২০ নভেম্বর ২০১৭
সকাল ১০:০২, সোমবার

গ্যাসের জন্য আবেদনের পাহাড়

গ্যাসের জন্য আবেদনের পাহাড় 

244

ঢাকা : গ্যাসের সংকট। তাই শিল্পকারখানায় মিলছে না সংযোগ। এমনকি মিলছে না গ্যাসের লোড বৃদ্ধি। শিল্পকারখানার এমন সাড়ে তিন হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়ে আছে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে। প্রতিদিনই জমা হচ্ছে নতুন নতুন আবেদন। তবে কবে মিলবে নতুন শিল্পকারখানার গ্যাস সংযোগ অথবা চাহিদা অনুযায়ী বর্ধিত লোড- এর নিশ্চিত উত্তর জানা নেই। গ্যাসের অভাবে অভাবে শিল্প মালিক বিনিয়োগ হারানোর ঝুঁকিতে আছেন। নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠতে পারছে না।

গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্রে জানা যায়, সারা দেশে পাঁচ গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কাছে এখন প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে সর্বোচ্চ উৎপাদন হচ্ছে ২৭শ থেকে সাড়ে ২৭শ মিলিয়ন ঘনফুট। পেট্রোবাংলার হিসাবেই গড়ে প্রায় ১২শ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে।

এদিকে গাজীপুর-কোনাবাড়ি এলাকায় বিদ্যমান শিল্পকারখানায় গ্যাসের কম চাপ এবং গ্যাসের লোড বৃদ্ধি করতে না পেরে অনেক কারখানা রুগ্ন হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন। কোনো কোনো শিল্পকারখানা সিএনজি স্টেশনের গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন সিলিন্ডারে করে সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস নিয়ে চালাতে হচ্ছে কারখানা। এদিকে গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে দেশের শিল্প খাত চরম সংকটের মধ্যে আছে।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক ই ইলাহী চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি আছে। কমিটি অনেক যাচাই-বাছাই করে দীর্ঘ সময় পর পর কিছু কারখানাকে গ্যাস সংযোগ ও লোড বৃদ্ধির অনুমোদন দেয়। চলতি বছরের মে মাসে এই কমিটি প্রায় দেড় বছর পর ২৭৩ শিল্প প্রতিষ্ঠানে নতুন গ্যাস সংযোগ ও লোড বৃদ্ধির অনুমোদন দিয়েছে।

সূত্রমতে, ২০১৩ সাল থেকে শিল্পে গ্যাস-সংযোগ সীমিত করার পর এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচশ শিল্পকারখানায় নতুন সংযোগ ও লোড বৃদ্ধির অনুমোদন মিলেছে। তবে উপদেষ্টা কমিটির অনুমোদন হওয়ার পরও কোনো কোনো কারখানায় এ পর্যন্ত গ্যাস সংযোগ মেলেনি।

এদিকে চরম গ্যাস সংকটের কারণে গাজীপুরসহ পোশাক শিল্পঘন এলাকায় বিকল্প উপায়ে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সংযোগের দাবি করেছে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। গত শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ানবাজারে বিজিএমইএর নিজস্ব কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে গ্যাস সংকট থাকায় বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। প্রসঙ্গত বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন।

পোশাকশিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরতে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, গাজীপুর, আশুলিয়া ও কোনাবাড়ি এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানানো হয়েছে। একটি সার কারখানা বন্ধ করে সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এলএনজি না আসা পর্যন্ত শিল্পকারখানায় সুষ্ঠুভাবে গ্যাস সরবরাহের দাবি করেন।

এদিকে দেশে চলমান গ্যাস সংকটের সমাধানে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নাধীন তথ্য থেকে জানা যায়, গ্যাসক্ষেত্রের অনুসন্ধানে আগামী ৪ বছরে ১০৮ গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তার মধ্যে চলতি বছরই ২৮ কূপ খনন করা হবে। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি করবে বাপেক্স এবং অবশিষ্টগুলো করবে বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া গভীর সমুদ্র ব্লকগুলোতেও গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে কয়েকটি সমুদ্র ব্লক ইতোমধ্যে বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও জ্বালানি সচিব নাজিম উদ্দিন চৌধুরী এমন তথ্য জানিয়েছেন। তবে গ্যাস সংকট সমাধানে সরকারের সবচেয়ে বৃহৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির বিষয়টি।

এদিকে গ্যাস সংকট নিয়ে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এ প্রতিবেদককেকে বলেন, দেশ বিভিন্নভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে গ্যাস সংকটের বিষয়টি আমাদের সামনে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এর সমাধানে আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি। দেশে গ্যাসের অনুসন্ধান বাড়ানোর পাশাপাশি এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছি। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে প্রায় তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি করা হবে।

দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার সর্বোত্তম খাতে ব্যবহারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সরকার সারা দেশে বাসাবাড়িতে পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে। আর শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়া এবং ব্যবহার বাড়ানো (লোড বৃদ্ধি) কার্যত ২০০৯ সাল থেকেই বন্ধ রয়েছে।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে সরবরাহকৃত গ্যাসের মধ্যে আবাসিক খাতে ১৩ শতাংশ, সিএনজিতে ৫.৪৪, বাণিজ্যিকে ১.০৫, ক্যাপটিভে ১৭.১৭, শিল্পে ১৬.৮৫, চা বাগানে ০.৯, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৪০.১৭ এবং সার কারখানায় ৬.১৭ শতাংশ ব্যবহৃত হয়। -আমাদের সময়

Share This:

Comments

comments

এই পেইজের আরও খবর