২০ নভেম্বর ২০১৭
সকাল ৯:৫৭, সোমবার

রোহিঙ্গাদের ফেরত দিচ্ছে না বাংলাদেশ!

রোহিঙ্গাদের ফেরত দিচ্ছে না বাংলাদেশ! 

2444

ঢাকা : বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত ও প্রাণভয়ে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ যখন অব্যাহতভাবে আলোচনা করছে তখন উদ্ভদ এক অভিযোগ উত্থাপন করেছে মিয়ানমার। বলা হচ্ছে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিলম্বের জন্য বাংলাদেশ দায়ী। নেপিদো বলছে, কোটি কোটি ডলারের বৈশ্বিক সহায়তার লোভে ঢাকা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করছে না। অবশ্য বাংলাদেশ বলছে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর জন্য জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের কথা বললেও সেটি এখনো গঠন হয়নি। অন্যদিকে প্রতিদিন শত শত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে নতুন করে প্রবেশ করছে। বাংলাদেশ বরাবরই বলে আসছে, মানবিক কারণে আপাতত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া হলেও মিয়ানমারকে অবশ্যই তাদের নাগরিককে নিতে হবে। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ৬ লাখ ৮ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। গতকালও ৫ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য নো ম্যানন্স লান্ডে অপেক্ষারত আছে।

অব্যাহত আন্তর্জাতিক চাপে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বললেও কৌশলী ভূমিকা নিয়েছে দেশটি। রোহিঙ্গা ফেরত নেওয়ার দাবিতে রাজি হওয়া এবং বাংলাদেশের কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দেরি হওয়ার দাবি মিয়ানমারের আর একটি কৌশল বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির এক মুখপাত্র বলেছেন, রোহিঙ্গাদের জন্য কোটি কোটি ডলারের বিদেশি সহায়তা হাতে পাওয়ার আগে বাংলাদেশ প্রত্যাবাসন শুরু করতে চায় কি না-সে বিষয়েই তাদের সন্দেহ রয়েছে।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর সু চির দপ্তরের মহাপরিচালক জ তাই মঙ্গলবার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। সেখানে তিনি বলেন, মিয়ানমার ১৯৯২ সালের প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে যে প্রস্তুত আছে, সে কথা আগেই জানানো হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনও সে প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। আমরা শুরু করতে চাই। কিন্তু অন্য পক্ষ তো এখনও সাড়া দিচ্ছে না। ফলে দেরি হয়ে যাচ্ছে। আর বুধবার রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমারে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার অর্থ বাংলাদেশে আসার বিষয়টি টেনেছেন। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ৪০ কোটি ডলার পেয়েছে। তারা যেভাবে টাকা পাচ্ছে, তাতে প্রত্যাবাসনের বিষয়টি আরও বিলম্বিত হবে বলে আমাদের আশঙ্কা। আমাদের মনে হচ্ছে, তারা হয়ত প্রত্যাবাসনের বিষয়ে নতুন কিছু ভাবতে পারে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২৩ অক্টোবর মিয়ানমার সফরে যান। সফরকালে তিনি মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সফর শেষে দেশে ফিরে বিমানবন্দরে বলেন, মিয়ানমারের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক চাপ কমলে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো কঠিন হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২৮ অক্টোবর বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কফি আনানের ১০ দফা এবং প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘে উত্থাপিত পাঁচ দফার ব্যাপারে মিয়ানমার একমত হয়নি। এ কারণে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন সম্ভব হয়নি। কফি আনান কমিশন ও প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব মিয়ানমারকে দিয়েছি। তারা প্রস্তাবনাগুলোয় কাটাছেঁড়া করে খসড়া কপি আমাদের দিয়েছিল। তা সংশোধন করে আবার পাঠিয়েছি। আলোচনা বন্ধ হয়নি, চলবে।

রয়টার্স জানিয়েছে, বাংলাদেশ সরকার গত বৃহস্পতিবার একটি বিবৃতি দিয়েছে; সেখানে বলা হয়, ওই দশ দফা প্রস্তাবের বিষয়ে মিয়ানমার এখনও সম্মতি দেয়নি।

এদিকে আগামী ২০-২১ নভেম্বর মিয়ানমারে এশিয়া-ইউরোপ দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেই বৈঠককে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালাবে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। এছাড়া অন্য দেশগুলো যেন মিয়ানমারের ওপর নাগরিকদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে চাপ দেয় সেই প্রচেষ্টাও চালিয়ে যাবে। ইইউভুক্ত দেশগুলো বলছে, আসেম বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভালো কোন ফল আসবে বলে মনে হয় না। নাম প্রকাশ না করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, আসেম সম্মেলনে বিশ্ব নেতারা মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির সাথে সাক্ষাৎ করে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান চাইবে। কিন্তু মিয়ানমারের ক্ষমতার কেন্দ্র মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রধানের সঙ্গে বিশ্ব নেতাদের কোনো সাক্ষাত হবে না। সুতরাং আমি মনে করি সু চি গতানুগতিক কথায় বলবেন। সমস্যা সমাধানে কোনো দিক নির্দেশনা আসবে বলে আমার মনে হয় না।

মিয়ানমার ১৯৯২ সালের চুক্তির আওতায় রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার কথা বলছে। কিন্তু বাংলাদেশ ১৯৯২ সালের চুক্তিকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাস্তসম্মত নয় বলে মনে করছে। ১৯৯২ সালে মিয়ানমারের সামরিক সরকার শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে যে প্রত্যাবাসন চুক্তি করেছিল, তার আওতায় ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৯ জনকে সে সময় ফিরিয়ে নেয়। চুক্তি নির্ধারিত যাচাই প্রক্রিয়ায় আরও ২৪১৫ জন শরণার্থীকে ‘মিয়ানমার থেকে আসা’ বলে চিহ্নিত করা হলেও তাদের আর তারা ফিরিয়ে নেয়নি।

গত ৯ অক্টোবর ঢাকায় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের ডেকে এক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, যে প্রেক্ষাপটে ১৯৯২ সালের চুক্তির নীতিমালা ও যাচাইয়ের প্রক্রিয়াগুলো ঠিক করা হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার তুলনায় অনেকটাই আলাদা। সুতরাং ওই চুক্তি অনুসারে এবার রোহিঙ্গাদের পরিচয় শনাক্ত করার প্রস্তাব বাস্তবসম্মত নয়।

এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবিক সহায়তা বিষয়ক কমিশনার ক্রিস্টোস স্টাইলিয়ানিডস বলেছেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন সব সময় এবং শেষ দিন পর্যন্ত সহায়তা করে যাবে। রোহিঙ্গা সমস্যা হচ্ছে কয়েক দশকের মধ্যে এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সঙ্কট। এই সমস্যার শেকড় রাখাইনে। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে ফিরিয়ে নেয়াই হবে এর সমাধান। একই সঙ্গে এ বিষয়ে রাজনৈতিক সমাধানও হতে হবে। গতকাল বিকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি একথা বলেন। -আমাদের সময়

Share This:

Comments

comments

এই পেইজের আরও খবর