সীমান্তবর্তী জেলাগুলো থেকে দেশের অভ্যন্তরে ভ্রমণে সবাইকে বাধ্যতামূলক জাতীয় পরিচয়পত্র বা তার ফটোকপি বহন করতে হবে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভিম্ন বাহিনীপ্রধানকে নিয়ে বিশেষ সভায় জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া চট্টগ্রামসহ দেশের অন্য কোনো শহরে প্রবেশ ঠেকাতে যানবাহন বা নৌ রুটের টিকিট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কথা বলা হয়।

মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনীর দমন অভিযানের মুখে গত ২৫ আগস্ট থেকে পাঁচ লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তারা বলছেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মানুষ মারছে। রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ করা হচ্ছে, জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি সেনা অভিযানকে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে বর্ণনা করলেও জাতিসংঘ একে চিহ্নিত করেছে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ হিসেবে। রোহিঙ্গাদের জন্য কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালীতে আশ্রয় শিবির করেছে সরকার। সেখানে তাদের নিবন্ধনও করা হচ্ছে।

বৈঠকে জানানো হয়, রোহিঙ্গাদের প্রতিদিন ১০ হাজার নিবন্ধনের টার্গেট হলেও তা পূরণ করা যাচ্ছে না। এ পর্যন্ত সাত হাজারের মতো নিবন্ধন সম্ভব হচ্ছে। কারণ এ বিষয়ে রোহিঙ্গাদের অনীহা কাজ করছে। কমিটির পক্ষ থেকে নিবন্ধনের জন্য রোহিঙ্গাদের মোটিভেশেনের সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানান কমিটির সভাপতি।

টিপু মুন্সী আরও বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান দ্রুতই হয়ে যাবে বলে মনে করছে না কমিটি। যদিও মিয়ানমারের মন্ত্রী এসে বলেছেন, তারা এর সমাধান করবেন। কিন্তু এর মধ্যে অনেক বাহানা রয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে এই ইস্যুটা শুধু দ্বিপক্ষীয় বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেতে পারে। তখন বিশ্ব মতামতও অন্যরকম হবে। এ জন্য কমিটি বলেছে, এই সমস্যার সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে।

তিনি বলেন, সরকার কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে, তবে সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখতে আইন-শৃগ্ধখলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে। একই সঙ্গে তাদের সঙ্গে যাতে কোনোভাবে ইয়াবা বা অন্য কোনো মাদকদ্রব্য দেশে ঢুকতে না পারে, সেজন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে ‘বিশেষ’ নজরদারি চালানোর জন্য বলা হয়েছে।

এদিকে সংসদ সচিবালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, রোহিঙ্গাদের নিয়ে প্রচারিত বিভিম্ন সচিত্র প্রতিবেদন, নির্যাতনের চিত্র, ভিডিও ক্লিপস, পেপার ক্লিপসসহ তাদের বিষয়ে গৃহীত কার্যক্রম সংরক্ষণ করতে একটি বিশেষ আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়।

Share This:

Comments

comments

এই পেইজের আরও খবর